Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ রবিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৮ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘এসিএসডিইএম’ মডেল, জাফর ইকবালের উদাহরণ ও আমার গৃহশিক্ষক!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারী ২০১৮, ০৯:৫৩ PM আপডেট: ২৯ জানুয়ারী ২০১৮, ০২:১১ PM

bdmorning Image Preview


সাইফুল হাসান রনি, সাউথ আফ্রিকা থেকে।।

প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে  শিক্ষামন্ত্রণালয়কে বিকল্প প্রস্তব দেন ‘এসিএসডিইএম’ মডেলে ইঞ্জি. আরিফ চৌধুরী শুভ। মডেলটি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইনে প্রকাশিত হবার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছে। অনেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে ‘এসিএসডিইএম’ মডেলের পক্ষে বিপক্ষে নিজেদের মতামত দিয়েছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাউথ আফ্রিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ও ‘Education For Street Child’-পথ শিশুর জন্য শিক্ষা’  এর এ্যাডমিন সাইফুল ইসলাম রনির ফেসবুক মন্তব্যটি বিডিমর্নিং পাঠকের জন্যে হুবহু তুলে ধলা হলো।

এসিএসডিইএম মডেল দেখে আমার ছোটবেলার গৃহশিক্ষকের কথা মনে পড়ে গেল। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন আমার গৃহশিক্ষক ছিলেন একই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দশম শ্রেণির ছাত্র। তবে আমার সাথে তার ব্যতিক্রমতা ছিল মেধার দিক থেকে আমরা দুজন যোজন যোজন দূরে। সারাক্ষণ পড়াশুনা আর দেশ নিয়ে ভাবনাই ছিল তার কাজ। আমার গৃহস্যারের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে স্কুলের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকগণই আনন্দে আত্মহারা হয়েছেন। কারণ তিনিই কেবল আমাদের স্কুলই নয়, আশাপাশের জনাবিশেক স্কুলের মধ্যে একমাত্র "এ মাইনাস"( A-) পেয়ে এসএসসি উত্তির্ণ হয়েছেন। তাকে দেখতে স্কুলের সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থী তার বাড়িতে ভীঁড় জমিয়েছে তখন। এই ছিল সে সময়ের মেধার মান।

এবার আসা যাক বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার হালচালে। সেদিন জাফর ইকবাল স্যার আইমান সাদীকের একটি ভিড়িওতে অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলছিলেন, একটা সময় ছিলো যখন বাবা মায়েরা তাদের বাচ্চাকে আমার কাছে নিয়ে এসে বলতো, আমার ছেলেটা বা আমার মেয়েটা গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। তখন আমি খুব খুশি হয়ে বলতাম, বাহ্! কি চমৎকার। অনেক বড় হও।

আর এখন যখন কোন শিক্ষার্থীর বাবা মা আমার কাছে তার সন্তানকে নিয়ে এসে বলে, আমার মেয়ে বা ছেলে গোল্ডেন ফাইভ পেয়েছে। তখন আমি মনে মনে বলি, আহারে বাচ্চাটা! আহারে!!  কিন্তু কেন আমার এ আক্ষেপ?

মনে মনে বলি। ঐ শিক্ষার্থীকে না জানি কত কষ্ট দিয়েছে তার্ বাবা মা। একে হয়তো কোচিং সেন্টারে নিয়ে গেছে। প্রাইভেট পড়তে নিয়ে গেছে।  নানাভাবে মুখস্ত করিয়েছে। শুধু তাই না, পরিক্ষার আগের রাতে হয়তো প্রশ্নটাও আউট করেছে তার জন্যে। সে প্রশ্ন মুখস্তও করিয়েছে জোর করে। শুধু তাই না, পরিক্ষা যদি ভালো না হয়, বাবা মা তাকে বকাবকিও করেছে।

জি, জানেন কি? প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন প্রাইমারিতেও হয়। এ রেকর্ডও আমরা গড়েছি। ফল ফাঁসের রেকর্ডও বাদ যায়নি।  ব্যাংক নিয়োগ পরিক্ষা, বিসিএস পরিক্ষায়ও প্রশ্ন ফাঁস হয়। মেডিকেল পরিক্ষায় তো এটি না হলে চলেই না। চিন্তা করা যায় কি, একজন পাশ করা ডাক্তার এভাবে নামের টাইটেল পেয়ে রুগিকে কি দিতে পারে? অথবা, একজন ইঞ্জিনিয়ার একটি বহুতল বভনের কি রূপ দিবে?

রানা প্লাজা হয়ে যাবে না তো তার বানানো ভবন? অবশ্যই রাষ্ট্রীয় ভাবে যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এগুলোর দেখবাল করার, তাদেরতো এটিকে গায়ে লেপনের প্রয়োজনই নাই। তারা সামান্য সর্দি-কাশি হলেইতো ডাক্তার দেখান দেশের বাহিরে গিয়ে। নিজ অঙ্গ বলে কথা। আবার নিজস্ব স্থাপনার সকল পর্যায়ে বিনদেশি ইঞ্জিনিয়ারই একমাত্র ভরসা তাদের। এই হলো তাদের দেশপ্রেম।

হবেই না বা কেনো, নিজের তো, নাকি? আচ্ছা দেশটাতো আমাদের নিজেদের। আমরাতো আদর শ্রদ্ধা ও ভালোবেসে বলি, প্রিয় দেশ আমার, প্রিয় মাতৃভূমী আমার বাংলাদেশ। কিন্তু আমাদের কাজে কর্মে সেই প্রিয়টা কতটুকু করি আমরা?

সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। সময় এসেছে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার মহোৎসব থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর।কিন্তু আমরা কার পিছে ঘুরে দাঁড়াবো। কার কথঅয় ঘুরে দাঁড়াবো। আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখাবে কে? পত্রিকার পাতায় প্রশ্নফাঁস রোধে বিকল্প প্রস্তাব দেখে মনে হলো এবার সত্যি আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারি।

ধরুন, পরীক্ষায় পত্র আকারে কোনো প্রশ্নই আর থাকলো না। তাহলেতো আর প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার সুযোগই থাকবে না। আচ্ছা প্রশ্নপত্র চাড়াও কি পরিক্ষা দেয়া সম্ভব? এ প্রশ্নটা প্রথমে আমারো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে একটি মডেল নজরে পড়েছে। চোখ এড়িয়ে যেতে পারিনি বিষয়টি। কারণ বিদেশে থাকলেও সব সমসয় দেশ আমার হৃদয়েই থাকে। এদেশের ভালো ও মঙ্গলজনক বিষয়গুলো কেন যেন আমার চোখ এড়ায় না। তাই ব্যস্ততার মাঝে দুএকটি কথা লিখতে চেষ্টা করলাম।

মডেলটির সংক্ষিপ্ত নাম এসিএসডিইএম মডেল। ইঞ্জিনিয়ার আরিফ চৌধুরী শুভ এই মডেলটির প্রস্তাবনা করেছেন।  ACSDEM জাতির উদ্দেশ্যেই প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে তার দীর্ঘদিনের চিন্তা ভাবনারই ফসল বলে আমার কাছে প্রাথমিকভাবে মনে হল। ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে বেশ প্রশংসণীয় হয়েছে তার এই মডেলটি।

বাংলাদেশের প্রথম সারির প্রিন্ট মিডিয়া ও অনলাইন মিডিয়াগুলো যখন গুরুত্বের সহিত তার এই মডেল প্রচার করে তখন তার বিরোধীতা করা আমার সাহস নাই। এটি আমার কাছেও বেশ  ও আশার মনে হলো্। কেন লেগেছে তাও বলতে চাই।

‘এসিএসডিইএম’ এর পূর্ণরূপ হলো আরিফ চৌধুরী শুভ ডিজিটাল এক্সাম মডেল। ‘এসিএসডিইএম’ এ রয়েছে ৬টি গুরুত্বর্পূণ ধাপ। ১) চাহিদা কমিশন, ২) পরীক্ষা কমিশন, ৩) ফল কমিশন, ৪) নিয়োগ কমিশন, ৫) অভিযোগ কমিশন এবং ৬) তদারকি ও একশান কমিশন। এই ৬টি ধাপ নিয়ে গঠিত হবে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল শিক্ষা কমিশন বা ডিইসি। বাহ! কি সুন্দর প্রস্তাবনা।

এই কমিশনই বাস্তবায়ন করবে এই ধাপগুলোর কাজ। ‘এসিএসডিইএম’ এর প্রস্তাবক এটির সুন্দর ব্যখ্যাও দিয়েছেন কিভাবে কাজ করবে প্রত্যেকটি কমিশন। যা খুবই প্রশংসার দাবী রাখে। সবাই যখন এত এত ব্যস্ত, তখন তিনি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যে এতটুকু ভেবেছেন তার জন্যে তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে ছোট করতে চাই না। শুধু এটুকুই বলবো তার ভাবনা স্বার্থহীনও আদর্শিক।

প্রস্তাবক ডিজিটাল পরীক্ষা কক্ষের ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষর্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার মাধ্যমে মেধার সঠিক মূল্যায়নের কথা বলেছেন। এসিএসডিইএম এর ৬টি ধাপ স্বতন্ত্র ভাবে যদি পরিচালিত হয়, তবে এই প্রস্তাবনাটি সঠিক অর্থে বাস্তব রূপায়ন সম্ভব। তবে এই প্রজন্মের মাঝে শিক্ষা ব্যবস্থার এই বেহাল দশা থেকে মুক্তির জন্যে চোখে পড়ার মতো একটি মডেল।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে নানা প্রস্তাব ও পরিকল্পনা উত্থাপন করে যাচ্ছে শিক্ষানুরাগীগণ। কিন্তু কোন কিছুই কোন ভাবেই কাজে আসছে না। যতই সর্তক ও আইন করি না কেন প্রশ্ন ফাঁস যেন থামছে না। তবে এ মিছিলের শেষ কোথায়? কিন্তু এসিএসডিইএম মডেলটি দেখে আমার কাছে মনে হলো যদি এ মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন ফাঁসের এই মিছিলের শেষ হতে পারে।

এসিএসডিইএম এর বাস্তবায়নে এ মিছিলের শেষ হতে পারে এটি অরো অনেকেই ইতিমধ্যে মডেলটি দেখে মূল্যায়নে বলেছেন।তবে এটি যে শতভাগ নির্ভরযোগ্য তাও কিন্তু নয়। এটাতেও ক্রুটি থাকতে পারে। মেধার মানদণ্ডে প্রশ্নপত্র ফাঁস একটি বিষপোড়া এ সত্য আজও অনাকাঙ্খিত ভাবে আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি। শিক্ষামন্ত্রনালয় এই ডিজিটাল পদ্ধতিটি পরিক্ষামূলক ভাবে দেখতে পারে। আশা করা যায়, এটি অনেকটা কাজে আসবে। গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসার একটা পথ হতে পারে।

তবে হ্যা, এই পদ্ধতির পরিক্ষার হল সাজাতে অর্থ ব্যবস্থাপনায় যোগান বাড়াতে হবে। কিন্তু তা বার বার চাপাখানার ব্যায় এর তুলনায় বেশি হবে না। ইঞ্জিনিয়ার আরিফ চৌধুরী শুভ এর এই ব্যতিক্রমী ‘এসিএসডিইএম’ মডেল এক নতুন দিনের মোড়ক উম্মোচন করবে প্রশ্ন ফাঁসের শিক্ষাব্যবস্থায়, এটাই আশা করি।

শিক্ষার্থী ও এ্যাডমিন, Education For Street Child’.

Bootstrap Image Preview