Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১১ মঙ্গলবার, ডিসেম্বার ২০১৮ | ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘ডিসেকশন হলের পেছনে স্ট্রেচারে তিনটি মৃতদেহ রাখা ছিল’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৯:২৯ PM
আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৯:২৯ PM

bdmorning Image Preview


প্রফেসর ডা. আফজালুন নেছা।।

১৯৫২ সালে আমি ছিলাম ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। আমাদের ব্যাচে তখন মাত্র দুইজন মেয়ে শিক্ষার্থী পড়তো। একজন আমি, আরেকজন ডা. জাহানারা রাব্বী (শহীদ ডা. ফজলে রাব্বীর স্ত্রী)। সেই অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী ছিলাম আমি, যা আমাদের দেশের ইতিহাস চিরদিনের মতো বদলে দিয়েছিল।

একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আগের দিন রাতেই ছাত্রনেতারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে ১৪৪ ধারা ভেঙে আন্দোলন হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ছেলেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মিছিল করে। পুলিশের সাথে ছোটখাটো সংঘর্ষ প্রায় বেঁধে ছিল। সেই স্মৃতি আজও মুছে যায়নি।

আমাদের মেয়েদের হল থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম পুলিশের সাথে ছাত্রদের ইট পাটকেল ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ হচ্ছে। বিকেল ৩টার সময় হঠাৎ গুলির শব্দ পেয়ে দৌড়ে বারান্দায় আসি আমি।দেখি সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে চারদিকে ছুটছে, জীবন বাঁচাতে পালাচ্ছে।আহ! কি করুণ দৃশ্য।

সকাল থেকে আন্দোলনকারীদের যেই উত্তাল গর্জনে ক্যাম্পাস প্রকম্পিত হচ্ছিল, হঠাৎ করেই যেন তা শ্মশানের মত নীরব হয়ে গেল।বিকেল চারটার দিকে দেখলাম, সাদা শাড়ি পরা এক বিধবা বৃদ্ধা আর একজন অল্পবয়সী মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ডিসেকশন হলের দিকে দৌড়াতে দৌঁড়াতে যাচ্ছে। হল থেকে কয়েকজন মেয়ে মিলে গেলাম ডিসেকশন হলের পেছনে। সেখানে দেখলাম, স্ট্রেচারে তিনটি মৃতদেহ রাখা। তখন লাশগুলোর পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি, পরে শুনেছিলাম সেখানে শহীদ সালাম আর শহীদ বরকতের লাশ ছিল।

২২শে ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো দেশে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। বাঙালি তখন একটাই কথা জানে,একটাই কথা বুঝে আর একটাই কথা বলে- “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”।

২৩ তারিখে মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্ত নিল, শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। স্তম্ভটির নকশার দায়িত্ব দেয়া হল আমার স্বামী ডা. বদরুল আলমের উপর। তিনি তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। তিনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই একটি নকশা তৈরি করে দিলেন। ২৩ তারিখ রাতেই ডিএমসির প্রায় তিনশ ছাত্রছাত্রী স্মৃতিস্তম্ভ তৈরির কাজে লেগে গেল। কারফিউয়ের মধ্যেও সবকিছু তুচ্ছ করে আমরা নেমে পড়েছিলাম। নির্মাণাধীন কলেজ বিল্ডিংয়ের গুদাম থেকে ইট,বালু,সিমেন্ট জোগাড় করা হলো। স্ট্রেচারে করে ইট,বালু নিয়ে এসেছিলাম, বালতি ভরে পানি এনেছিলাম। সারারাত কাজ করে ভোর পাঁচটার দিকে তৈরি হল দেশের প্রথম শহীদ মিনার।

এখন যেখানে আউটডোর বিল্ডিংয়ের সামনের ডিস্পেন্সারী স্টোর। সেখানেই ছিল প্রথম শহীদ মিনার। আমাদের মেয়েদের হল থেকে মাত্র দুইশ গজ দূরে শহীদ মিনারটি।মিনারটির চারদিকে লাল সালু দিয়ে ঘেরা আর দুটি পোস্টার লাগানো ছিল তাতে। একটিতে লেখা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’, আরেকটিতে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। পরদিন সকাল থেকেই সেখানে মানুষের ঢল নামে। স্তম্ভটি উদ্বোধন করেন শহীদ সফিউর রহমানের পিতা। সবাই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছিল। আমার এখনো মনে আছে, এমিরেটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মা এসেছিলেন। উনি ওনার গলা থেকে সোনার চেন খুলে দিলেন।

২৬ তারিখ সকালে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর ট্রাক এসে আমাদের ক্যাম্পাস ঘিরে ফেললো। তারা এসেছিল শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলতে। দড়ি দিয়ে স্তম্ভটিকে বেঁধে ১০-১২ জন মিলে টেনে উপড়ে ফেললো। তারপর ট্রাকে তুলে নিয়ে চলে গেলো। সেই ফাঁকা জায়গাটিতে আমরা বাঁশের কঞ্চি গেঁথে কালো কাপড়ের নিশান লাগিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখলাম।

দুই বছর পরে, ১৯৫৪ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ এসে আবার আমাদের ক্যাম্পাস ঘিরে ফেললে ডিএমসির মেয়েরা প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নেই। হলের গেট বন্ধ করে ছাদ থেকে আমরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ছুঁড়তে থাকি, এতে কয়েকজন আহত হয়। তালা ভেঙে পুলিশ আমাদের হলে ঢুকে ১৫ জন মত ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে। ধরে নিয়ে যাবার সময় আমরা চিৎকার করে স্লোগান দিতে থাকি-‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। আমাদের রাখা হয়েছিল সেন্ট্রাল জেলে, পনের দিন পর পুলিশ আমাদের ছেড়ে দেয়।

শহীদ মিনার তৈরির সেই অবিস্মরণীয় রাতের কথা এখন ৬৬ বছরের অতীত। অথচ সেই রাতের প্রত্যেকটি মুহূর্ত এখনো মানসপটে জ্বলজ্বল করে। কি প্রবল দেশপ্রেমেই না আমরা তখন উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম। মাত্র এক রাতে আমরা এমন এক স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করি যা ভবিষ্যতে আমাদের সকল আন্দোলনের পীঠস্থান হয়ে থাকবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রাঙ্গণ থেকেই যেই আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা একদিন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে যার ফলাফল হলো আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন - স্বাধীনতা।

Professor Dr. Afzalun Nessa DMC K-10 Retired Professor of Anesthesiology, BSMMU

Bootstrap Image Preview