‘অসহযোগ আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো’ (ভিডিও)

প্রকাশঃ জানুয়ারি ৮, ২০১৮

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৭ নং সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে পাকিস্তান জাতিয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণযন কমিটির সদস্য ও পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অসহযোগ আন্দোলনের। অসহযোগ আন্দোলন পর্যায়ক্রমে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রুপ নেয়। তিনি ২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ধানমন্ডিতে তার নিজ বাড়িতে বিডিমর্নিং এর সাথে মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ এবং ক্যামেরায় ছিলেন আবু সুফিয়ান জুয়েল ও আব্দুল্লাহ আল মাসুম। আজ সাক্ষাৎকারটি প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচিগুলো কি ছিল?
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ: তখন আমি নতুন এমএনএ (পাকিস্তান জাতিয় পরিষদ সদস্য)। আমাদেরকে বঙ্গবন্ধু ডেকেছিলেন ১ তারিখে (১ মার্চ) গণপরিষদের মিটিং এর ব্যাপারে। তখন মেম্বার অব পালামেন্টারিদের মিটিং চলছিল, ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং চলছিল আসন্ন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে সেখানে সংবিধান রচনা কিভাবে হবে? একটি খসড়া সংবিধান করা এবং সংবিধান নিয়ে আলোচনা করা। হঠাৎ করে আকস্মিকভাবে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) বরাত দিয়ে রেডিও পাকিস্তান থেকে ঘোষণা হলো ৩ তারিখের আহুত গণপরিষদের বৈঠক বাতিল করা হলো। বঙ্গবন্ধু এই ঘোষণার পরে আমার মনে হয়েছে তিনি খুব একটা বিচলিত হননি। উনার ভিতরে স্বাভাবিক কারণেই ষড়যন্ত্র এবং চক্রান্ত যে হচ্ছে বাঙালি যাতে তার অধিকার না পায়, সেদিকে তার আরো সতর্ক-সজাগ এবং তিনি লক্ষ্য স্থির করে ফেলছেন। অসহযোগ আন্দোলন পরের ঘটনা। তার আগে ১ তারিখেই (১ মার্চ) হাজার হাজার লোক রাজপথ দখল করে অবরোধ সৃষ্টি করে। তখন থেকেই মোটামুটি একটা স্লোগান উঠে ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। তার সাথে জাতীয়তাবাদী যে স্লোগান ছিল পদ্মা-মেঘনা-যমুনা তোমার আমার ঠিকানা তা তো ছিলই।

১ তারিখে সাংবাদিকরা বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিল এর পরের স্টেপ কি? বঙ্গবন্ধু স্পষ্টভাবে বলছিলেন এই চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র চলছে যার ফল শ্রুতিতে পরিষদ স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে এটাকে আমি আনচ্যালেঞ্জ হতে দিব না। তিনি ২ তারিখে (২ মার্চ) ঢাকায় ও ৩ তারিখে সারাদেশে হরতাল আহ্বান করলেন। ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হলো। সেখানে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত করা হয়। ৩ তারিখে পল্টন ময়দানে একটি মিটিং আহ্বান করা হলো। আকস্মিকভাবে বঙ্গবন্ধু সেখানে উপস্থিত হলেন না। সেখানে ছাত্রলীগ পুরোপুরি স্বাধীনতার ঘোষণাকে সামনে রেখে ইশতিহার ঘোষণা করে। সেই ইশতিহার পাঠ করেছিলেন শাজাহান সিরাজ। ইতিহাসের সত্যকে অস্বীকার করা যাবে না। সেই ইশতিহারে কি ছিল? ১. স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, ২. জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে, ৩. জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান এই কথাটি ঘোষিত হয়, ৫. এবং সর্বশেষ সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করা হবে এটি সামনে চলে আসে। ৬. শোষণমুক্ত সমাজ। ন্যায়ভিত্তিক সমাজপ্রতিষ্ঠা, গণতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ইশতিহারে চলে আসে।

হঠাৎ সেখানে উপস্থিত হয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আজকে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি, চারদিকে যে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত চলছে আমি ক’দিন বাইরে থাকতে পারবো? আদৌ বাইরে থাকতে পারবো কিনা তা জানি না? সেজন্য জনগণ যে আন্দোলন করছে তা প্রত্যাহার করা হবে না, আন্দোলন চলবে। আমি ৭ তারিখ (৭ মার্চ) আমি আমার বক্তব্য প্রদান করবো। একই সাথে তিনি বললেন আমি চাই অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। সর্বত্র। কোর্ট-কাছারি, অফিস-আদালত, শিল্প-কল-কারখানা, স্কুল-কলেজ প্রত্যেক স্তরে। এই অসহযোগ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর কৃতীত্ব হলো ধীরে ধীরে তিনি এটিকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে নিয়ে গেলেন। তিনি বললেন আমি কথা বলবো ৭ তারিখে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: মাত্র ৪ দিনে?
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ: হ্যাঁ। তিনি ৭ তারিখে (৭ মার্চ) পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা এবং তার সাথে সাথে কীভাবে মুক্তি অর্জিত হবে সে কথাও বলে দিলেন। এবং জনযুদ্ধের মাধ্যমে, গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে যার যা আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে বলে তিনি শত্রু চিহ্নিত করে দিলেন। গেরিলা যুদ্ধের যে কলা-কৌশল, সেই কলা-কৌশলকে পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করলেন।
অন্যদিকে সাম্য, মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। সেদিন পরিষ্কার হয়ে যায় বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে হলে আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। সেদিনই বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে। তারপরে অসহযোগ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৫ তারিখে ৩৫ টি নির্দেশনা জারি করে সমগ্র বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। মার্কিন সরকারের গোপন নথিতে দেখা যায় তারা লেখেছেন ‘মুজিব টেক্স ওভার’ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান মানে বাংলাদেশের ক্ষমতা স্বহস্তে গ্রহণ করেছেন। আরেকটি বিষয় যা অনেকে এড়িয়ে যান কিন্তু আমি গুরুত্ব দিই। সেটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু প্রকাশ্যে বললেন যে, ১৬ তারিখে আমার অতিথি আসছে মানে আলোচনার জন্যে (পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট) জেনারেল ইয়াহিয়া আসবেন। তার যেন অসম্মান না হয়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: তার মানে তিনি শত্রুকে সম্মান দিলেন?
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ: না, অতিথিকে। অতিথি হলো বাইরের দেশের কেউ এলে তাকে অতিথি বলে। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান সামরিক শাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে তিনি অতিথি বললেন। মানে পশ্চিম পাকিস্তান একটি দেশ এবং পূর্ব পাকিস্তান একটি দেশ। মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এজন্য প্রেসিডেন্ট আসছে বলেননি অতিথি আসছে বললেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে অন্য দেশের রাষ্ট্র প্রধান আসছেন তার যেন অসম্মান না হয়। বঙ্গবন্ধু অতিথি কথা মধ্য দিয়ে এ কথা বুঝিয়ে দিলেন যে দুটি দেশ আলাদা। অসহযোগ আন্দোলন চলতে থাকে তার এক পর্যায়ে টিক্কা খানকে গভর্নর হিসেবে প্রেরণ করা হয় কিন্তু হাইকোর্টের কোন বিচারপতি তাকে শপথ করাতে রাজি হলেন না।

এই সময় থেকে সকল কার্যক্রম পরিচালিত হতো ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ি থেকে। সমস্ত নির্দেশাবলী যেতো এখান থেকে। সেই মোতাবেক অফিস, আদালত, ব্যবসায়-বাণিজ্য, দেশের প্রশাসন চলতে থাকে। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ কি হবে সব কিছুর নির্দেশনা যেতো এখান থেকে। ধানমন্ডি ৩২ এর বাড়িটি সবকিছুর প্রাণকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৩২ তারিখে (২৩ মার্চ) পতাকা উত্তলনের মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দিলেন বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। পরবর্তীতে ইয়াহিয়া খান তার আত্মজীবনীতে লেখেছেন ‘শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন দুটি গণপরিষদ থাকবে। এর আগে তিনি জাতীয় সংসদ তৈরি করেছেন। তার নিজস্ব ভূ-খখণ্ড ছিল। তিনি তার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি চেয়েছিলেন দুটি গণপরিষদের মাধ্যমে দুটি শাসনতন্ত্র তৈরি করে আমার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। সেটি হলে পূর্ব পাকিস্তান মানে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যেতো। আর এটি প্রতিহত করার জন্যেই ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী নামানো হয় (অপারেশন সার্চলাইট)।’ অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমস্ত মানুষকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন।

অসহযোগ আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো। ৭ মার্চের ভাষণে তিনি যদি ৪টি শর্ত জুড়ে না দিতেন তাহলে সেটি হতো বিচ্ছিন্নতাবাদের অভিযোগে শত্রুদের হাতে প্রধান অস্ত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধু সেখানে ৪টি শর্ত দিয়ে যেভাবে ঘুরিয়ে বললেন তাতে বুঝা গেল আলোচনার সুযোগ আছে। ‘প্রথম শর্ত সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত সেনাবাহিনী দেশের যেসব লোককে হত্যা করেছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে। তৃতীয় সৈন্যদের ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। চতুর্থ হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’ এই কয়েকটি কথা বলেই আলোচনার জন্যে একটি সুস্পষ্ট স্পেস রেখে দিলেন। যাতে কেউ তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী না বলতে পারে। সে সময় একটি ঘটনা ছিল ৭০ সনে (১৯৭০ সালে) জেনারেল উজুকো বায়ারফার্মকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেড ছিল না। ফলে আন্দোলনটি বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে গণ্য হয় এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষ মারা পড়ে। বঙ্গবন্ধু সবকিছু তার বিবেচনায় রেখে নিজের দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সমস্ত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে সহযোগা ও অসহযোগ আন্দোলনকে ধীরে ধীরে স্তরে স্তরে সশস্ত্র আন্দোলন, সশস্ত্র সংগ্রাম, সশস্ত্র যুদ্ধ, জনযুদ্ধে নিয়ে যান।

তিনি কিন্তু বলেছেন ৭ মার্চের ভাষণে আমি যদি স্বাধীনতার ঘোষণা নাও দিতে পারি তোমাদের যার যা কিছু আছে তা নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করবে। এর মাধ্যমে তার দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায়। বলতে পারেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা ২৫ তারিখের আগে কেন ঘোষণা করলেন না? আগে করলে জেনেভা কনভেশন অনুসারে যিনি আগে আক্রমণ করেন বিশ্ব তাকে স্বীকৃতি দেয় না। সেজন্য বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা হচ্ছে যখন ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ এর আলোকে আক্রমণ করা হলো, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আক্রমণ করা হলো। যখন আক্রমণ করা হলো তখনি বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন এটি পাকিস্তান প্রশাসন, সিভিল সার্ভিস থেকে শুরু করে সবাই এবং টিক্কা খানও স্বীকার করেছেন যে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা শুনেছেন। অর্থাৎ পাকিস্তান আর্মি আক্রমণ করার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সেক্ষেত্রে জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা…

ফারুক আহমাদ আরিফ: ন্যায়সঙ্গত।
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ: ন্যায়সঙ্গত। তার সাথে সাথে আরেকটি বিষয় হলো যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ম্যান্ডেড পেয়ে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন যা সম্পূর্ণরুপে বৈধ।

ফারুক আহমাদ আরিফ: নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তিনি দায়িত্বটা পান, যা ফিদেল কাস্ট্রো বা অন্যদের ক্ষেত্রে ছিল না।
অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ: না। তাদের যুদ্ধটা ছিল অন্য রকম।

‘অসহযোগ আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো’

‘অসহযোগ আন্দোলন ছাড়া স্বাধীনতার দিকে অগ্রসর হলে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো’

Posted by Bdmorning.com on Sunday, January 7, 2018

কমেন্টস