হত্যা নাকি আত্মহত্যা?

প্রকাশঃ আগস্ট ৯, ২০১৭

সুমাইয়া আকরাম ।।

রিয়েল লাইফে শাহরিয়ার চৌধুরী ইমন আর রিল লাইফে ঢাকার তৎকালীন সিনেমা জগতের সুপারস্টার সালমান শাহ। একসময় চলচ্চিত্র জগত দাপিয়ে বেড়ানো এই অভিনেতার ক্যারিয়ারের সফল সময়ের এক পর্যায়ে হঠাৎই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। যদিও তার মৃত্যু হয়েছিল আত্মহত্যা করেই তবে অনেকেরই ধারণা এটি একটি পূর্ব পরিকল্পিত হত্যাকান্ড। যার সাথে সামিরা, তার পরিবার এবং তার প্রাক্তন পরকীয়া প্রেমিক বর্তমান স্বামী মোস্তাক এবং মিডিয়ার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত।

সালমানের মৃত্যু হয় ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর। কি হয়েছিলো মূলত সেদিন? দিনটি ছিল শুক্রবার। তখন সালমান সামিরা আলাদা বাসায় থাকেন। সালমানের বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী সকাল সাতটায় ইস্কাটনের বাসায় যান সালমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু ছেলের শেষ দেখাও মেলেনি তার।

সালমানের বাসার নিচে দারোয়ান সালমানের বাবাকে ভেতরে যেতে বাঁধা দিচ্ছিলেন। দারোয়ান বলেছিল, ‘স্যার এখনতো উপরে যেতে পারবেন না। কিছু প্রবলেম আছে। আগে ম্যাডামকে (সালমান শাহ এর স্ত্রী সামিরাকে) জিজ্ঞেস করতে হবে।’

এক পর্যায়ে সালমানের বাবা অনেকটা জোর করে উপরে যান। উপরে গিয়ে কলিং বেল দেয়ার পর দরজা খুলে সামিরা। এরপর তিনি সামিরাকে বলেন, ‘ইমনের (ডাক নাম) সাথে কাজ আছে, ইনকাম ট্যাক্সের সই করাতে হবে। সামিরা যেনো তাকে ডেকে দেয়। কিন্তু উত্তরে সামিরা নাকোচ করে বলেন সালমান এখনও ঘুমোচ্ছে। তখন কমর উদ্দিন চৌধুরী বেডরুমে যেতে চাইলে তাকে যেতে দেয়া হয় না। ফলে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পর কমর উদ্দিন চৌধুরী ফিরে আসেন ছেলেকে না পেয়েই।

পরবর্তীতে বেলা এগারোটার দিকে সালমান শাহ’র মা নীলা চৌধুরীর কাছে ফোন আসে যে, ‘সালমান শাহকে দেখতে হলে তখনই যেতে হবে।’ টেলিফোন পেয়ে নীলা চৌধুরী দ্রুত ছেলের বাসার দিকে রওনা হন। বাসায় গিয়ে দেখেন তার ছেলে ‘সালমান শাহ’ বিছানায় শোয়ানো। খাটের মধ্যে যেদিকে মাথা দেবার কথা সেদিকে পা। আর যেদিকে পা দেবার কথা সেদিকে মাথা। আর পাশেই সালমানের স্ত্রী  সামিরা। এবং কিছু মেয়ে সালমানের হাতে-পায়ে সর্ষের তেল দিচ্ছে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনার জন্য। তারা ভেবেছিলেন সালমান হয়ত ফিট হয়ে গেছে।

ঘটনার বর্নণা দিতে গিয়ে সালমান শাহের মা নীলা আরো বলেন, ‘আমি দেখলাম আমার ছেলের হাতে পায়ের নখগুলো নীল। তখন আমি আমার হাজব্যান্ডকে বলেছি, আমার ছেলে তো মরে যাচ্ছে।’

এরপর ইস্কাটনের বাসা থেকে সালমান শাহকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানকার ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ময়না তদন্ত শেষে বলা হয় সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছে।

এই ঘটনার পর নায়কের পরিবার দাবী করে তিনি আত্মহত্যা নয়, তাকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তার পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। তার মা নীলা চৌধুরী অভিযোগ করে বলেন তারা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ সেটিকে অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে। পুলিশ জানায় অপমৃত্যুর মামলা তদন্তের সময় যদি বেরিয়ে আসে যে এটি হত্যাকাণ্ড, তাহলে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে হত্যা মামলায় মোড় নেবে।

তাই সালমান শাহের মৃত্যুকে ঘিরে অনেক প্রশ্ন উঠে। পরিবারের দাবিতে দ্বিতীয়বারের মতো ময়না তদন্ত করা হয়। মৃত্যুর আটদিন পরে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে তিন সদস্য বিশিষ্ট মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। সে বোর্ডের প্রধান ছিলেন ডা. নার্গিস বাহার চৌধুরী।

সে সময়ে ডা. নার্গিস বাহার চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘লাশটা আমি দেখেছি মরচুয়েরিতে। আমার কাছে মনে হয়েছে যেন সদ্য সে মারা গেছে। এ রকম থাকলে তার মৃত্যুর কারণ যথাযথভাবে নির্ণয় করা যায়। আত্মহত্যার প্রত্যেকটা সাইন সেখানে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ছিল। তার শরীরে আঘাতের কোনো নিশানা ছিল না।’ দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে আত্মহত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হলে মামলার কাজ সেখানেই থেমে যায়। আর এগোয় না।

সালমান শাহ’র পারিবারিক বন্ধু চলচ্চিত্র পরিচালক শাহ আলম কিরণ জানিয়েছিলেন, ‘শেষের দিকে অনেক মানসিক চাপে ছিলেন সালমান শাহ। পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং প্রযোজকদের সাথে বোঝাপড়ার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।

এমন ঘটনার পরে চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নায়কের আকস্মিক মৃত্যুতে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুরো দেশ। সারা দেশজুড়ে সালমানের অসংখ্য ভক্ত তাঁর মৃত্যু মেনে নিতে পারছিল না তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বিচার চায়। কয়েকজন তরুণী আত্মহত্যা করেন বলেও খবর এসেছিল। মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে না পারায় তার ভক্তদের মাঝে তৈরি হয় নানা প্রশ্নের।

জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহের মৃত্যুর পর দেশের চলচ্চিত্র অভাবনীয় ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রযোজকরা ও নির্মাতারা লোকসান  থেকে বাঁচতে সালমান শাহের মতই দেখতে কয়েকজন তরুণকে নিয়ে অসমাপ্ত সিনেমার কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন।

শাহ আলম কিরণ এই ব্যাপারে জানিয়েছিলেন, ‘পুরনো ঢাকার একটি ছেলেকে পেছন থেকে দেখতে সালমানের মতো মনে হয়। তার চুলের স্টাইল দেখতে পেছন দিকে থেকে সালমানের মতো। তখন তার ওপর পুরো ইন্ডাস্ট্রির দায়িত্ব পড়ে গেল। সালমানের অসমাপ্ত ছবিগুলোতে লং শট, ব্যাক টু ক্যামেরা, ওভার-দ্যা-শোল্ডার শটের মাধ্যমে সে ছেলেটাকে ব্যবহার করা শুরু হলো।’

এরপর পার হয়ে যায় অনেক বছর। সালমান শাহের মৃত্যুর সংবাদ দর্শকদের মনে দাগ কাটে। তার জনপ্রিয়তা তাকে অমর করে তোলে সকলের মাঝে। আজ দু যুগ পরেও এই নায়ককে মানুষ মনে করে, আলোচনা থামেনি। আর সম্প্রতি রুবি ইস্যুতে সাড়া দিয়ে সবাই এখন দাবি করছে নায়কের মৃত্যু রহস্য খোলাসা হোক। খুনী হয়ে থাকলে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি হোক।

কমেন্টস