মসজিদ ও ভাস্কর্য নিয়ে সেদিন সুলতানা কামাল যা বলেছিলেন

প্রকাশঃ জুন ৩, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

শুক্রবার বাদ জুমা বায়তুল মোর্কারমে হেফাজতে ইসলাম সমাবেশ করে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামালকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দিয়েছে। গত ৩০ জুন নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশনের টকশো ‘জনতন্ত্র গণতন্ত্র’ সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনের ভাস্কর্য বিতর্ক নিয়ে ওই টকশোতে নাকি সুলতানা কামাল বলেছিলেন, ‘দেশে মূর্তি না থাকলে মসজিদও থাকতে দেয়া হবেনা’। এই বক্তব্যের প্রতিবাদে শুক্রবার প্রতিবাদ সমবেশে হেফাজত ইসলাম সুলতানা কামালের গ্রেফতারের আল্টিমেটাম দিয়েছেন।

নিউজ টুয়েন্টিফোর টেলিভিশনের টকশো ‘জনতন্ত্র গণতন্ত্র’ এ সুলতানা কামাল কি সত্যি এ কথা বলেছিলেন? ইউটিউভে আপলোড করা ওই টকশোর ভিডিওটি পাঠকদের জন্য আবারও দেওয়া হল।

ওই দিনের ‘জনতন্ত্র গণতন্ত্র’ টকশোতে সুলতানা কামাল ছাড়াও হেজাফতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন, শাহবাগ আন্দোলনের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, আওয়ামী লীগের সাংসদ অপু উকিল উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় হেফাজতে ইসলামের নেতা মুফতি সাখাওয়াত বলেন, আসলে ওই তাওহীদের দাবি হচ্ছে, এক আল্লাহর উপসনা করতে হবে, আল্লাহর জাত ও সিফাতে কাউকে কোনভাবে শরিক করা যাবে না। সে দৃষ্টিকোন থেকে, মূর্তি পুজা বা এক আল্লাহ ছাড়া কাউকে অন্য কারো পূজা করার নানা ক্ষেত্র আমরা পৃথিবীতে দেখি, ইসলাম একত্ববাদের জায়গাটাকে কোনভাবেই কোন মুসলমানকে তাওহীদ বিরোধী কোন কাজে জড়িত হউক, ইসলাম তা চায় না। মূর্তি পূজা যে শুরু হয়েছে তা কিন্তু আমরা অস্বীকার করতে পারবো না। হিন্দু ধর্মের বিশাল একটি অংশ মূর্তি পূজা করে। যদিও এ কথা প্রমাণিত যে, হিন্দু ধর্মের মূল গ্রন্থগুলোতে, আমি যতটুকু জানি মূর্তি পুজার কথা নেই। সেখানে মূর্তি পুজা না করে এক ঈশ্বরের উপসনা করার কথা বলা হয়েছে। তদরুপ ইসলাম ধর্মেও।

তারপরেও আমরা দেখি, ইসলাম ধর্মের কিছু মানুষ নানাভাবে বিভ্রান্ত হয়ে মাজার পুজা করছে, কবর পূজা করছে, এটা কিন্তু ইসলামের বিধান নয়। এটা একদিনে হয়নি। প্রথমে একটি মূর্তি স্থাপতি হয়েছে কাউকে স্মরণ করার জন্য কিংবা কাউকে সম্মান দেয়ার জন্য। ধীরে ধীরে এটাকে উপাসনা বা পুজায় রুপ দেয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, তোমরা মূর্তি থেকে দূরে থাকো বা তোমরা মূর্তির অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো। এখন যে ভাস্কর্যের বিষয়টি আসছে। কেউ ভাস্কর্য বলছে, কেউ মূর্তি বলছে। আমি এটাকে মূর্তি বলি। এটা দিবলকের মতো স্পষ্ট যে এটা দেবী থেমিসের মূর্তি। ডান-বাম, মিডিয়া এমনকি প্রধানমন্ত্রীও বলছেন এটা দেবি থেমিসের মূর্তি। আর থেমিস হচ্ছে গ্রিকদের দেবি। যারা এটিকে উপাসনা করে, পূজা করে। আর এটি সেখানে (সুপ্রিম কোর্টের প্রাঙ্গনে) স্থাপিত হবে সেটা কখনো কোন মুসলমান মেনে নিতে পারে না। এটাকে কেন ন্যায় বিচারের প্রতিক মনে করা হবে।

এ প্রেক্ষিতে ইমরান এইচ সরকার বলেন, এটাকে শুধু আমরা মনে করি না। সারা বিশ্বের মানুষরা মনে করে। অনেক মুসলিম দেশেও মনে করা হয়। বড় বড় মুসলিম দেশেও মনে করা হয়।

মুফতি সাখাওয়াত বলেন, আমরা কেন থেমিসকে মনে ন্যায়ের প্রতিক মনে করবো? এ প্রেক্ষিতে সুলতানা কামাল বলেন, এটি থেমিস না হয়ে অন্য কেউ হতে পারতো। আমিও হতে পারতাম।

সুলতানা কামালের কথার প্রেক্ষিতে মুফতি সাখাওয়াত বলেন, এই মূর্তি স্থাপনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী কাজ করা হয়েছে।
ইমরান বলেন, এটাকে মূর্তি বলা হচ্ছে কেন, এটা তো একটি ভাস্কর্য।

সুলতানা কামাল বলেন, আপনি একটি ভুল কথা বলেছেন যে, এটা একটি মূর্তি। আসলে এটা একটি ভাস্কর্য।
ইমরান বলেন, এটা নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে কেন। যেখানে কোন পূজা হচ্ছে না। সেটাকে কেন মূর্তি বলা হবে। এটা একটা ভাস্কর্য, যেখানে মানুষের অবয়ব আছে। তাহলে আপনি সব ভাস্কর্যকেই মূর্তি বলবেন।

এ কথার প্রেক্ষিতে মুফতি সাখাওয়াত বলেন, বাংলা একাডেমির পুস্তকসহ অন্যান্য পুস্তুকে লেখা আছে ভাস্কর্য মানে মূর্তি।
এ কথার প্রেক্ষিতে ইমরান বলেন, আমাদের নবীজি যে যখন কাবা ঘরের সব মূর্তি সরাচ্ছিলেন তখন মাদার মেরির মূর্তিটা তিনি সরাননি।
এ কথার প্রেক্ষিতে মুফতি সাখাওয়াত বলেন, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। এটা ইসলামের কোথাও নাই। বাইতুল্লাহর ভেতরে যতটা মূর্তি ছিল, একটাও আল্লাহর নবী রাখেন নাই।

এ সময় সুলতানা কামাল বলেন, সেটা যদি (সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গনে স্থাপিত) মূর্তিও হয়, তাহলে তো সমস্যা নেই। মুসলমানরা পূজা না করলেই হল।
এ সময় মুফতি সাখাওয়াত বলেন, সমস্যা আছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি সব থাকবে।

এ কথার প্রেক্ষিতে সুলতানা কামাল বলেন, তার মানে কি? মূর্তি থাকবে না, তাহলে তো মসজিদও থাকার কথা না।
মুফতি সাখাওয়াত বলেন, আদালত প্রাঙ্গনের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় কোন ধর্মের প্রতিক থাকতে পারে না।

সুলতানা কামাল বলেন, সেখানে তো মসজিদও আছে, তাহলে মূর্তি থাকবে না কেন?
মুফতি সাখাওয়াত বলেন, মসজিদও থাকবে মন্দিরও থাকবে। যার যার মত ইবাদত-উপাসনা করবে। হেফাজত ইসলাম আজ পর্যন্ত কোন ধর্মের প্রতি আঘাত করেনি।

সুলতানা কামাল বলেন, আপনারা আঘাত করেছেন, সারক্ষণ করছেন।
ইমরান এইচ সরকার বলেন, আপনি এখনই করলেন। হিন্দুদের ধর্মের লোকদেরকে জ্ঞান দিলেন, সে মূর্তি পুজা করবে কি করবে না। আপনি ঠিক করে দিচ্ছেন, হিন্দুরা মূর্তি পূজা করবে কি করবে না।

মুফতি সাখাওয়াত বলেন, আমরা তা ঠিক করে নাই। আমরা বলেছি হিন্দুরা মূর্তি পুজা করে। আপনি যদি আমাদের (হেফাজতে ইসলাম) ১৩ দফা পড়েন তাহলে বুঝবেন। সেখানে সবার কথা বলা আছে।
এ সময় ইমরান বলেন, আমি পড়েই বলছি, আপনাদের যে ১৩ দফার বক্তব্য সেটি অত্যন্ত কুৎসিত বক্তব্য।

 

Advertisement

কমেন্টস