রোহিঙ্গা ও ইয়েমেন নিয়ে সৌদি বাদশাহর কৌতুক!

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ৩, ২০১৭

Advertisement

বিডি মর্নিং ডেস্ক:

সৌদি বাদশাহ সালমান বলেছেন তার দেশ ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তাবৎ মুসলিম বিশ্বের অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রতিনিধিত্ব করে। মুসলমানদের প্রত্যাশা ও যন্ত্রণা অনুভব করে, মুসলিম বিশ্বের একতা, সহযোগিতা ও সংহতি অর্জনের চেষ্টা করে এবং সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তি অর্জন করে। দ্বিতীয় কৌতুকটি হচ্ছে, বাদশাহ সালমান বলেছেন, সন্ত্রাস প্রতিরোধে সৌদি আরব সফলতা অর্জন করেছে।

হজ উপলক্ষে শনিবার (০২ সেপ্টেম্বর) এক রাজকীয় সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে সৌদি বাদশাহ তার বক্তব্যে এসব কথা যখন বলেন, তখন জাতিসংঘ রোহিঙ্গা মুসলমানদের দেওয়া খাদ্য সাহায্য স্থগিত করেছে। ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসন চলছে এবং সিরিয়ার আজকের বেহাল অবস্থার জন্যে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে যে সহায়তা করেছে তা এখন দিবালোকের মত পরিস্কার। সর্বশেষ সৌদি জোট কাতারের ওপর অবরোধ দিয়ে বসে আছে। ফিলিস্তিন সমস্যার কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি সৌদি নেতৃত্ব। এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়েছে কথিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সৌদি জোটে তেমন কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি বলে।

সৌদি বাদশাহর ওই রাজকীয় সম্বর্ধনায় বাংলাদেশের সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উপস্থিত ছিলেন। ছিলেন আরো বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশের নেতৃবৃন্দ। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চলছে সে সম্পর্কে কোনো বাক্য খরচ করেননি সৌদি বাদশাহ। মিয়ানমারের সঙ্গে মুসলিম দেশগুলো যদি সম্পর্ক রক্ষার বিষয়টি পুনরায় চিন্তা করত তাহলেও হয়ত দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সাং সুচির ভাবোদয় হলেও হতে পারত। জাতিসংঘের খাদ্য স্থগিত, এক বস্ত্রে জান নিয়ে রোহিঙ্গা নারীরা শিশুদের নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয়ে ছুটছে, আর পুরুষদের হত্যা করা হচ্ছে, নির্বিচারে গণধর্ষণ চলছে, শত শত বাড়িঘরে আগুণ লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার স্যাটেলাইট ইমেজ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশ পাচ্ছে, আর তখন বাদশা সালমান বলছেন, তার দেশ মুসলিম ঐক্যের জন্যে কাজ করছে। এ কেমন ঐক্য যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গণহত্যা ও নারীদের ধর্ষণ থেকে রক্ষা করা যায় না?

পাশের দেশ ইয়েমেনে সৌদি আগ্রাসনের আড়াই বছরে দেশটিতে মানবিক বিপর্যয় চলছে। সৌদি সমর্থকরা ইয়েমেনে বিমান ও নৌবন্দর বন্ধ করে রাখায় খাবার ও ওষুধ সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ায় দুর্ভিক্ষ চলছে। কলেরায় সহ্রস্রাধিক মানুষ মারা গেছে। ৫ লক্ষাধিক মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হওয়ায় তা বিশ্বরেকর্ড ছাড়িয়েছে। সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটির ভাড়াটে সৈন্যের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের মানুষ হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়া সৌদি জঙ্গী বিমানগুলো বোমা বর্ষণ করছে। তার জবাবে ক্ষেপণাস্ত্র যেয়ে পড়ছে সৌদি ঘাঁটিতে। আর বাদশাহ সালমান বলছেন মক্কায় হামলার ষড়যন্ত্র চলছে। বাদশাহ তার পাশের দেশে আব্দোল মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে আলোচনার পথে আগাননি কেন?

ইয়েমেনে সৌদিজোটের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য জাতিসংঘের কাছে একযোগে আবেদন জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ৬০টি মানবাধিকার সংস্থা।

ইয়েমেনের আগ্রাসনে জড়িত সৌদি জোটের দেশগুলো হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কুয়েত, জর্দান, মরক্কো, মিশর, সেনেগাল এবং সুদান। আবেদনে ইয়মেনের প্রায় নজিরবিহীন মানবিক সংকট নিয়ে বিশ্বে সবচেয়ে কম প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া, সৌদি জোটের রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন এবং দেশটির স্বাস্থ্য খাতে তার ভয়াবহ প্রভাবের কথাও এতে তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের বিরুদ্ধে একতরফা আগ্রাসন শুরু করে।

এদিকে সিরিয়ায় ঘোষণা দিয়েই সৌদি জোট বাশার আল আসাদ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে একজোট হয়ে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য দিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় তার খোলামেলা বিশ্লেষণ চলছে। সর্বশেষ কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে যে নজিরবিহীন ঐক্যের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বাদশাহ সালমান এধরনের ঐক্যের কোনো প্রয়োজন বা এ নিয়ে কোনো গরজ মুসলিম বিশ্বে দেখা যাচ্ছে না। বরং কাতার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। কাতারের সঙ্গে একমাত্র সীমান্ত পথ বন্ধ করে দিয়ে, খাবারসহ যাবতীয় পণ্য সরবরাহ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে সৌদি বাদশাহ কি ধরনের ঐক্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন?

লক্ষ্য করলে দেখা যায় সৌদি আরব জোটে মিসর, আমিরাত সহ যে সব দেশ রয়েছে এসব দেশে গণতন্ত্র তো দূরের কথা শাসন ব্যবস্থায় জনগণের কোনো অংশীদারিত্ব নেই। এসব নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো বিন্দুমাত্র মাথা ঘামায় না। কারণ রাজতন্ত্র ও স্বৈরাচারের কবলে পড়ে দেশগুলোর শাসকরা পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে নিজেদের সম্পদ লুটপাট করার সুযোগ দিয়ে কিংবা অস্ত্রক্রয় সহ আরো যাবতীয় পন্থায় খুশি করার কাজে নিয়োজিত থেকে নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। এসব দেশের মানুষ কখনো জ্ঞান নির্ভর সমাজ গড়তে পারে না, বিলাসিতায় স্বাধীন চিন্তা বিমুখ এক ধরনের দাসত্ব শ্রেণীতে পরিণত হয়। প্রযুক্তি ও পুঁজির ধারে কাছে যায় না। সৌদি বাদশাহ চান সমস্ত মুসলিম দেশগুলোর মানুষ এধরনের চিন্তাশক্তি রহিত হয়ে নিজেদের মেধা ও মনন কাজে লাগানোর বুদ্ধিবৃত্তিক কৌশল হারিয়ে ফেলুক। তাই সৌদি বাদশা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও নারীদের ধর্ষণ চললেও নিশ্চুপ থাকতে পারেন। ওআইসি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে না।

ইয়েমেনে মানবিক বিপর্যয়ে কিছুই যায় আসে না সৌদি বাদশাহর। সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট আলী মোহসেন আল-আহমর তাই বাদশার সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলেও ইয়েমেনবাসির দুর্দশা নিয়ে কথা বলতে পারেন নি। যেমন পারেননি মিসরের প্রধানমন্ত্রী শেরিফ ইসমাইল কিংবা গ্রান্ড মুফতি শাওকি আলাম তাদের দেশে গত ৫ দশক স্বৈরাচারের শাসনের পর প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির পরিণতি নিয়ে কথা বলতে। মিসরে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা পাক তা সৌদি বাদশা বা তার জোটের সদস্য মুসলিম দেশগুলো চান না। অথচ তারা ঐক্য চান। তারা ঐক্য নিয়ে কৌতুক করতে ভালবাসেন মাত্র!

Advertisement

Advertisement

কমেন্টস