রাজার মৃত্যু হয়েছে; রাজা বেঁচে আছেন

প্রকাশঃ আগস্ট ২১, ২০১৭

মেরিনা মিতু।। 

আব্দুর  রাজ্জাক। নায়করাজ রাজ্জাক। যে নামেই ডাকা হোক না কেন, তিনি ছিলেন রাজা! তাই তো তার রাজ্যে এত ভক্তি, এত ভালোবাসা।সিনেমাপ্রেমী মানুষের হৃদয় দখল করে নিয়েছিলেন বহু আগেই সেই আসন যে আর কোনো রাজার দখল করার সাহস নেই, তা হলফ করেই বলা যায়। রাজ্জাক মানেই তো নিজেকে প্রেমিক ভাবা। রাজ্জাক মানেই তো দুঃখগাথা, সেই সাথে ঝরতো  দর্শকের অশ্রু। সেই অশ্রু ঝরিয়ে সবাইকে বিদায় জানালেন নায়করাজ রাজ্জাক।

আজ সন্ধ্যা ৬.১৩ মিনিটে ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, বিকেল ৫.২০ মিনিটে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়, সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হোন তারা।

আব্দুর রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩শে জুন কলকাতার নাকতলায়। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় স্বরসতী পূজা চলাকালীন সময়ে মঞ্চ নাটকে এবং শিশু-কিশোরদের নিয়ে লেখা নাটক বিদ্রোহীতে গ্রামীণ কিশোর চরিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই নায়ক রাজের অভিনয়ে সম্পৃক্ততা। সেক্ষেত্রে পরিবারের মধ্যে মেজ ভাই আবদুল গফুরের সমর্থন পান তিনি।

অভিনেতা হওয়ার আশায় ১৯৬১ সালে  মুম্বাইয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন যদিও, তবে সফল না হয়ে ফিরেছিলেন টালিগঞ্জে। পরবর্তীতে শরণার্থী হয়ে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। প্রথমদিকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করার পর নায়ক হিসেবে ঢালিউডে তার আগমন হয় জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে।

প্রায় অর্ধশত বছরের অভিনেতা হিসেবে রাজ্জাকের ঝুলিতে রয়েছে তিনশোটির মতো বাংলা ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্র। এর মধ্যে বেশ কয়েকটিই পেয়েছে ক্লাসিকের খ্যাতি। সেই সাথে পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। গত বছরে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আয়না কাহিনী’ তার সবশেষ পরিচালিত ছবি।

১৯৯০ সালে চিত্রনায়িকা নূতনের বিপরীতে ‘মালামতি’ ছবিতে নায়ক হিসেবে শেষ অভিনয় করেন। নায়কের পাট চুকিয়ে চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নতুন পথ চলা শুরু করেন ১৯৯৫ সাল থেকে। কে জানে , হয়তো তখনই মৃত্যু হয় নায়করাজ রাজ্জাকের।

‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে। এরপর আরও চারবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। পরবর্তীতে  ২০১১ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তিনি আজীবন সম্মাননা অর্জন করেন।

রাজ্জাক সুচন্দার পর কবরী, ববিতা, শাবানাসহ তখনকার প্রায় সব অভিনেত্রীকে নিয়ে অভিনয় মঞ্চে ঝড় তোলেন। তবে এর মধ্যে রাজ্জাক-কবরী হচ্ছে স্মরণকালের জুটি। এই মহানায়কের উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে- ‘আনোয়ারা’, ‘সুয়োরাণী-দুয়োরাণী’, ‘দুই ভাই’, ‘মনের মতো বউ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘বেঈমান’।

স্বাধীনতার পর ‘রংবাজ’ দিয়ে অন্য এক পরিচয় মেলে ধরেন রাজ্জাক। ‘আলোর মিছিল’, ‘পিচ ঢালা পথ’, ‘স্বরলিপি’, ‘কি যে করি’, ‘টাকা আনা পাই’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাঁদী থেকে বেগম’, ‘আনার কলি’, ‘বাজিমাত’, ‘লাইলি মজনু’, ‘নাতবউ’, ‘মধুমিলন’, ‘অবুঝ মন’, ‘সাধু শয়তান’, ‘মাটির ঘর’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘কালো গোলাপ’, ‘নাজমা’সহ অসংখ্য ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের নায়ক রাজ্জাক। ‘বদনাম’, ‘সৎ ভাই’, ‘চাপা ডাঙ্গার বউ’সহ ১৬টি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন রাজ্জাক।

মহানায়কের এমন মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিরাট বড় এক নক্ষত্রকে হারিয়েছে। কিন্তু এটাও সত্য যে, মৃত্যুতেই তিনি নিঃশেষ হয়ে যাবেন না। বহুকাল ঢাকার চলচ্চিত্র ও দর্শকরা মনে রাখবে নায়করাজ রাজ্জাককে।

Advertisement

কমেন্টস