Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ১ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

মানুষকে সম্মান দিলে কখনো নিজেরটা কমে না

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই ২০১৮, ১১:৪২ AM
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৮, ০৩:০৬ PM

bdmorning Image Preview


তানজিলা ঐশী

বাংলাদেশে বসে আমরা যাদের বিজাতি, বিধর্মী, বেহায়া জাতি বলি, বিদেশে আসার পর সেই জাতির কিছু বৈশিষ্ট দেখে খুব অবাক হই। দেখি, এরা নিজের অজান্তেই আমাদের থেকে বেশি তাদের দৈনন্দিন জীবনে কোরান হাদিসের বিভিন্ন শিক্ষা অনুসরণ করে চলে। কি, আশ্চৰ্য না?

প্রথম যেদিন দোকানে যাই, সামান্য নার্ভাস অবস্থায় দাম দিতে দোকানির কাছে গেলে তিনি মিষ্টি হেসে জিজ্ঞেস করেন ‘ভালো আছো?’ আমি অবাক হই, ‘আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?’ ‘হ্যাঁ তোমাকেই।’ ‘জি আমি ভালো, আপনি কেমন?’ ‘আমিও ভালো’। তারপর জিনিসগুলো আমার হাতে দিয়ে বলেন ‘তোমার দিনটি শুভ হোক’। পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার পথে রাস্তায় নিতান্ত অপরিচিত প্রতিবেশীর সাথে দেখা হলে তিনি মিষ্টি হেসে বলেন ‘শুভ সকাল’। ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে দেখলাম একজন মা তার বাচ্চার স্ট্রলারটা ট্রেনে তুলতে চেষ্টা করছে, মুহূর্তেই দুইজন এসে তাকে সাহায্য করলো। ট্রেনে উঠে দেখি একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে দুই তিনজন সিট ছেড়ে দিয়ে বলছে, ‘তুমি বস আমি পরের স্টেশনেই নেমে যাবো’। আরেকদিন ইউনিভার্সিটি থেকে বাসায় ফেরার পথে দেখি আমাদের হাঁটার রাস্তার কিছুটা বন্ধ করে কাজ চলছে, যেকারণে আমাদের সামান্য ঘুরে যেতে হলো। পথের শেষেই এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা, পোশাক দেখে মনে হলো তিনি মেরামতকারীদের একজন। আমাদের ঘুরে যেতে দেখে তিনি বললেন ‘দুঃখিত, তোমাদের কষ্ট হলো!’ - “কিয়ামতের দিন মুমিনের পাল্লায় সবথেকে ভারি জিনিস হবে ভদ্র আচরণ” [আত‍্-তিরমিষী- ২০০২]।

ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে প্রত্যাশিতভাবেই বিভিন্ন দেশের, বিভিন্ন বর্ণ গোত্রের মানুষ দেখি। ধীরে ধীরে কারো কারো সাথে পরিচয়ও হয়। আশ্চৰ্য হয়ে লক্ষ্য করি যে এদের কৌতূহল শুধু আমি কোন দেশী আর আগে কোন সাবজেক্ট নিয়ে পড়েছি এইটুকুতেই সীমাবদ্ধ। কেউ জিজ্ঞেস করে না আমার বাবা কি করেন, আমি নিজের গাড়ি দিয়ে আসি নাকি পাবলিক ট্রান্সপোর্টে, নিজের বাড়িতে থাকি নাকি ভাড়া! পড়াশোনার বাইরে এদের কথা বেশিরভাগই কোথায় দেখবার মতো সুন্দর জায়গা আছে, কোথায় গেলে ভালো দামে জিনিস কেনা যায়, আগামী ছুটিতে প্রিয়জনদের নিয়ে কি করা যায়, কোথায় গাড়ি রাখা নিরাপদ নয় এইসব নিয়ে। এদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর মনে হয় আজ যেন অনেক নতুন জিনিস জানলাম! পরে যখন চাকরিতে ঢুকি, সেখানে গিয়েও দেখি অনেকটা একই অবস্থা। কার জিপিএ কত, অমুক বিয়ে করেছে কেন, তমুক বিয়ে করেনি কেন, বাচ্চা নেই কেন, বাচ্চা আছে কেন, বাচ্চা একটা কেন, ২টা ছেলে মেয়ে নেই কেন- এইসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে এরা অকারণ কৌতূহলও দেখায় না আবার আগ বাড়িয়ে অবান্তর উপদেশও দিতে আসে না। শুধুমাত্র কাউকে কোনো বিষয়ে সতর্ক করার প্রয়োজন পড়লেই এরা অন্যের বিষয় তুলে।- “নিঃসন্দেহে, একজন ব্যক্তির ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় হল যে সে তার সাথে সম্পর্কিত নয় এমন বিষয় ত্যাগ করে” [আত‍্-তিরমিষী ২৩১৮]।

বছরের শেষে অফিসে ডিনারের আয়োজন করে। সেখানে কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা আর সিইও টেরিকে কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম ‘এবার ক্রিস্টমাসে কি করছো?’। তিনি বললেন ‘তেমন কিছু না, ছেলেদের নিয়ে বাসায়ই থাকবো, রান্নাবান্না করবো। ছেলেদের মা ছুটি পাননি তো, তাই!’। আমি সামান্য অবাক হয়ে বলি ‘ও আচ্ছা! তোমার স্ত্রী কোন কোম্পানিতে আছেন?’ তিনি বলেন ‘ও একটা হাসপাতালে নার্স’। যদিও জানি যে এইসব দেশে নার্স হতেও অনেক পড়াশোনা করা লাগে, তাও অবাক হয়ে ভাবি যে যেই ব্যক্তি চাইলে নিজেই কয়েকটা হাসপাতাল বানিয়ে ফেলতে পারেন, তিনি এমন অবলীলায় তার একজন কর্মচারীকে বলছেন যে তার স্ত্রী ছুটি পাননি বলে তারা ঠিক মতো ক্রিস্টমাস পালন করতে পারছে না? এদিকে টেরির ছেলেও আমাদের কোম্পানিতে কাজ করে। বাবার অফিসে আমিই রাজা আর বাকিরা আমার নিচে- এই মনোভাব নিয়ে রোজ দেরী করে এসে পায়ের উপর পা তুলে বসে থাকে না সে। প্রাণপণ চেষ্টা করে তার সুপারভিসর আর কোম্পানির অন্য সিনিয়রদের ভালো কাজ দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে। মধ্য বয়স্ক এড্রিয়ান এমনি একজন সিনিয়র কর্মচারী। তিনি দেখি একদিন লাল রঙের কেইডস পরে অফিসে এসেছেন। আমি হেসে বলি ‘বাহ্! তোমার জুতো জোড়া তো খুব সুন্দর!’। উত্তরে তিনিও হেসে বলেন, ‘আর বলো না, আমার ছেলের পুরোনো জুতা, ডিজাইন পুরোনো হয়ে গেছে বলে ও আর পরে না। আমার পায়ে লাগে তাই আমিই পরে ফেললাম!’ - “অহংকার করে মানুষের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিওনা আর পৃথিবীতে গর্বের সঙ্গে পা ফেলো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ কোনো আত্মগর্বী ও অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” [কোরান ৩১:১৮]; “যে ব্যক্তির হৃদয়ে একটি পরমাণু পরিমাণ অহংকারও থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” [মুসলিম ৯১]।

এসব মানুষগুলোকে দেখে মাঝে মাঝে ছোটবেলার কথা মনে পরে। একদিন আব্বুর সাথে স্কুল থেকে ফিরার পথে জামে বসে আছি। সেই সময় এক বয়স্ক ভিক্ষুক এসে আব্বুকে সালাম দিয়ে বললেন ‘স্যার ভালো আছেন?’ ‘হ্যা ভালো, আপনি ভালো?’ ‘জি স্যার। এটা আপনার মেয়ে?’ ‘হ্যা।’ ‘আচ্ছা, দুয়া করি মা আল্লাহ ভালো রাখুক’। উনি চলে গেলে আব্বুকে জিজ্ঞেস করলাম এই লোকের সাথে পরিচয় কিভাবে হলো। তিনি বললেন, ‘ভদ্রলোক যেই চশমাটা পরে আছেন সেটা আমি বানিয়ে দিয়েছিলাম। এই সামান্য জিনিসটার জন্য তিনি দয়া করে আমাকে মনে রেখেছেন!’ তাকে সবসময় বলতে শুনতাম যে বাসার কাজের মেয়েটা ছোট কাজ করে বলে তাকে ছোট করে দেখার কোনো পথ নেই, সবাই সম্মানের সঙ্গে কাজ করে, কারো বেতন কম কারো বেশি। তিনি শিখাতেন রিকশাওয়ালাকে তুমি করে বলা যাবে না, তিনি বয়সে বড় মানে তিনি মুরুব্বি। বলতেন মিষ্ট ব্যবহার মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণগুলোর একটি। তাকে প্রতিনিয়তই বলতে শুনতাম, মানুষকে দিলে কখনো নিজেরটা কমে না, সেটা অর্থ বা সম্মান যাই হোক। একদিন বললেন ‘মাগো, যদি কোনো অর্জন তোমাকে অহংকারী করে, তবে সেই অর্জন করার থেকে না করাই ভালো’। তার কাছ থেকে শিখেছি যে যেই মুহূর্তে আমি মনে করবো আমি কারো থেকে উত্তম, ঠিক সেই মুহূর্তে আমি তার থেকে অনেক নিজে নেমে যাবো, কারণ এই বৈশিষ্ট শয়তানের বৈশিষ্ট - “আমি তাঁর (আদম) চেয়ে উত্তম, আপনি আগুন থেকে আমাকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে।” [কোরান ৭:১২]।

আজকে ১৫ জুলাই আব্বুর জন্মদিন (ভাষাসৈনিক ইঞ্জিনিয়ার সাবির আহমেদ চৌধুরী)। তাকে নিয়ে অনেক মোটা মোটা বই ইতিমধ্যে লেখা হয়ে গেছে। আমি আমার স্বল্প মেধায় আর কাঁচা হাতে এই ছোট লেখাটির থেকে বেশি কিছু লিখতে পারলাম না। শুভ জন্মদিন আব্বুকে।

Bootstrap Image Preview