ইটভাটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে দূষণের মহা উৎসব

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৮, ২০১৭

ইসতিয়াক ইসতি।। 

সিটি কর্পোরেশন, আবাসিক এলাকা, শিল্প এলাকা এমন কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে ইটভাটা নেই। অথচ আইনে বলা আছে মেডিক্যাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেললাইন ও মহাসড়ক এর ১ কিলোমিটার মাঝে থাকতে পারবে না এই ধরনের স্থাপনা, কৃষি জমি, ব্যক্তিগত বসতি এবং পুকুর থেকে মাটি নেওয়া যাবে না। কিন্তু এই সবই এখন কিতাবের কথা। সংবিধানের ধারা না মেনে প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে ইটভাটা নামে চলছে পরিবেশ দূষণ ও কৃষি জমি উজাড় করে দেওয়ার মত মারাত্মক অপরাধ। যার ফলে প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখে ধাবিত হচ্ছে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকল বয়সের মানুষ। এর সাথে যোগ হয়েছে টায়ার পোড়ানোর কিছু অবৈধ কারখানাও।

গাছে ফল নেই, জলাশয়ে নেই মাছ, আছে কচুরিপানা কিন্তু নেই তার ফুল। আর ধুলাবালির সাথে মিশে আসা কার্বন সালফার ও গ্যাসে নানা রোগ-বালাই তো আছে। সনাতন পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক পদ্ধতির ইট ভাটা বানানোর পরও সাভারের আশুলিয়ার অবস্থা এখন এমন হয়ে উঠেছে। যার ফলে ইট ভাটার আশে পাশে থাকা লোকালয়ের অবস্থা এখনও বাসের অযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি হিসাবে দেশে ইট ভাটা আছে ৬ হাজার ৯শ ৩টি। কিন্তু বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি। একটি বেসরকারি পরিবেশ রক্ষা সংস্থার (বেলা) তথ্য বলছে দেশের ইট ভাটাতে পোড়ানো কয়লা ও কাঠ থেকে বছরে ৪৭ লাখ ৫০ হাজার গ্রিন হাউজ গ্রাস মিশে যাচ্ছে বাতাসে।

ঢাকার আশুলিয়ায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, এই এলাকাতে বৈধ ও অবৈধ কারখানার অভাব নেই। মূলত আবাসিক এলাকার পাশেই গড়ে উঠেছে এই ইট ভাটাগুলো। আর ভাটার বিষাক্ত নাবিশ্বাস হয়ে উঠেছে স্থানীয় মানুষ।

স্থানীয় এক বাড়ি মালিক মানিক মিয়া জানান, ‘সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তে ইট পোড়ানোর কালো ধোয়া তাদের ঘর থেকে শুধু সব জায়গাতে সরিয়ে থাকছে। যাতে হাঁপানি রোগী এবং বাচ্চা ও বয়স্কদের নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।’

মোশারব মোল্লা বলেন, ‘চাষাবাদের কথা বাদই দিলাম। বাসা বাড়িতে শখ করে লাগানো গাছে মৌসুমী ফল-মূল ধরে না। কিছু গাছে ডাব থেকেও সেগুলোতে পানি হয় না।’

মুক্তিযোদ্ধা করিম উদ্দিন বলেন, ‘যে টিন ১০ বছর যাওয়ার কথা সে টিন ৩ বছর যায় না। উল্টো ইট ভাটা থেকে আসা ধুলাবালি দিয়ে প্রতি মুহূর্তে নষ্ট হচ্ছে আমাদের ঘরের অন্যসব জিনিস পত্র।’

স্কুল শিক্ষিকা মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘কথা ছিল আধুকিন প্রযুক্তির ইট ভাটাতে কোনো ক্ষতি হবে না। তাই আইন করে সেটাই করা হল। কিন্তু কাজের কাজ আর হয়নি। দিন দিন বেড়েই চলেছে পরিবেশ দূষণ।’

অন্যদিকে ইট তৈরির মাটি সংগ্রহ করতে গিয়ে কেটে ফেলা হচ্ছে ফসলি জমির উপরের উর্বর মাটি। যাতে করে প্রতি মুহূর্তে নিচু হচ্ছে আশুলিয়ার এলাকার একটি বিশাল অংশ। আর অল্প বৃষ্টিতে পানির নিচে চলে যাচ্ছে একটি অংশ।
ভাটা এলাকাতে নতুন করে যুক্ত হয়েছে পুরনো টায়ার পোড়ানোর কারখানা। যেখানে পুরনো টায়ার পুড়িয়ে তেল বের করা হয়। যার ভাটার জ্বালানি তেল হিসাবে বেশ চাহিদা রয়েছে। ফলে গোটা আশুলিয়া জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ছোট বড় একাধিক কারখানা।

খালি চোখেই দেখেই বুঝা যায় বিষাক্ত গ্যাস ও আর ধুলাবালি ছড়িয়ে যাচ্ছে আশপাশের আবাসিক এলাকা- মহল্লাগুলোতে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. রইছউল আলম মন্ডল এই বিষয়ে জানান, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইট তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে এই ভাটাগুলো সাফল্যের মুখ দেখবে। তখন আর পরিবেশ দূষণ হবে না’।

বেলা’র প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জানান, ‘বাংলাদেশে যে পরিমাণ ইট তৈরির মাটি দরকার সেই পরিমাণ মাটি আসলে নেই। কিন্তু সরকার আইনে বলে দিয়েছেন ফসলি জমিতে ইট ভাটা বানাতে পারবে না। কিন্তু ফসলি জমি বা কৃষি জমির সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, যে জমিতে এক ফসলে বেশি ফলন হয় সেটি কৃষি জমি। আর এই আইনের ফাঁক কাজে লাগিয়ে অনেকে দিনের পর দিন ইট ভাটার জন্য জমি নষ্ট করে চলেছে’।

কমেন্টস