টিএসসিতে গ্রিকদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন!

প্রকাশঃ জুলাই ৩১, ২০১৭

নুঝাত নাবিলাহ্, ঢাবি প্রতিনিধি-

বঙ্গভঙ্গের সময় থেকে পূর্ববঙ্গে মুসলিম সমাজে শুরু হওয়া নবজাগরণের ফল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ব্রিটিশদের বিদায়সহ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এই তিন দেশ সৃষ্টির ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ৬০০একর জমিতে গড়ে ওঠা সবুজে ঘেরা বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ভাস্কর্য, সমাধিসৌধ আর নানা রকম ঐতিহাসিক নিদর্শন।

এসব দেখার কৌতূহল থেকেই হোক কিংবা নিতান্তই সবুজের খোঁজে ঘুরতে আসার উদ্দেশ্যে হোক, ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কখনো ঘুরতে আসেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। আর ক্যাম্পাসে আসলে বসে মন খুলে কথা বলার জন্য সবার প্রথম পছন্দ সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র বা টিএসসি।

20527545_1618491541503681_207541292_n

ছবি-নুঝাত নাবিলাহ্

আড্ডা,গানে মুখরিত প্রাণচঞ্চল টিএসসির ভেতরের মাঠের দক্ষিণ-পূর্বে অবহেলায় মলিন হয়ে পড়ে আছে একটি প্রাচীন সমাধিসৌধ যা হয়তো অনেকের চোখেই পড়ে না। এই সমাধিসৌধকে ইতিহাসবিদরা বাংলাদেশে গ্রিকদের শেষ স্মৃতিচিহ্ন বলে মনে করেন। সমাধিসৌধের সামনে কোন লিখিত বিবরণী না থাকায় এর ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা নেই তেমন কারোর। কারো মতে এটি গ্রিকদের তৈরি মন্দির, কারো মতে এটি কারো কবর কেউবা মনে করে এটি কোন পুরাতন উপাসনালয়।

হালকা হলুদ রঙা চতুষ্কোন এই সমাধিসৌধটি প্রাচীন গ্রীসের ডরিক রীতিতে বানানো হয়েছিল আনুমানিক ১৮০০-১৮৪০ সালের দিকে। তৎকালে নারায়ণগঞ্জে বসবাসকারী ‘ডিমিট্রিয়াস’ নামক এক গ্রিক পরিবারের চার সদস্যের স্মৃতিতে নির্মিত হয়েছিল এই সমাধি সৌধ। চারদিকে লোহার গ্রীল দেয়া স্থাপনাটির পূর্বদিকে একটিমাত্র প্রবেশদ্বার। প্রবেশদ্বারের ওপর গ্রিক ভাষায় লেখা রয়েছে- ‘তারাই আশীর্বাদপ্রাপ্ত যারা সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছে মৃত্যুর জন্য।’

20561706_1618491948170307_1359741332_n

ছবি-নুঝাত নাবিলাহ্

এর ভেতরে আছে নয়টি সমাধি এবং প্রতিটি সমাধির সঙ্গে আছে কালো রঙের স্মৃতিফলক। এর পাঁচটিতে গ্রিক এবং চারটিতে ইংরেজি ভাষায় বিভিন্ন লেখা রয়েছে যা এখন বেশ অস্পষ্ট। নব্বইয়ের দশকে গবেষক হেলেন আবাদজি ঢাকায় গ্রিকদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সময় এসব লেখাকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। অযত্নের ফলে স্থাপনাটির আশেপাশে ময়লা জমেছে, আগাছা জন্মেছে আর লোহার বেড়ার গেট লাগানো থাকে বলে চাইলেও ভেতরে ঢুকা মুশকিল।

ঢাকাকে রাজধানী করার পর পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, আর্মেনিয়ান, ফরাসি, ইংরেজ, গ্রিকপ্রভৃতি অনেকেই ব্যবসা এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার জন্য ঢাকায় এসে বসবাস শুরু করে। বলা হয়, ইউরোপীয়দের মধ্যে গ্রিকরাই সবার শেষে ঢাকায় আসে। তবে কলকাতায় আগে থেকেই তাদের বসতি ছিল।

20561979_1618491708170331_741271907_n

ঢাকায় আসার সঠিক সময় জানা না গেলেও কলকাতায় গ্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠাতা আরগিরি যিনি কি না শেষ বয়সে ঢাকায় আসেন এবং ১৭৭৭ সালে ঢাকাতেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এবং তাঁর ছেলেদের ঢাকা ও বরিশালে স্থায়ীভাবে বসবাস ও ব্যবসা করা থেকে ধারণা করা যায় অষ্টাদশ শতকের শেষভাগেই ঢাকায় গ্রিকদের আগমন ও ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু হয়েছিল। গ্রিকরা মূলত লবণ, পাট, কাপড় ও চুনের ব্যবসা করত। কিন্তু ঢাকায় বসবাসকারী গ্রিকরা বেশিদিন বাঁচত না বলে গ্রিকদের সংখ্যা সবসময়ই কম ছিল।

কর্নেল ডেভিডসন গ্রিকদের অকাল মৃত্যুর সম্ভাব্যকারণ হিসেবে তাঁর বইতে উল্লেখ করেন তাদের বাড়ির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কথা। তারা যে গলিতে থাকত সেটি ছিল অপরিচ্ছন্ন এবং বাড়িগুলোতে যথেষ্ট আলো-বাতাস চলাচল করত না। এছাড়া ইংরেজদের সাথে তারা ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছিল না বলে অনেকে ঢাকা ছেড়ে চলে যায়।

20562115_1618492691503566_2026393975_n

১৯৬৫ সালের দিকে ঢাকায় গ্রিক দুইভাই বাস করতেন যারা নারয়ণগঞ্জে ‘র‍্যালীব্রাদার্স’ নামে পাটের কারখানা খুলেছিলেন। সংখ্যায় কম হলেও বেশ দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকায় ছিল গ্রিকদের বসবাস। কিন্তু এখন অবশিষ্ট নেই তাদের তেমন কোন স্মৃতিচিহ্ন। গ্রিকদের নির্মিত গির্জা ১৮৯৭ সালে প্রবল ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে যায়।সেটি আসলে কোথায় ছিল এখন আর কেউ বলতে পারে না।

ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে গ্রিক কবরস্থানসহ বিভিন্ন জায়গায় যেসব গ্রিক স্মৃতিচিহ্ন ছিল তার কিছুই এখন আর নেই।শুধু রয়েছে টিএসসিতে এই সমাধি সৌধটি।অযত্ন, অবহেলার ফলে এটিও এখন বিলুপ্তির পথে।

20562843_1618492354836933_1378455446_n

গ্রিক হাইকমিশনের অর্থায়নে ১৯৯৭ সালে একবার সংস্কার করার পর হয়নি আর কোন সংস্কার। টিএসসি কর্তৃপক্ষ এর ক্ষতি না হওয়ার দিকে নজর রাখলেও গ্রিক হাইকমিশনের উচিত এদেশে গ্রিকদের শেষ স্মৃতিচিহ্নটির পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা।

টিএসসির পরিচালক এএমএম মহিউজ্জামান চৌধুরী এ ব্যাপারে বিডিমর্নিংকে বলেন, স্থাপত্যটির রক্ষণাবেক্ষণের মূলত দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উপর। সেখান থেকে নির্দেশ আসলে সেই অনুযায়ী কাজ হয়। অনেকদিন এর কোন সংস্কার করা হয়নি। সামনেই টিএসসির পরিসর বাড়ানোসহ আরো কিছু পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর সাথে অবশ্যই এই গ্রিক সমাধির ব্যাপারে কাজ করা হবে।

20614068_1618491964836972_1272605619_n

ছবি-নুঝাত নাবিলাহ্

তিনি আরো বলেন, দেখলে হয়তো মনে হতে পারে দেয়ালের রঙ উঠে গেছে কিছু জায়গায় চুন খসে পড়েছে কিন্তু এটি একদম অযত্নে নেই। এর আশেপাশের জঙ্গল, ধুলাবালি পরিষ্কারের কাজ করা হয়ে থাকে।

টিএসসির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একসময় গ্রিক হাইকমিশন থেকে অর্থ প্রদান করা হতো সমাধিসৌধটি রঙ করাসহ যাবতীয় কাজ করার জন্য। এখন তা দেয়া হয় নাকি তা তার জানা নেই।

Advertisement

কমেন্টস