Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ বুধবার, অক্টোবার ২০১৮ | ২ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ধর্ষণ কেন হয়? একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ এপ্রিল ২০১৮, ০৬:৩৯ PM
আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০১৮, ০৪:১৩ PM

bdmorning Image Preview


ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস।।

ছয় বছরের শিশু, আপাদমস্তক বোরকাবৃতা কিংবা ৬০ বছরের বৃদ্ধারা ধর্ষিত হওয়ার মেডিকেল ব্যাখ্যাটা অনেক পুরনো।

অবিশ্বাস্য ব্যাপার হলেও সত্য ১৩৮ বছর আগে রাশিয়ান বিজ্ঞানী পাভলভ এই ব্যাখ্যাটা দিয়ে গেছেন। বিজ্ঞানী পাভলভের এই কনসেপ্ট প্রত্যেক ডাক্তারকে তার মেডিকেল লাইফের সেকেন্ড ইয়ারে পড়তে হয়। সহজভাবে বলার চেষ্টা করি, নন-মেডিকেলদের জন্য দেখি বলতে পারি কিনা।

বিজ্ঞানী পাভলভ একদল কুকুরকে ল্যাবে বেঁধে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। তিনি প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে তাদের খাবার দিতেন। কুকুরের সামনে থাকত খাবারের বাটি এবং আয়না। সেখানে পাভলভ কুকুরের আচরণ পর্যবেক্ষণ করতেন। প্রতিদিন ঠিক একই সময়গুলোতে কুকুরগুলোকে খাবার দেয়া হতো। পাভলভের সঙ্গে থাকতেন তার ল্যাব সহকারী। খাবার গ্রহণের সময় কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটি একটি কন্টেইনারে মাপা হতো। ব্রেইনের স্বাভাবিক রিফ্লেক্স হলো খাবার গ্রহণের সময় লালা ঝরা। কিন্তু পাভলভ দেখলেন যে- খাবার গ্রহণ নয়, খাবার দেখেও এবার কুকুরের লালা ঝরতে শুরু করেছে। পাভলভ খাবার দেখে কুকুরের কী পরিমাণ লালা ঝরত সেটিও কন্টেইনারে মাপার ব্যবস্থা করলেন।

বেশ কিছু দিন যাওয়ার পর পাভলভ দেখলেন তিনি ল্যাবে ঢুকলেই কুকুরের লালা বের হচ্ছে। সঙ্গে খাবার থাক আর না থাক।

পাভলভ এবার নিজে ল্যাবে না গিয়ে খাবারবিহীন অবস্থায় তার ল্যাব সহকারীকে ল্যাবে পাঠালেন। ল্যাব সহকারী অবাক হয়ে দেখলেন তাকে দেখেও (ল্যাব সহকারী) কুকুরের লালা ঝরছে। পাভলভ এবার ভিন্ন কিছু করলেন। তিনি কুকুরকে খাবার দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে একই সময়ে একটি ঘণ্টি বাজাতে থাকলেন। খাবার দেয়া হচ্ছে এবং ঘণ্টি বাজানো হচ্ছে।

এরপর পাভলভ এবং সহকারী একদিন খাবার ছাড়াই ল্যাবে আসলেন এবং ঘণ্টি বাজাতে শুরু করলেন। দেখলেন খাবার না দেয়া সত্ত্বেও কুকুরগুলোর একই পরিমাণ লালা ক্ষরণ হচ্ছে।

পাভলভ সিদ্ধান্তে আসলেন খাবারের প্যাকেট, ল্যাব অ্যাসিস্টেন্ট, ঘণ্টির শব্দ, এগুলো সব নিউট্রাল স্টিমুলেশন। এগুলোর সঙ্গে লালা ক্ষরণের সম্পর্ক নেই। কিন্তু কুকুর তার লার্নিং বিহেভিয়ারে খাবারের সঙ্গে খাবারের প্যাকেট, পাভলভ, ল্যাব সহকারী বা ঘণ্টার শব্দকে কো রিলেট করে ফেলেছে এবং খাবারের সঙ্গে যা যা ঘটে সব কিছুকেই লালা ক্ষরণের উপাদান হিসেবে তার ব্রেইন ডিটেক্ট করছে।

ব্রেইনের এই লার্নিং মেথডকে তিনি “কন্ডিশনিং” এবং “কন্ডিশন্ড রিফ্লেক্স” বলেছেন। অর্থাৎ ব্রেইন এমন একটি স্টিমুলেশনের প্রতি সাড়া দিচ্ছে, যেটিতে ব্রেইনের আদৌ রেস্পন্স করা উচিত না, কিন্তু করার কারণ হচ্ছে ব্রেইন এই স্টিমুলেশনকে আরেকটি স্টিমুলেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ফেলেছে।

৬ বছরের মেয়ে, বোরকাবৃতা মেয়ে কিংবা ৬০ বছরের বৃদ্ধা স্বাভাবিকভাবে যৌনানুভূতি সৃষ্টি করে না। কিন্তু লার্নিং মেথডের কন্ডিশনিংয়ের কারণে একজন ধর্ষকের ব্রেইনে এটি মারাত্মক উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে।

কীভাবে এই কন্ডিশনিং হচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথের ডিরেক্টর ড. আলিয়াস বলেছেন, মানুষের পার্সোনালিটি লার্নিং হয় তিনটি শিক্ষা, সঙ্গ এবং পরিবেশ- এই তিনটি প্রধান ফ্যাক্টর দ্বারা। আসুন আমরা দেখি শিক্ষা, সঙ্গ এবং পরিবেশ থেকে আমরা মেয়েদের ব্যাপারে কী প্রি-কনসেপ্সন পাচ্ছি?

ক্লাস এইটে “নিজেকে জানো” বইতে ইয়াং পোলাপাইনকে কী শিখাচ্ছেন?

-পরস্পরের সম্মতিতে যৌন অনুভূতি প্রকাশ দোষণীয় নয়।

ক্লাস নাইনে “হাজার বছর ধরে” উপন্যাসে ইয়াং পোলাপাইনকে কী শিখিয়েছেন?

-হাজবেন্ডকে ফাঁকি দিয়ে অন্যের সঙ্গে সহীহ পরকীয়ার কলাকৌশল।

তের-চৌদ্দ বছর বয়সে একটা ছেলে যখন হাজার বছর ধরে উপন্যাস পড়ে এবং সেখানে টুনি মন্টুর প্রেমকাহিনী পড়তে পড়তে সে অবচেতনভাবে ছেলেটি নিজেকে মন্টু আর মেয়েকে টুনি ভাবে এবং এই ভাবনা নিউরোলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু স্বাভাবিকই নয়, বরং না ভাবাটাই অস্বাভাবিক।

ক্লাস ইলেভেনে “পদ্মা নদীর মাঝি” উপন্যাসে ইয়াং পোলাপাইনকে কী শিখিয়েছেন?

-ওয়াইফকে ফাঁকি দিয়ে শালীর সঙ্গে সহীহ পরকীয়ার কলাকৌশল।

কুবের কপিলার সম্পর্ক পোড়ার পর, আপনি আপনার শালীকে কী চোখে দেখেন? বাংলা সাহিত্যের গল্প, নাটক, উপন্যাস, কবিতায় নারীকে কী হিসেবে চিত্রিত করেছেন কবি সাহিত্যিকরা? এই গল্প/সাহিত্য আপনার মস্তিষ্কে কী ধরনের চিত্রকল্প তৈরি করে?

ক্লাস ইলেভেনে “শকুন্তলা নিবন্ধে” ইয়াং পোলাপাইনকে কী শিখিয়েছেন?

"শকুন্তলার অধরে নবপল্লবশোভার সম্পূর্ণ আবির্ভাব; বাহুযুগল কোমল বিটপের বিচিত্র শোভায় বিভূষিত; আর, নব যৌবন, বিকশিত কুসুমরাশির ন্যায়, সর্বাঙ্গ ব্যাপিয়া রহিয়াছে"। গাছের বাকলপড়া শকুন্তলার বর্ণনা আপনার মনের মধ্যে কী ধরনের ছবি উপস্থাপন করে? -শকুন্তলার নগ্ন দেহের রগরগে বর্ণনা।

শকুন্তলার দেহের বর্ণনার এই লাইনগুলো আপনার কল্পনার চিত্রনাট্যে কী ধরনের ছবি তুলে ধরে?

সাহিত্যগুলোতে নারীকে কী রূপে উপস্থাপন করছেন? -ভোগ-বিলাসের সামগ্রী।

বিজ্ঞাপনে নারীকে কী হিসেবে উপস্থাপন করছেন? -ভোগপণ্য।

নাটক, টেলিফিল্ম, ছায়াছবিতে নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করছেন? -ভোগপণ্য, কামনার প্রতিমা।

ছায়ানট, শিল্পকলা একাডেমি, চারুকলা, ললিতকলায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করছেন? -ভোগপণ্য, কামনার প্রতিমা।

মিডিয়ায় নারীকে কীভাবে উপস্থাপন করছেন? -ভোগপণ্য, কামনার প্রতিমা।

এইডসের বিজ্ঞাপনে কী শেখাচ্ছেন?

-বাঁচতে হলে জানতে হবে (মানামানির দরকার নেই, জানলেই হবে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে তো এইডসের জ্ঞান নেই বললেই চলে, তাই তাদের মধ্যে এত এইডস!)

একজন মিথ্যাবাদী, প্রতারক, উচ্চাভিলাষী, অল্প শিক্ষিত, চরিত্রহীন, পতিতা কোয়ালিটির মেয়েকে দেশের সেরা মেয়ে করার নষ্ট প্রতিযোগিতা নিয়ে অনলাইন অফলাইন মিডিয়ার গোষ্ঠী উদ্ধার আর তার পেছনে পতিতার খদ্দের দেশের তামাম বিখ্যাত সব কর্পোরেট হাউজের ছুটে চলার মাধ্যমে কী শেখাচ্ছেন জেনারেশন নেক্সটকে? (মিস বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান নিয়ে কামড়াকামড়ি)।

আমাদের সাহিত্য, নাটক, শিল্পকলা, বিজ্ঞাপন, সংস্কৃতি একটা ছেলের মনে একটা মেয়ে সম্পর্কে কি ধরনের ইমেজ দিচ্ছে? এই একটা বিশেষ ছাঁচেই ছেলেদের চেতনা গড়ে উঠছে, এটাই ব্রেইনের স্মৃতিভাণ্ডারে জমা হচ্ছে। আসলে ব্রেইনের প্রি-কনসেপশনে বা স্মৃতিভাণ্ডারে নারী মানেই এমন একটি সত্তা যাকে দিয়ে দেহের এবং মনের ক্ষুধা মেটানো যায়।

এরপর যখন বলেন, নারীকে সম্মান করতে হবে, মায়ের-বোনের দৃষ্টিতে তাকাতে হবে, সেটা অনেকের ব্রেইন মেনে নেয় না। কারণ পরিবেশ থেকে নারী সম্পর্কে ব্রেইনে একটা কনসেপ্টই এস্টাব্লিশ হয়েছে– ভোগ্যপণ্য!

এই প্রি-কনসেপশন থেকেই ৬ বছর, ৬০ বছরের নারী কিংবা বোরকাবৃতা, যেই হোক ধর্ষণেচ্ছা থেকে কেউই রেহায় পাচ্ছে না।

মেডিকেলীয় টার্মে প্রত্যেক রোগের তিনটি ডায়মেনশন আছে–Agent (রোগের কারণ), Host (যার মধ্যে রোগের কারণ বা জীবাণু আক্রমণ করে) এবং Environment (যে পরিবেশে রোগ হয়)।

উদাহরণস্বরূপ টাইফয়েড রোগের এজেন্ট- হচ্ছে সালমনেলা ব্যাকটেরিয়া। হোস্ট– টাইফয়েড রোগী যিনি ব্যাকটেরিয়া আক্রান্ত পানি/খাবার ভক্ষণ করেছেন। আর পরিবেশ হচ্ছে–দূষিত পানি/খাবার।

আবার সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এজেন্ট– অদক্ষ/মাদকাসক্ত ড্রাইভার। হোস্ট– ফিটনেসহীন গাড়ি আর এনভায়রনমেন্ট– আঁকাবাঁকা রাস্তা, রং পার্কিং, অস্পষ্ট রোড সাইন।

এই এজেন্ট, হোস্ট এবং পরিবেশের মিথস্ক্রিয়ায় রোগ হয়।

ধর্ষণ একটি নৈতিক রোগ যার এজেন্ট– বিকৃতকাম নৈতিকতা বিবর্জিত পুরুষ। হোস্ট– নারী আর পরিবেশ– যৌন সুড়সুড়িময় পরিবেশ যেটির কথা আগেই উল্লেখ করেছি।

এখন মেডিকেলীয় পদ্ধতিতে টাইফয়েড নিয়ন্ত্রণের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হবে (সালমনেলা ব্যাক্টেরিয়াকে মেরে ফেলার জন্য তথা এজেন্ট কন্ট্রোল করার জন্য) দূষিত খাবার/পানি খাওয়া যাবে না (হোস্ট কন্ট্রোল) এবং পানিদূষণ ও খাবারদূষণ বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

তেমনি সড়ক দুর্ঘটনা বন্ধে ড্রাইভারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান, তাদের মধ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণ (এজেন্ট কন্ট্রোল), ফিটনেসবিহীন গাড়ির রুট পারমিট বাতিল (হোস্ট কন্ট্রোল) আঁকাবাঁকা রাস্তা, রং পার্কিং, অস্পষ্ট রোড সাইন বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

তেমনি ধর্ষণ বন্ধের জন্য দৃষ্টান্তমূলক উন্নত শাস্তি, পুরুষদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা জাগ্রত করা (এজেন্ট কন্ট্রোল)। নারীদের সভ্যভাবে চলতে উদ্বুদ্ধকরণ (হোস্ট কন্ট্রোল) এবং নাটক, গান, গল্প সাহিত্য, বিজ্ঞাপনে নারীকে পণ্যরূপে উপস্থাপন বন্ধ করতে হবে (এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল)।

আমার আছে অ্যান্টিবায়োটিক, আমি ইচ্ছামতো বিশুদ্ধ দূষিত সব খাবো কিন্তু টাইফয়েড হবে না– এটা হয় না।

তেমনি নৈতিকতাবোধ জাগ্রত না করে, নারীদের সভ্যভাবে চলতে না বলে, পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ না করে, শুধু পুরুষদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ হবে না।

কারণ আইনের দৌড় খুব সীমিত। সন্তান মাকে হত্যা করছে, মা সন্তানকে হত্যা করছে, স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে– আইন এখানে কী ই বা করবে? পাহারা দিয়ে, আইন করে অন্যায় বন্ধ করা যায় না; যদি না মূল্যবোধ জাগ্রত হয়। ধর্ষণে প্রথম স্থান (সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী) অধিকার করে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে।

লেখক: ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস, রেসিডেন্ট (নিউরোলজি), বিএসএমএমইউ।

Bootstrap Image Preview