বঙ্গবন্ধুর কাছে একজন পতিতার খোলা চিঠি

প্রকাশঃ আগস্ট ১৫, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

‘যখন দেশে সাত কোটি মানুষ ছিলো, তখন নাকি ৭ কোটি কম্বল ছিলো। এখন দেশে ১৬ কোটি মানুষ, কম্বলগুলা কোন চুরে খায়’…এভাবেই বঙ্গবন্ধুর জন্য নিজের কল্পনার চিঠিতে শব্দ সাজাচ্ছিলেন ভাসমান যৌনকর্মী সুমি’।

আজ ১৫ ই আগস্ট। দেশব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্যে শোক দিবসে বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষজন। স্কুল-কলেজে ছবি আঁকার প্রতিযোগীতা, রচনা প্রতিযোগীতা ও বিভিন্ন জায়গায় মিলাত মাহফিলের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র শোক দিবস পালন করা হচ্ছে।

স্থানবিশেষে বক্তৃতা দিয়েছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ, মতামত দিয়েছেন ভবিষ্যৎ প্রাণ তরুণ সমাজ। বাদ পড়ে যায় শুধু দেশে বৈষম্যের স্বীকার মানুষগুলো, যাদের মনে শোক দাগ কেটে আছে বছরের পর বছর, চাপা অভিমানে আর অস্ফুটিত ক্ষোভে যাদের ভেতরটা সংকোচিত হয়ে আছে।

সেরকম একজন, নাম সুমি সুলতানা, যিনি একজন ভাসমান যৌনকর্মী। প্রায় ১২ বৎসর ধরে এই পেশার সাথে জড়িত। গল্প করার ছলে পরিচয় হয় সুমির সাথে। কথায় কথায় জিজ্ঞাস করা হয় তাকে, যদি বঙ্গবন্ধু কে চিঠি বা কিছু বলার সুযোগ হয় তাহলে সে কি লিখবে বা বলবে…

উত্তরে সুমি প্রথমে খুব ভণিতা করলেও এক পর্যায়ে নিজের সব চাওয়া আর না পাওয়ার কথা বলে যায় বঙ্গবন্ধুর কাছে।

প্রিয় বঙ্গবন্ধু,

বেঁচে থাকলে তো আর আমার মতো মাইয়া মাইনষের সুযোগ হইতো না আপনার মতো গুণী মানুষের লগে দেখা করার। আপনি বেঁচে থাকলে হয়তো অভাবই হয়তো না, আমাগো বলার বা চাওয়ার মতোও কিছু থাকতো না। মানুষের কাছে শুনছি তখন সাত কোটি মানুষ আছিলো, সাত কোটি কম্বল আছিলো। নিজের জীবন দিয়া দেশ টা আইজ কাদের দিয়া গেছেন? এরা যে আপনার কথা জানেনা, এরা শুধু আপনার নাম জানে, আপনি কি চাইছেন…আপনার আদর্শ… কোনো কিছুই এ মূর্খের দল জানেনা।

আজ দেশে আমার মতো অভাগীর অভাব নাই। ভদ্দরলোক গুলা আমাদের দেইখা অন্যপথ দিয়া হাঁটে। আপনে জানেন? এই ভদ্দর লোকগুলায় আড়ালে আমাদের ডেকে নেয়। সমাজের মানুষ আমাদের ঘর থেকে টেনে বের করে রাস্তায় নামালো। আর তারাই আমাদের আলাদা করে রাখে।

দেশের এই মানুষগুলার বাসনা পূরণ করতে আইজ আমাদের সংখ্যা আশানুরূপ। তাও দুদিন যেতে না যেতেই শুনি রাক্ষসগুলা ঘরের মেয়ে, বউ, শিশুবাচ্চাদের ধর্ষণ করতেছে। কোনো বিচার না থাকায় দিন দিন এসব বেড়েই চলেছে।

এই দেশে আইজ, বন্যায় মানুষ খাইতে পারছে না, বসতবাড়ী হারাচ্ছে, প্রাণ হারাচ্ছে। আপনার দেশ সে দিক থেকে চোখ ঘুরায় নিছে। কাইল শোক দিবস, জায়গায় জায়গায় কাঙালি ভোজের নামে ভুড়ি ভোজ হবে। দেশের এক বিরাট গোষ্ঠী খেতে পারছে না সেদিকে দেশের সুশীলদের কোনো হুশ নাই।

এ দেশে আইজ সমাজসেবার নামে গলাবাজি হচ্ছে আর হচ্ছে ডাকাতি। দশ জন গরীব মাইনষের মধ্যে পিনদনের কাপড় পাচ্ছে দুজন আর ছবি উঠছে ২০ জনের।

জানি, আপনি বাঁইচা থাকলে আমার মতো মাইয়ার শরীর বেঁচতে হতো না, আমিও আর দুইটা সাধারণ মেয়ের মতো স্কুলে যাইতাম, আমারো বিয়ে হয়তো, স্বামী-সংসার থাকতো। আপনি বাঁইচা থাকলে দেশে এসব অরাজকতাও বন্ধ হইতো।

দেশটারে মানুষ বানান এই হইলো মূল চাওয়া।

আমারে বাঁচতে দেন। আমাগোরে বাঁচতে দেন।

ইতি,

অভাগী সুমি

কমেন্টস