হলি আর্টিজানে হত্যাযজ্ঞের ছক উন্মোচন

প্রকাশঃ জুন ৩০, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

চলতি বছরই দেয়া হবে গুলশানের হলি আর্টিজান মামলার তদন্ত প্রতিবেদন। এরই মধ্যে হামলা পরিকল্পনার পুরো ছক উদঘাটন হয়েছে। আরও কিছু তথ্য পেতে পলাতক পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এমনটাই জানিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

তবে দীর্ঘ সময় চলে গেলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি মামলার তদন্ত কাজ। এমনকি হামলাকারী পাঁচ জঙ্গির লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পায়নি তদন্ত সংস্থা। আর এটি না পাওয়া গেলে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেয়া সম্ভব নয়। তবে পলাতক আট আসামির মধ্যে কমপক্ষে তিনজনকে গ্রেফতার করা গেলেই তদন্ত কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

তদন্ত সূত্রে আরও জানা গেছে, গত বছরের ১ জুলাই হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় মাস্টারমাইন্ডসহ ২৬ জনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তারা সবাই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির নব্য ধারার (নব্য জেএমবি) সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাদের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে মাস্টারমাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, দুই প্রশিক্ষক এবং পাঁচ হামলাকারীসহ ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া জীবিত অবস্থায় গ্রেফতার করা হয়েছে মামলার চার আসামিকে। এর মধ্যে তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পলাতক রয়েছে ভয়ংকর আরও আট জঙ্গি। হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল গাইবান্ধার একটি চরে। এমনকি হামলায় সরাসরি যুক্ত পাঁচ জঙ্গির সামরিক প্রশিক্ষণও দেয়া হয়েছিল এই জেলার দুর্গম চরে।

জানতে চাইলে মামলার তদন্তকারী সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম  বলেন, হলি আর্টিজানে হামলার পর এক বছরে সারা দেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অনেক জঙ্গি মারা গেছে। এর মধ্যে ৯ জন রয়েছে যারা জীবিত থাকলে হলি আর্টিজানে হামলা মামলার আসামি হতো। এই মামলায় এখন পর্যন্ত তিনজন

নিজেদের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। পলাতক তিন জঙ্গিকে গ্রেফতার করা গেলেই মামলার তদন্ত শেষ হবে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এ হামলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী সংগঠনের যোগসূত্র পাওয়া যায়নি।

সিটিটিসি ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, মামলায় গ্রেফতার চারজনের মধ্যে ভয়ংকর জঙ্গি রাজীব ওরফে রাজীব গান্ধী ওরফে জাহাঙ্গীরও রয়েছে। হামলার পুরো পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত এই রাজীব ইতিমধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তার জবানবন্দিতে এই হামলায় জড়িতদের নাম এসেছে। এ ছাড়া হামলার অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান ও রাকিবুল হাসান রিগ্যান আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সন্দেহভাজন আসামি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজা করিম এখনও কারাগারে।

আরও জানা গেছে, গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড এবং সমন্বয়কারী ছিল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী। তার সঙ্গে পরিকল্পনা এবং হামলার অপারেশনাল কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছে নুরুল ইসলাম মারজান। যোগাযোগ সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল তাওসিফ হোসেন। ঘটনার দুই মাস পর ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় পুলিশের অভিযানে তামিম ও তাওসিফ নিহত হয়। মারজান চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়।

গুলশানে হামলাকারীদের গাইবান্ধার চরে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ ও রায়হান কবির তারেক। জাহিদ ২ সেপ্টেম্বর রূপনগরে এবং রায়হান ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে পুলিশের অভিযানে নিহত হয়। কল্যাণপুরে নিহত আরেক জঙ্গি আবু নাঈম হাকিম হামলার অস্ত্র সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

গুলশানে হামলাকারী জঙ্গিদের থাকার জন্য ঢাকায় বাসা ভাড়া করেছিল ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা তানভির কাদেরি ও ফরিদুল ইসলাম আকাশ। হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি হামলার মিশন বাস্তবায়ন করেছে তানভির কাদেরির ভাটারার বাসা থেকে। তানভির কাদেরি গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর আজিমপুরে এবং আকাশ একই বছরের ৮ অক্টোবর গাজীপুরের পাতারটেকে পুলিশের অভিযানে নিহত হয়। এদিকে গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী সারোয়ার জাহান মানিক গত বছরের ৮ অক্টোবর আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে নিহত হয়।

গত বছরের ১ জুলাই রাতে জঙ্গিরা গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়ে দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন দু’জন পুলিশ কর্মকর্তা। হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাস্টিকার ছাত্র মীর সামিহ মোবাশ্বের, মালয়েশিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী নিবরাস ইসলাম এবং বগুড়ার শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল। তারা পরদিন ভোরে কমান্ডো অভিযান ‘থান্ডারবোল্ট’-এ নিহত হয়।

হলি আর্টিজানে অভিযানের সময় নিহত পাঁচ জঙ্গির লাশের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এখনও তদন্ত সংস্থার কাছে জমা দেয়া হয়নি কেন, জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, শনিবার প্রতিবেদনটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, পলাতক আট আসামি হল : পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত আবদুস সামাদ ওরফে মামু, রাশেদ ওরফে র‌্যাশ, মামুনুর রশীদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদ, পরিকল্পনা ও গ্রেনেড সরবরাহকারী সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, বিস্ফোরক সরবরাহকারী হাদিসুর রহমান সাগর ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান এবং অর্থ সংগ্রহকারী বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট। পলাতক জঙ্গিদের মধ্যে সোহেল মাহফুজ, রাশেদ ওরফে র‌্যাশ এবং বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা আরও জানান, গুলশান হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরক চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশে এসেছে। অস্ত্র ও বিস্ফোরক সরবরাহকারী মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বিষয়টি বলেছে।

পরিকল্পনা হয়েছিল গাইবান্ধার চরে : মামলার তদন্তকারী সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, সাত জঙ্গির উপস্থিতিতে গাইবান্ধার সাঘাটায় জঙ্গি নজরুল ইসলাম ওরফে বাইক হাসানের বাসায় হামলার পরিকল্পনা হয়। গত বছরের এপ্রিলে ওই বৈঠক হয়। বৈঠকে উপস্থিত ছিল তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান মানিক, নুরুল ইসলাম মারজান, রাজীব গান্ধী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম, রায়হান কবির তারেক, মামুনুর রশীদ রিপন ও শরীফুল ইসলাম খালিদ।

তদন্তকারী সংস্থার প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, পরিকল্পনার পর তারা হামলার জন্য ক্যাডার বাছাই করে। তারা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয় ঢাকায় হামলা করবে। ঢাকায় হামলা করতে হলে শহর সম্পর্কে ভালো ধারণা রাখে এমন ক্যাডার লাগবে। এ ধরনের তিনজনকে তারা বাছাই করে। তারা বড় ধরনের অপারেশনে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠুরতা ধরে রাখতে পারবে কিনা এ নিয়ে সন্দিহান ছিল জঙ্গিরা। এ কারণে অনেকগুলো হত্যার সঙ্গে জড়িত বগুড়ার দুই জঙ্গিকে বাছাই করা হয়।

সিটিটিসির কর্মকর্তারা জানান, মেজর (অব.) জাহিদ ও রায়হান কবির মাস্টার ট্রেইনার ছিল। প্রশিক্ষণ চলে ২৮ দিন। হামলার আগে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গি ঝিনাইদহে কথিত হিজরত করে। সেখানে তারা কিছুদিন অবস্থান করে একাধিক টার্গেটেড কিলিং মিশন বাস্তবায়ন করেছে। এটা জঙ্গিদের ভাষায়, বড় হামলার আগে হাতে-কলমে শিক্ষা। তারপর তাদের ঢাকায় ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ভাটারার একটি বাসায় রাখা হয়। ওই বাসা থেকে প্রথমে রিকশায় এবং পরে হেঁটে গিয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালানো হয়।

হলি আর্টিজানকে বেছে নেয়ার কারণ : তদন্তকারী সংস্থা সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই এ হামলার পরিকল্পনার পুরো ছক পেয়েছি। তদন্তে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, হামলার তিন মাস আগে অর্থাৎ গত বছরের এপ্রিলে তারা পরিকল্পনা করে ঢাকায় বড় ধরনের হামলা করবে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কভারেজ বা মিডিয়া কভারেজ পেতে নব্য জেএমবি এ পরিকল্পনা করে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশে যে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে, এটি তারা প্রমাণ করতে সক্ষম হবে।’

মনিরুল ইসলাম আরও বলেন, এ ধরনের হামলার পর জঙ্গিরা আশা করেছিল, অনেক মানুষ তাদের আস্থায় এনে জঙ্গিবাদে জড়াবে। পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রচুর অর্থ পাবে। এটি তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। তবে তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

মনিরুল ইসলামের ভাষ্য- জঙ্গিরা হামলার জন্য প্রথমে হলি আর্টিজান নির্ধারণ করেনি। তাদের টার্গেট ছিল গুলশান ও বারিধারায় হামলা করবে। হামলার চার দিন আগে তারা হলি আর্টিজান হামলার জন্য বেছে নেয়। এর কারণ সেখানে বেশি বিদেশির আনাগোনা হয়। শুক্রবার সেটি বেশি হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলতে তেমন কিছু নেই। সবদিক থেকেই তারা এটিকে উপযুক্ত টার্গেট মনে করেছে।

অর্থের জোগান : সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তের প্রয়োজনে হিসাব করে দেখেছি, হামলার আগে জঙ্গিরা অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে এবং অপারেশনে যেসব সামগ্রী ব্যবহার করেছে- তা ‘লো কস্ট টেরোরিস্ট অ্যাটাক’। এখানে খুব বেশি খরচ হয়নি। ৮-৯ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আর এই খরচ তারা মিটিয়েছে কমন ফান্ড থেকে। এ কারণে কোন হামলা কোন টাকায় হয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন। তারপরও এটি বের করার চেষ্টা চালাচ্ছি।’ তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত বছর আর্থিকভাবে সচ্ছল অনেকেই নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়েছিল। অনেকেই কথিত হিজরতের আগে অ্যাপার্টমেন্ট ও গাড়ি বিক্রি করেছিল। তাদের সঞ্চয়ের সব টাকা সংগঠনে দিয়েছিল। এ কারণে ৮-৯ লাখ টাকা জোগাড় করতে বাইরে থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন হয়নি।

কমেন্টস