Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ সোমবার, ডিসেম্বার ২০১৮ | ৩ পৌষ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

'যুদ্ধ আমাদের স্বভাবে, সার্টিফিকেটে নয়'

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৫৯ PM
আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:৫৯ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

তাঁর বয়স যখন ১৬/১৭ বছর তখন তিনি পাড়ার বড় ভাইদের সাথে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। চারিদিকে অনেক খোঁজাখুঁজি করা হলেও, দীর্ঘদিন তার কোন হদিস মেলেনি। এতে মহল্লায় শোকের ছায়া নেমে আসে।

যাহোক, নিরুদ্দেশ হওয়া কিশোরটি ছিল বাড়ির বড় ছেলে। তিনি ছিলেন বাবা-মা'র চোখের মনি। ছেলেটি ততদিনে মেট্রিক পাশও করেনি। বাড়ির সবাই যখন নিশ্চিত হল যে, ছেলেটি পাড়ার আরও কয়েকজন যুবকের সাথে কোথায় গেছে, তখন ছেলের লাশটাও ফেরত পাওয়ার আশা তারা ছেড়ে দিল। কারণ আশেপাশের গ্রামে এরকম ঘটনা অনেক ঘটেছে।

এক সময় যুদ্ধ শেষে হলো। দেশে বিজয় এলো। সেই সাথে কিশোর বালকটিও মহল্লার বড় ভাইদের হাত ধরে গ্রামে ফিরে এলো। উল্লাসে ফেটে পরল পরিবার ও গ্রামের সকল মানুষ। বিজয়ের আনন্দে সবাই তার নিরুদ্দেশ হওয়ার শাস্তির কথা ভুলে গেল।

এদিকে কিশোর বালক মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়ে কয়েক মাস যুদ্ধ করেও তৃপ্ত হল না। তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিবেন। ব্যস, সদ্য স্বাধীন দেশের ঐতিহ্যবাহী আর গর্বিত সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে গেলেন। কিন্তু বয়স কম; তাই নতুন দেশের নতুন সেনাবাহিনী তাকে ফিরিয়ে দিল। পরবর্তিতে অবশ্য সদ্য সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া পাড়ার বড় ভাইয়েরা একটা ব্যবস্থা করে তাকে ঢুকিয়ে নিল। ব্যস, সেই থেকে শুরু হল তার সেনা জীবন।

আমার বয়স যখন ৩ বছর তখন বাবার কর্মস্থল ছিল বান্দরবানের গহীন জঙ্গলের একটি ক্যাম্পে। আমরা সপরিবারে সেখানেই থাকি। তখন প্রায়ই শান্তিবাহিনীর হাতে কোন না কোন সেনা আংকেলের মৃত্যু খবর শুনতাম। সেখানে নানা আতংকে কেটেছে আমার শৈশব। দিনে শান্তিবাহিনীর আক্রমণ আর রাতে মশারীর উপর দিয়ে মাকড়শা আর সাপের আনাগোনা- এসবই ছিল আমার শৈশবের থ্রীল।

যাহোক, আমার শৈশবের কোন এক সময় আমাদের ক্যান্টনমেন্ট জীবনের অবসান ঘটে অভিমানী বাবার সেনাবাহিনী থেকে চাকুরী ইস্তফা দেয়ার বদৌলতে। তবে, কলেজ পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্ট কলেজেই লেখাপড়া চালিয়ে গেলাম। যদিও এর মাঝে ৫/৭ বার জায়গা এবং স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছে।

এভাবে শিক্ষা জীবন শেষ হলো। এবার বিসিএস পরীক্ষা দিতে গিয়ে জানলাম বাবার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটটা নাকি খুব কাজে দিবে। সার্টিফিকেটের কয়েকটা ফটোকপি করে বিসিএস-এর আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে গিয়েও থমকে গেলাম। মনে সংশয় দেখা দিল- মুক্তিযোদ্ধা বাবার যুদ্ধের মূল্য আমি এভাবে নিব কিনা? বাবার মতই আবেগ আর একরোখা ছিলাম বলে পুনরায় একটি ফরম উঠিয়ে সাধারণ কোটায় আবেদন করে সেটা জমা দিলাম।

বাবার কাছে, বাবার সহযোদ্ধাদের কাছে যুদ্ধের অনেক গল্প শুনেছি। এসব শুনে পুলকিত হয়েছি, রোমাঞ্চিত হয়েছি, শরীরে শিহরণ জেগেছে, আর গর্বে বুকটা ভরে উঠেছে। আমি নিজেরও আমার সন্তানদের শুনিয়েছি মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা দাদার কথা। তারা স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বলেছে, “আমার দাদা একজন মুক্তিযোদ্ধা”।

যাহোক, বাবার কাছে স্বাধীন দেশটা দায়বদ্ধ ছিলনা। তাই বাবার সন্তান হয়ে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন বিশেষ সুবিধা নিতে নিজেকে রাজি করাতে পারলাম না। যুদ্ধে যাওয়াটা ছিল বাবার নৈতিক দায়িত্ব। সময়ের দাবীতে তিনি যুদ্ধ করেছেন। তিনি না গেলে আমি হয়তো হতাম এক ভীতু এবং আত্মকেন্দ্রিক বাবার বড় ছেলে। তখন আমার সন্তানের ধমনীতে মুক্তিযুদ্ধের আবহ সৃষ্টি করতে আমার একটু বেগ পেতে হত। তাই যোদ্ধার প্রতি রাষ্ট্রের কৃতজ্ঞ হবার কিছু নেই। অসুস্থ মা'কে সুস্থ্য করে তুলা যেমন প্রতি সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব, তেমনি আক্রান্ত দেশে যুদ্ধ করাটাও প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। বাবা যুদ্ধ করে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। এতে দেশ তার কাছে ঋণী হত যদি আমার অসুস্থ দাদী তাঁর সুস্থতা অর্জনের জন্য আমার বাবার কাছে ঋণী হতেন। মোদ্দাকথা, মা কখনও সন্তানের কাছে ঋণী হতে পারে না, কোনভাবেই না।

সবাই লোভ দেখাল– কোটাভুক্ত হলে বিসিএস নিশ্চিত ছিল। আর এদিকে আমি কোটামুক্ত থেকে একটি বিশাল সাগর পাড়ি দিতে একাকী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছি। যোদ্ধার সন্তান যদি যুদ্ধই না বুঝে তবে সেটা কেমন মুক্তিযুদ্ধ। মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকুরি, সংসার, স্ত্রী’র লেখাপড়া, সন্তানের দেখাশোনা, অর্থকষ্ট, অফিস থেকে বিসিএস না দেয়ার চাপ প্রভৃতি প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিকূলতার মধ্যে একটি নতুন মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হলাম। এই যুদ্ধে জয়ী হবার যে প্রচেষ্টা তাতে সংগ্রামী বাবার থেকে পাওয়া শিক্ষাটুকুর অবদান ছিল তার মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটির থেকেও অনেক বেশী। তাই যুদ্ধ করেই যুদ্ধের শেষে এসে পৌছলাম।

২০০৬ সালের চৈত্রসংক্রান্তির দিন ২৫ তম বিসিএস- এর ফলাফল প্রকাশিত হল। আমার তখন টাঙ্গাইলে পোস্টিং। ভার্সিটি ক্লাসমেইট মান্নান ফোন করে জানালো সে বিসিএস (পুলিশ)- এ চান্স পেয়েছে। আমার রোল নম্বর জানতে চাইল। আমি কিছুটা সংশয় নিয়ে তাকে দিলাম। একটু পর ফোন ব্যাক করে সে জানালো আমারও পুলিশে হয়েছে এবং মেধা তালিকায় ৫৬তম।

আসমান-জমিন এক মনে হল। নিজের জীবনের ঐ সময়টা ১৬ ডিসেম্বররের মত অনুভূত হল। বাবাকে জানালাম আমার বিজয়ের কথা, স্ত্রীকে জানালাম মুক্তির কথা, বন্ধুদের জানালাম যুদ্ধের কথা আর আমি নিজে ভাবতে লাগলাম বাবার মুক্তিযুদ্ধ থেকে পাওয়া প্রেরণার কথা।

আসছে ১৬ ডিসেম্বর। হৃদয়ে যুদ্ধের দামামা আর বিজয়ের উল্লাস এক হয়ে মনের মধ্যে গড়ে উঠা হাজারটা বাগানের সবগুলো ফুল মুক্তিযোদ্ধাদের দেয়া হয়ে যাবে। বাবা থেকে প্রাপ্ত বংশপ্রবাহের ‘জীন’ই আমার বাবার ‘মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট', যা আমাকে ধারণ করে। তাই তো ‘বিজয়' মানেই আমার বাবা। বিজয় মানেই আমার সামর্থ। বিজয় মানেই আমার শক্তিশালী অতীত। বিজয় মানে নিজেই নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করা। বিজয় মানেই হাল ধরা। উল্লাস আর অহংকারের ফাঁদে ‘বিজয়' অনেকের বাসার শো-কেইজে ঢুকে যাচ্ছে। কিন্তু 'জীনে' অবস্থান নেয়া ‘বিজয়' কিভাবে কেড়ে নিবে? কেউ হয়তো বাবার সার্টিফিকেট ফিরিয়ে নিতে পারে, তাঁর ভাতা বন্ধ করে দিতে পারে, কিন্তু আমাদের দাবাতে পারবে না। যুদ্ধ আমাদের স্বভাবে, সার্টিফিকেটে নয়।

বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

(যারা বাবার সার্টিফিকেট ব্যবহার করেছেন তাদের প্রতি আমার পূর্ণ সম্মান রয়েছে। এখানে শুধু আমার নিজের জন্য আমার অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছি। দয়া করে কেউ ভুল বুঝবেন না।)

Bootstrap Image Preview