‘অপারেশন জ্যাকপটের কারণে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়’

প্রকাশঃ জানুয়ারি ১৩, ২০১৮

ছবি- আব্দুল্লাহ আল মাসুম

নৌ-কমান্ডো মো. খলিলুর রহমান ১৯৫০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মাসে সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার ভাতশালা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দৌলতপুর বিএল কলেজ, বাগেরহাটের পিসি কলেজ ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নশাস্ত্রে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘অপারেশন জ্যাকপট’ এ বীরত্বের সাথে পাকিস্তানীবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। মাসখানিক সময় পাক আর্মি ক্যাম্পে বন্দী হিসেবে নির্যাতিত হন।

এই বীরযোদ্ধা ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর হার্ট এ্যাটাক করে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে ভর্তি হোন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, মুক্তযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিকিৎসার ব্যয় বহনের আবেদন করে তার পরিবার প্রত্যাখ্যাত হয়। প্রয়োজন মাফিক চিকিৎসা না পেয়ে গত ৯ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর ১০ জানুয়ারি তার পরিবার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে দেয়া রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রত্যাখান করেন

বিডিমর্নিং এর পক্ষ থেকে ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর ‘মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ীদের বীরত্বগাথা’ সাক্ষাৎকারভিত্তিক অনুষ্ঠানের জন্যে তার নিজ বাসায় সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ। ক্যামেরায় ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মাসুম। আজ সাক্ষাৎকারটির প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের কাজগুলো সম্পর্কে আমরা জানতে চাচ্ছি।
মো. খলিলুর রহমান: মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় ২৬ মার্চ থেকে। তখন থেকেই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমদিক থেকে গেরিলারা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মোকাবেলা করে আসছিল। তার সাথে গণবাহিনীও ছিল। অনেক সীমাবদ্ধতার কারণে পাকিস্তানীদের আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রের মোকাবেলায় কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। জুলাই মাস পর্যন্ত এই সীমাবদ্ধতার মধ্যে যখন যুদ্ধ চলে তখন যুদ্ধ অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসছিল। এই সময়ই আমাদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’ পরিচালনা হয়। অপারেশন জ্যাকপটের কারণে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায়। তার আগে নৌ-কমান্ডো কীভাবে গঠিত হয় সে সম্পর্কে একটু বলি?

ফারুক আহমাদ আরিফ: জী।
মো. খলিলুর রহমান: ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা হলে ওই সময়েই ফ্রান্সে পাকিস্তান নৌ-বাহিনীর অনেক বাঙালি নাবিক সেখানে ছিলেন। তারমধ্যে তারা ৯ জন সিদ্ধান্ত নেন যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিব। তারা ভারতীয় দূতাবাসের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে দিল্লিতে এসে উপস্থিত হন। ভারতে এসে নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত যে একটি নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন করবেন। সেই পরিকল্পনা মাফিক মে মাসের প্রথম দিকে মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন ক্যাম্প ও শিবির থেকে ১৬০ জন যুবককে যারা স্কুল-কলেজে পড়ে তাদের বাছাই করে ভারতের মুর্শিদাবাদের পলাশীতে ভাগীরথি নদীর তীরে নিয়ে আসেন। স্থানটা হলো যেখানে লর্ড ক্লাইভ ও সিরাজউদ্দৌলার সাথে যুদ্ধ হয়। সেখানে বিশাল মনোমেন্ট রয়েছে। সেখানে লেখা আছে ওয়ার ফিল্ড অব পলাশী ১৭৫৭। এখানে আমাদের ৩ মাস ট্রেনিং হয়। ট্রেনিংটা ছিল মূলত সুইমিং (সাঁতার)। এটা সাধারণ সাঁতার না, পানির নিচ দিয়ে সাঁতার কাটতে হবে। সারা শরীরকে পানির নিচে রেখে আড়াল করে শুধু নাকটা উপরে রেখে যাতে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া যায়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: এটাকে আমরা চিত সাঁতার বলি না?
মো. খলিলুর রহমান: চিত সাঁতার। সাঁতারেতো হাত উপরে উঠনো যায় কিন্তু এখানে উপরে উঠানো যায় না, হাত শরীরের সাথেই আটকে রাখতে হয় পা দিয়ে পানি নেড়ে সাঁতার কাটতে হয়। সাঁতারের সরঞ্জাম বলতে এক জোড়া ফিন্স দেয়া হতো। হাসের পায়ের পাতার মতো দেখতে। এসব ফিন্স পড়ে অনেক দ্রুতগতিতে সাঁতরানো যায়। সাঁতার শিখানোর কারণ হচ্ছে আমরা যাতে সাঁতার কেটে শত্রুবাহিনীর স্থাপনার নিকটে পৌঁছাতে পারি। পৌঁছে আমাদের কাজ ছিল সেখানে লিমপেট মাইন স্থাপন করে সেটা ব্লাস্ট করা। সাঁতার কেটে যেতে হলে বা মাইন ক্যারি (বহন) করতে হলেও তো মাইনের ব্যবহার শিখতে হবে। সেই শিক্ষাগুলো আমাদেরকে পলাশীতে দেওয়া হয়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সেখানে আপনাদের প্রশিক্ষক কে ছিলেন?
মো. খলিলুর রহমান: সেখানে যারা ফ্রান্স থেকে আসলেন সেই ৮ জন তাদের মধ্যে গাজী মো. রহমতউল্লাহ, এ ডব্লিউ চৌধুরী, বদিউল আলম, আহসান উল্লাহ, আমানুল্লাহ শেখ, সৈয়দ মোশাররফ হোসেন, আব্দুর রকিব মিয়া (শহীদ হোন)। এর সাথে মূল প্রশিক্ষক ছিলেন ভারতীয় দক্ষ এবং যুদ্ধকৌশলী যোদ্ধারা। যার কমান্ডার ছিলেন এম এন সামান্দ (মহেন্দ্র নাথ সামান্দ), ল্যাফটেনেন্ট কমান্ডার মার্টিস, ল্যাফটেনেন্ট কফিল, সি সিং, আই সিং, যাবদ সিংসহ প্রায় ২০ জন প্রশিক্ষক। ভারতীয় প্রশিক্ষকদের সাথে বাঙালি ৮ জন সাবমেরিনারও আমাদের প্রশিক্ষণ দিতেন। ৩ মাস এই প্রশিক্ষণ চলে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনাদের প্রশিক্ষণ শুরু হলো কোন মাস থেকে?
মো. খলিলুর রহমান: মে মাস থেকে। ৩ মাস ট্রেনিং চলে। এতে করে আমরা দ্রুত সাঁতরাতে পারি, অনেক্ষণ এবং অনেক দূর পর্যন্ত সাঁতরাতে পারি। এই সাঁতরাতে যে শারীরিক সক্ষমতা প্রয়োজন সে জন্যে আমাদের আরো কিছু পারিপার্শ্বিক বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। যেমন দৌড়ানো, লাফানো, ফুটবল খেলা, পোলো খেলা ইত্যাদি। গ্রেনেড ছোড়া, ছোট ছোট অস্ত্র চালানো। আমাদের ভারি অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়নি। আমরা ভারি অস্ত্রও পাইনি। ছোট অস্ত্র দিয়েই প্রশিক্ষণ হতো। আমাদের মূল অস্ত্র মাইনিং। সেই মাইনটাকে সাঁতার কেটে গিয়ে জাহাজের গায়ে লাগানো এবং এটাকে ব্লাস্ট করা। এইভাবে ৩ মাস প্রশিক্ষণ শেষে ১ থেকে ৪ আগস্ট ভারত থেকে অপারেশনের জন্যে আমাদেরকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাঠানো শুরু হয়। প্রথমে ৪টি বন্দরকে নির্দিষ্ট করা হয়। তারমধ্যে দুটি সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম ও মংলা ও দুটি নদী বন্দর চাঁদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ টার্গেট করা হয়। ৪টি বন্দরের জন্যে ছিলেন ৪ জন কমান্ডার। এরা ছিলেন ফ্রান্স থেকে আসা সাবমেরিনার। তাদের অধীনে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হয় ৬০ জন যুবককে, মংলা বন্দরের জন্যে পাঠানো হয় ৬০ জন যুবককে। চাঁদপুরে পাঠানো হয় ২০ জন যুবককে, নারায়ণগঞ্জে ২০ জন যুবককে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: তাদের কারো নাম কি আপনার মনে পড়ে?
মো. খলিলুর রহমান: হ্যাঁ, অনেকের নামই মনে আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: যদি আমরা শুনতে চাই।
মো. খলিলুর রহমান: চট্টগ্রাম বন্দরে ছিলেন এ এস এম জিলানী, নুরুল গণি, মনোস কুমার, আবু তাহের, আবু মুসা, মংলা বন্দরে ছিলেন মুজিবুর রহমান, মফিজ উদ্দীন, আলফাজ উদ্দীন, শফিক আহমেদ, আমিও ছিলাম মংলা বন্দরে। চাঁদপুর বন্দরে ছিলেন মুমিনুল্লা পাটোয়ারী বীরপ্রতীক, শাহজাহান কবির বীরপ্রতীক, ইঞ্জিনিয়ার মাহবুবুর রহমান, বোরহান উদ্দীন আহমেদ, সালাহ উদ্দীন আহমেদ বীর উত্তম। নারায়ণগঞ্জ বন্দরে ছিলেন জিএম আইউব, মতিউর রহমান, আনোয়ার হোসেন, আব্দুর রহিম। এই ধরনের ১৬০ জনকে অপারেশনে পাঠানো হয় ৪টি বন্দরে। ৪টি গ্রুপে করে বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছান। আমি ছিলাম মংলা বন্দরে।

কমেন্টস