Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

নব্য-উদারীবাদ কি মার্ক্সবাদের বিপক্ষ-তত্ত্বায়ন নয়?

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০১৮, ০৮:৫৯ PM আপডেট: ১৬ মে ২০১৮, ০৯:১৯ PM

bdmorning Image Preview


সোহানুজ্জামান।।

নব্য-উদারীবাদ এমন একটি প্রত্যয়, যে প্রত্যয় সরাসরি সম্পৃক্ত পুঁজিবাদের সাথে, সম্পৃক্ত বিশ্বায়নের সাথে এবং একইসাথে সহযোগী সাম্রাজ্যবাদের ; কিন্তু আসলে তা হওয়ার কথা ছিল না। হাল আমলে পুঁজিবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদের নতুন প্রোপাগান্ডা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে নব্য- উদারীবাদকে। যেটা সরাসরি মার্ক্সবাদের বিপক্ষে গিয়ে একটি তত্ত্বায়ন-এভাবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

মূলত তাই-ই। এতে আর কোনো সন্দেহ নেই। সন্দেহ থাকার কোনো কারণ নেই, কারণ এটা বেশিই বাস্তব; যা বলার অপেক্ষা রাখে না। উদারীবাদ কথাটি উনিশ শতকে ইউরোপে প্রবর্তিত হয়েছিল, নতুন একটি ভাবনা হিসেবে, নতুন প্রয়োজনে, তা অবশ্যই ছিলো মানবিক উদ্দেশে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রবর্তিত এই নব্য-উদারীবাদ এর ধারণাটি সেই উনিশ শতকের ইউরোপের উদারীবাদের ধারণা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।

কারণ, এর সাথে কোনোভাবেই মিল খুঁজে পাওয়া যায় না উদারীবাদের। কারণ, উদারীবাদ যে চিন্তা-চেতনা এবং ধ্যান-ধারণা নিয়ে সামনে এগিয়েছিলো তার সাথে বিস্তর ফারাক নব্য-উদারীবাদের। নব্য-উদারীবাদ গুরুত্ব দেয় সবসময় মুক্ত-বাজার অর্থনীতি এবং মুক্ত-বাজার অর্থনীতিতে বিদ্যমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাকে। দীর্ঘস্থায়ি উন্নয়নের নামে পুরো পৃথিবী দখলের এবং শাসনের কথা বলে নব্য-উদারীবাদ।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো উন্নয়নের নামে যে শুধু উন্নয়ন করে তা নয়, নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্যই তারা বিনিয়োগ হিসেবে এ কাজে নিজেদেরকে নিয়োগ করে। উপরে উপরে উন্নয়নের কথা বললেও, তলে তলে তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে শোষণ এবং পুঁজিবাদের মৌল স্বার্থ হাসিলের। এবং এর মাধ্যমে নব্য-উপনিবেশবাদের বিষয়টি আরো দীর্ঘতর হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

এর মাধ্যমেই অস্ফুট ও অস্পষ্ট উপনিবেশবাদ, যা বিবেচিত হয় নব্য-উপনিবেশবাদ হিসেবে, তাই-ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর ফলে ভূমির সাথে সম্পৃক্ততাহীন উপনিবেশবাদের ভিত্তি যেন আরো শক্ত হয়ে উঠেছে, উঠছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এবার আলোচনা করা উচিৎ উনিশ শতকের উদারীবাদ নিয়ে। কারণ, ইউরোপের সে সময়ের উদারীবাদের মৌলিক তত্ত্ব নিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে, হয়ে উঠেছে নব্য-উদারীবাদ।

বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বুদ্ধিজীবী নিয়োগ করা হয়েছে আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। খোলা হয়েছে উদারীবাদের স্কুল। যারা নিজ দেশে জায়গা পায় নি, তারাই এসে আমেরিকাতে উদারীবাদের আলোচনা করেছে, করছে। কিন্তু ইউরোপে, উনিশ শতকে যে ধরনের উদারীবাদ তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলো সে উদারীবাদের সাথে বর্তমান নব্য-উদারীবাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

এডাম স্মিথের ‘ওয়েলথ অব নেশন্স’ এ যে ধরনের অর্থনীতির কথা বলা হয়েছে, তা কি শুধু-ই অর্থনীতির কথা বলে? বলে না। কারণ, মার্ক্সবাদের সাথে যদি মিল খুঁজতে যেতে হয়, তাহলে অবশ্যই এডাম স্মিথের কাছে ফিরে যেতে হবে। কারণ, কার্ল মার্ক্স এডাম স্মিথের কাছ থেকে দেদারসে অর্থনীতির তবক নিয়েছেন, তাঁর মার্ক্সবাদের পরিচ্ছদ সাজাতে। আর এডাম স্মিথের অর্থনীতির তত্ত্বের সাথে মার্ক্সবাদের অনেক সামঞ্জস্য বিদ্যমান। তাছাড়া সে সময়ে উদারীবাদের সাথে মিল রয়েছে ব্যক্তির বেড়ে ওঠার বিষয় যেমন, তেমনি করে এই উদারীবাদের সাথে সামাজিক নানা বিষয় আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য যেমন আলোচনা হয়েছে, তেমনি সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক নানা ধরনের সংস্কারের কথা বলা হয়েছে উনিশ শতকের উদারীবাদে।

কিন্তু নব্য-উদারীবাদ শুধু কথা বলে মুক্ত বাণিজ্য এবং সাম্রাজ্যবাদের। এডাম স্মিথের ‘ওয়েলথ অব নেশন্স’-এর সাথে নব্য-উদারীবাদের বাইবেল হিসেবে বিবেচিত ডেভিড হার্ভের বই, যাকে বলা হয় “নব্য-উদারীবাদের বাইবেল”, ‘এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব নিওলিবারালিজম’ এর তুলনামূলক আলোচনা করলেই বোঝা যাবে যে কোনটি কোন উদ্দেশে লেখা। ফলে মার্ক্সবাদের যে সাধারণ ধারণা আছে, তার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে নব্য-উদারীবাদ।

এবং মার্ক্সবাদ এবং রেনেসাঁসের কাউন্টার থিয়োরাইজেশন হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে নব্য-উদারীবাদকে। এর পিছনে আর কিছুই বলার নেই। এবার আসি ‘নব্য’ নাম দিয়ে পুরোনো মানবিক বিষয়গুলোকে কিভাবে অমানবিক করা হয়েছে। প্রথমে আলোচনা করা যেতে পারে ‘আধুনিকতা’র বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কিভাবে ‘আধুনিকতাবাদ’ আধুনিকতা থেকে সরে এসে বিমানবিকীকরণের মধ্যে চলে এসেছে।

আধুনিকতা বিষয়টা রেনেসাঁস স্পিরিট দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এবং ধারণ করেছিল রেনেসাঁস স্পিরিটকে। কিন্তু আধুনিকতাবাদ এসেছিলো কাউন্টার-মডার্নিটি, কাউন্টার রেনেসাঁস হিসেবে। শ্রেয়োবাদের বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে ব্যাপারটা আরো পরিষ্কার হবে, যদি কেউ শ্রয়েডিঙ্গারের শ্রেয়োবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। ফলে আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক সংস্কার সহ নানা সংস্কারের দ্বারা ঋদ্ধ হয়ে যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয়েছিল, সরাসরি তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল আধুনিকতাবাদ।

ইতালিয় মার্ক্সবাদি দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ আন্তনিও গ্রামসি মার্ক্সবাদি তাত্ত্বিক হিসেবেই আলোচিত হয়ে আসছিলেন। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের প্রথমভাগে ডেভিড হার্ডিম্যান, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক, রনজিৎ গুহরা এই তত্ত্বকে নিয়ে যে নিম্ন-বর্গের ইতিহাসের বয়ান দাঁড় করান তাতে করে গ্রামসিকে আর তাঁর মূল অবস্থানে বা প্রবণতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।

অর্থাৎ রেটোরিক্যালি যদিও গ্রামসিকে সামনে আনা হয়েছে, কিন্তু তার পিছে একটি গভীর উদ্দেশ্য বিদ্যমান। এখানে গ্রামসিকে আনা হয়েছে বুলিসর্বস্ব করে, কিন্তু গ্রামসির মূল যে উদ্দেশ্য ছিল তা বাদ দিয়ে নতুন উদ্দেশে গ্রামসিকে ব্যবহার করেছেন তাত্ত্বিকরা এবং তাত্ত্বিকদের ভরণপোষণকারীরা।

গ্রামসি জেলে থাকার ফলে মার্ক্সবাদের মূল বিষয়গুলো একটু অন্যভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। সেটাই সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছে পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। এবং সেই আলঙ্করিক শব্দগুলো, যা গ্রামসি ব্যবহার করেছিলেন তাঁর ‘প্রিজন নোটবুকস’-এ, কারারক্ষী ও সরকারের হাত থেকে বাঁচার জন্য, তাই-ই ব্যবহার করে সুযোগ গ্রহণ করছে সাম্রাজ্যবাদী, নব্য-উপনিবেশবাদী, পুঁজিবাদী দেশসমূহ। ফলে গ্রামসির মহৎ উদ্দেশ্য এখন সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর খপ্পরে পড়েছে। এবং তারা একে যাচ্ছেতাই ভাবে ব্যবহার করছে, নিজেদের স্বার্থের ক্ষেত্রে, প্রয়োজনে।

ফলে এ সমস্ত তত্ত্ব যে খারাপ সে কথা আমি বলছি না। কিন্তু নিয়তই স্বার্থ হাসিলের জন্য খারাপ করে তোলা হচ্ছে। ধরা যাক, নিম্ন-বর্গের যে ইতিহাসের পাঠের সূচনা হয়েছিল আশির দশকে, তাকে আমি কোনোভাবেই খারাপ চোখে দেখছি না, কারণ তার মৌল-প্রবণতা যদি মানব কল্যাণে কাজে লাগানো যায় তাহলে তা ইতিহাস-পাঠের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে কাজে লাগবে।

কিন্তু নিম্ন-বর্গের ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয়েছিল মার্ক্সবাদের বিপক্ষ তত্ত্বায়ন হিসেবে। ষাটের দশকের সেই শীতল যুদ্ধের কথা স্মরণ রেখে; আর স্মরণ রেখে বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রের প্রচলন, পুঁজিবাদি রাষ্ট্র চাচ্ছিল এমন একটি তত্ত্ব দাঁড় করাতে, যে তত্ত্বের মাধ্যমে সহজেই মার্ক্সবাদকে দমিয়ে দেওয়া যাবে, এবং এই তত্ত্বায়নে আলঙ্কারিকভাবে ব্যবহার করা হবে মার্ক্সবাদকেই। দারুণ। পারেন বটে এরা! সেটাই, যা হওয়ার কথা ছিল ইতিহাসের নতুন ধারা, তাই হয়ে গেল সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদি শক্তির বিশেষ প্রোপাগান্ডা।

উপরের যে আলোচনা তাতে করে নব্য-উদারীবাদের প্রতি আমার কোনো বিরোধিতা থাকত না, যদি না এটি মার্ক্সবাদের বিপক্ষে গিয়ে পুঁজিবাদ বা সাম্রাজ্যবাদের সহচর হিসেবে কাজ করত। কিন্তু ‘নব্য’ নাম নিয়ে অনেক তত্ত্বের তত্ত্বায়ন নিয়তই সেই কাজ-ই করে যাচ্ছে। ফলে, যেটি হতে পারত মানবিক, সেটাই আজ অমানবিক হয়ে দাঁড়াচ্ছে; এবং দাঁড়াবে। তাই এই তত্ত্বায়নের মৌল-প্রবণতাকে মানবিক কাজে ব্যবহার করতে হবে, অমানবিক কাজের জন্য নয়। যেমনটা পশ্চিমা শক্তিগুলো করে আসছে।

Bootstrap Image Preview