কোটা প্রথার সংস্কার ও কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

আল-আমিন হুসাইন।।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পরেও সরকারি চাকরি নিয়ে রয়ে গেছে বৈষম্য। পক্ষপাতিত্বের কারণে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে এদেশের মানুষ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হতো। আর এখন কোটা ব্যবস্থার কারণে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে দেশের যোগ্য ও মেধাবীরা।

বাংলাদেশে প্রতিটি বছর যে পরিমাণ উচ্চ শিক্ষিত চাকরি প্রত্যাশী আসছে সেই হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে চাকরি এখন সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে বিশেষ করে ক্যাডার সার্ভিস বা বিসিএস। আবার সরকারি চাকরির পেনশন, বোনাস, ভাতা, উৎসবভাতাসহ বাড়তি সুযোগ সুবিধা থাকায় দেশের শিক্ষিত যুবকরা এখন ছুটছে সরকারি চাকরির জন্য। বছরের পর বছর এই চাকরি প্রত্যাশিরা পড়াশোনা করছেন এই আশায়।

তবে সবশেষে হতাশ হচ্ছেন চাকরি ক্ষেত্রে কোটা থাকায়। দীর্ঘদিন ধরে কোটা পদ্ধতির সংস্কার নিয়ে কথা উঠলেও এবার সবচেয়ে বড় আন্দোলন সমাবেশে রাস্তায় নেমেছে চাকরি প্রত্যাশীরা।

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি নিয়ে গতকাল রাজধানীতে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও সমাবেশ করেছে দুই পক্ষ। শাহবাগে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিক্ষোভ সমাবেশ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীরা।

বিগত কয়েকদিন ধরে এই বিক্ষোভ সমাবেশ করছিল বিভিন্ন বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে আগামীকাল সম্ভত এটা সবচেয়ে বড় সমাবেশ ছিল।

বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্রঅধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে এক ঘণ্টার ওই কর্মসূচিতে শত শত শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তারা মূলত কোটা সংস্কারের নিয়ে এই বিক্ষোভ করে। বাংলাদেশে এখন সরকারির ক্ষেত্রে ৫৬ শতাংশ কোটা আছে। মেধায় নিয়োগ হচ্ছে ৪৪ শতাংশ।

বিক্ষোভ কর্মসূচিতে তারা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে। দাবিনামায় ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কোটার পরিমাণ ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেওয়া, সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।

বর্তমানে বাংলাদেশে বেসামরিক সরকারি চাকরিতে (সামরিক চাকরিতে কোনো কোটা নেই) কোটা ব্যবস্থা আছে। এই ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ৩০, জেলা ১০, নারী ১০ এবং উপজাতি কোটা ৫ শতাংশ, ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা আছে। অথ্যৎ মেধার চেয়ে কোটায় নিয়োগ হচ্ছে বেশি। যা বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোন দেশে আছে কী না জানা নেই।

অপরদিকে কোটা সংস্কারের আন্দোলনের পরই একই জায়গায় সমাবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটি। তাদের দাবি, মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সমাবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তান ও নাতি-নাতনিদের জন্য সংরক্ষিত ৩০ শতাংশ কোটার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

তাদের দাবি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে এই কোটা মুক্তিযোদ্ধাদের উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন৷ কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ অগাস্ট তাতে সপরিবারে হত্যার পর এই কোটা বাতিল করা হয়৷ ২৪ বছর মুক্তিযোদ্ধাদের এই কোটা দেয়া হয়নি৷ ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের জন্য আবার কোটা চালু হয়৷ ২৪ বছর যদি কোটা বন্ধ না রাখা হত তাহলে এখন আর মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রয়োজন থাকতো না৷

অথচ এবারের চলমান আন্দোলনে অনেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা গেছে। অনেকে ব্যানার নিয়ে নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধার গর্বিত সন্তান দাবি করে কোটা প্রথা সংস্কারের আন্দোলনে অংশ নিয়েছে। অথ্যৎ তারা দাবি করেছেন শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটা নয় সামগ্রীক কোটার সংস্কার করে ১০ শতাংশ নামিয়ে আনার।

বিক্ষোভে অংশ নেয়া চাকরি প্রত্যাশীদের তথ্য মতে, কোটার প্রার্থী না পাওয়ায় ২৮তম বিসিএসে ৮১৩ জনের পদ শূন্য ছিল। একইভাবে ২৯তম-তে ৭৯২ জন, ৩০তম-তে ৭৮৪ জন, ৩১তম-তে ৭৭৩ জন, ৩৫তম-তে ৩৩৮ জনের পদ শূন্য ছিল।

এর ফলে একদিকে প্রতিযোগিতা করে উত্তীর্ণ হয়েও কোটার কারণে তারা নিয়োগ পাচ্ছে না। আবার প্রশাসনিক কারণে কোটা পূর্ণ না হলেও ওই পদগুলো শূন্য রাখতে হচ্ছে।

কোটায় কীভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন তার একটি ভাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ফ্রিল্যান্স কলামিস্ট শরিফুল হাসান। তার মতে, ‘প্রতি বিসিএসে সাধারণ ক্যাডারে গড়ে ৫০০ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অংশ নেন সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থী (চলতি বছরের হিসাবে)। কোটাপদ্ধতির কারণে কেউ যদি সাড়ে তিন লাখ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২২৬তম হন, তাহলে তিনি চাকরি নাও পেতে পারেন। কারণ ৫০০ পদের মধ্যে মেধা কোটায় ২২৫ জনকে দেওয়া যাবে। কাজেই ২২৬তম হয়ে তিনি চাকরি পাবেন না। আবার কোটা থাকলে কেউ সাত হাজারতম হয়েও চাকরি পেতে পারেন।

আর সবচে‌য়ে বড় সংকট কোটার প্রার্থী না পাওয়া গে‌লে ওই পদগু‌লো শুন্য রাখ‌তে হয়। ফলে এক‌দি‌কে যেমন মেধাবীরা নি‌য়োগ পায় না অন্যদি‌কে হাজার হাজার পদ শুন্য থা‌কে। বিগত কয়েকটি বিসিএসের ফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া যাওয়ায় ২৮ থেকে ৩৫তম বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারে পাঁচ হাজার পদ খালি থেকে গেছে।’

একই সাথে অগ্রণী ব্যাংক এর সিনিয়র অফিসারের ২৬২ টি আসনের বিপরীতে মেধায় পাশ করেছে ১৯৮ জন। বাকি ৬৪টি জন। কোটাধারীর কেউ পাশ করেনি বলে তাদের দাবি। যদি সেটা হয় তাহলে বাকি ৬৪টি পদ কী খালি থাকবে। তার বিপরীত ওই ৬৪টি পদে যারা লিখিত ভাইভা দিয়ে ভাল করেছে তাদের নিয়োগ করা যেতো। এতে একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের বেকার জীবনের অবসান হতো অন্যদিকে মেধায় নিয়োগ পেলে ৬৪টি পরিবারের মুখে হাসি ফুটতো।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে  অনগ্রসর শ্রেণিকে এই সুবিধা দিয়ে সমতা বিধানের লক্ষ্যে এই কোটার প্রবর্তণ করা হয় স্বাধীনতার পরেই৷

সরকারী চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদশে সংবিধানের ২৯ ধারার ৩(খ)বলা হয়েছে, কোন ধর্মীয় বা উপ-সমপ্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সমপ্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

আবার সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদ নাগরিকদের ‘অনগ্রসর অংশের’ জন্য চাকরিতে বিশেষ কোটা প্রদান অনুমোদন করেছে, ‘অনগ্রসর অঞ্চলের’ জন্য নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে এখন কোটার যে অবস্থা তা ন্যায় নীতির পরিপন্থী৷ কারণ মেধার চেয়ে সংরক্ষিত কোটা বেশি হতে পারেনা৷ ফলে সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি এখন নতুন করে পর্যালোচনা করা দরকার৷ এটার সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে৷

আন্দোলনকারী চাকরি প্রত্যাশীরা আগামী ৩ মার্চের মধ্যে যদি তাঁদের ওই দাবি পূরণ না হয়, তবে আগামী  ৪ মার্চ মুখে কালো কাপড় বেঁধে শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। কোটা সংস্কারের আন্দোলন তাই এখন সরকারের সুনজরের দাবিদার।

কমেন্টস