ভাস্কর মৃণাল হকের কান্না, ‘এটি গ্রিক দেবীর নয়,শাড়ি-ব্লাউজ পরা বাঙালি মেয়ের ভাস্কর্য’

প্রকাশঃ মে ২৬, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত দেবি থেমিসের ভাস্কর্যটি নিয়ে বিতর্ক ওঠায় বৃহস্পতিবার বিকালে এটিকে সরিয়ে অন্য কোথাও পুনঃস্থাপনের নির্দেশ দেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এরপর দিবাগত রাত ১২টার পর সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত দেবী থেমিসের মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করা হয়। এসময় ভাস্কর মৃণাল হকের উপস্থিতিতে মোট ২০ জন শ্রমিক ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন।

এসময় ভাস্কর্যটির নির্মাতা ভাস্কর মৃণাল হকের কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, ‘এ ভাস্কর্য কোনও গ্রিক দেবীর নয়। বরং এটি বাঙলি মেয়ের ভাস্কর্য। যার হাতে বিচারের প্রতীক।’

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মৃণাল হক। তিনি বলেন, ‘এ ভাস্কর্য কোনও গ্রিক দেবীর নয়। এটি সম্পূর্ণ বাঙালি মেয়ের ভাস্কর্য। শাড়ি-ব্লাউজ পরা একজন বাঙালি নারীকে উপস্থাপন করা হয়েছে এ ভাস্কর্যে। আর এখানে দাড়িপাল্লা বিচারের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাকে এ বিষয়ে গতকাল জানানো হয়েছে। ভাস্কর্য সরিয়ে হয়তো অ্যানেক্স ভবনের সামনে স্থাপন করা হতে পারে। আমি আমেরিকায় রাজকীয়ভাবে ছিলাম। দেশকে ভালোবেসে আমি এখানে এসেছি। আমি ঢাকা শহরে প্রায় ২৫টির মতো ভাস্কর্য করেছি। প্রায় সবগুলোই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে করেছি। এর আগে দেশে ভাস্কর্যের কোনও কনসেপশন ছিল না। আমি সেটা দিয়েছি।’

আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমার হাত-পা বাঁধা। দেশের শান্তির স্বার্থে অনেক সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হয়। কিন্তু ভুল সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া কষ্টকর।’ কথাগুলো বলার সময় তার চোখ জলে ছলছল করছিল।

ভাস্কর্যটি যেন পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া না হয়, সেজন্যই তিনি ভাস্কর্য সরানোর কাজটি তদারকিতে এসেছেন।

এ প্রসঙ্গে মৃণাল হক বলেন, ‘আমাকে চাপ দিয়ে এটা সরানো হয়েছে। আমাকে এটা সরানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই আমি এখানে এসেছি।’

মৃণাল হক আরও বলেন, ‘আমার কিছু বলার নাই। অনেকের অনেক ক্ষমতা আছে। আমি বানিয়েছি, আমাকে সরাতে বলা হয়েছে আমি তদারকি করছি।’ কান্না জড়িত কন্ঠে মুখ ঢেকে তিনি আরও বলেন, ‘এসব বলতে গেলে বিপদ। এর আগে আমার বানানো লালনের ভাস্কর্য ভাঙা হয়েছে। আমাকে গতকাল জানান হয়েছে।’

এর আগে হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত গ্রিক দেবী থেমিসের ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলতে অথবা জাতীয় ঈদগাহ থেকে যেন দেখা না যায়, তার ব্যবস্থা নিতে প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এছাড়া গত ২৫ এপ্রিল আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরানোর সিদ্ধান্ত প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নেবেন।

অপরদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১টার সময় তিনি জানান,‘বৃহস্পতিবার বিকেলে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা আমাকে ডেকেছিলেন। এসময় ড. কামাল হোসেন, খন্দকার মাহবুব হোসেনসহ সুপ্রিম কোর্টের বারের বর্তমান ও সাবেক দায়িত্বশীলরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, সুপ্রিম কোর্টের সামনের ভাস্কর্যকে কেন্দ্র করে আমি কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা চাই না। এটি সরিয়ে নেওয়া হোক। এবং এমন জায়গায় স্থাপন করা হোক যেন প্রশ্ন না ওঠে ।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, ‘এসময় সুপ্রিম কোর্টের সামন থেকে ভাস্কর্যটি সরিয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে আমরা প্রধান বিচারপতিকে বলেছি।’

এরপরেই প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

ভাস্কর্যটি কে জাতীয় ঈদগাহ থেকে দূরে অবস্থিত সুপ্রিম কোর্টের অ্যানেক্স ভবনের সামনে স্থানান্তর করা হবে বলে জানা গেছে। ওই জায়গায় এটিকে পুনঃস্থাপনের জন্য এরই মধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।

২০১৬ সালের শেষ দিকে গ্রিক দেবীর ভাস্কর্যটি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপন করা হয়। এরপর প্রায় দুই মাস এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে কোনও মত প্রকাশ না হলেও ফেব্রুয়ারিতে মুখ খোলেন হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী। এক বিবৃতিতে তিনি সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্যটি অপসারণের দাবি জানান।

এরপর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সবগুলো ধর্মভিত্তিক সংগঠন ভাস্কর্যটি সরানোর দাবিতে আন্দোলন করছিল। হেফাজতের ঘোষণা ছিল, অপসারণ করা না হলে শাপলা চত্বরে আবারও সমাবেশ করবে তারা।

এদিকে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য সরিয়ে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতী ফয়জুল্লাহ ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, বাংলাদেশের জনগণ সরকারকে ধন্যবাদ জানাবে।

হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, প্রধানমন্ত্রী ওলামা কেরামকে আস্থা ও ভরসা রাখতে বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কথার প্রতিফলন ঘটেছে, সেজন্য তাকে ধন্যবাদ। দেশের মানুষের ধর্মীয় চেতনাবোধকে মূল্য দিয়ে মূর্তি (ভাস্কর্য) সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। সরকারে শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে। মূর্তি (ভাস্কর্য) নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছেন সরকার।

বৃহস্পতিবার রাতে সরানোর কাজ শুরু হয়। কয়েকজন শ্রমিক সরানোর কাজ করছেন। ভাস্কর্যটির শিল্পী মৃণাল হককেও ভেতরে দেখা যাচ্ছে। তবে কাদের তত্ত্বাবধানে এ কাজ করা হচ্ছে তা জানা যায়নি। সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন।

এর আগে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে স্থাপিত ভাস্কর্যটি অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছিল হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী এক বিবৃতিতে বলেন, সর্বোচ্চ বিচারালয়ের সামনে গ্রিক দেবীর মূর্তি স্থাপন বাংলাদেশের গণমানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও আদর্শিক চেতনার একেবারেই বিপরীত। অবিলম্বে এটি অপসারণের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অন্যথায় ইমান, আকিদা ও ঐতিহ্য রক্ষায় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবে।

তবে হেফাজতের এই দাবির নিন্দা জানিয়েছেন বিশিষ্ট নাগরিকেরা ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি।

এর আগে গত ১১ এপ্রিল রাতে গণভবনে কওমি মাদ্রাসার বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিদের এক সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি উচ্চ আদালত প্রাঙ্গণের সামনে স্থাপিত গ্রিক দেবীর ভাস্কর্য সরানোর পক্ষে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা এখানে থাকা উচিত নয়।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের হাইকোর্টের সামনে গ্রিক থেমেসিসের এক মূর্তি লাগানো হয়েছে। সত্য কথা বলতে কি, আমি নিজেও এটা পছন্দ করিনি। কারণ, গ্রিক থেমেসিসের মূর্তি আমাদের এখানে কেন আসবে। এটা তো আমাদের দেশে আসার কথা না। আর গ্রিকদের পোশাক ছিল একরকম, সেখানে মূর্তি বানিয়ে তাকে আবার শাড়িও পরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটাও একটা হাস্যকর ব্যাপার করা হয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, এটা এখানে থাকা উচিত নয়। আমি আপনাদের বলব, আপনারা ধৈর্য ধরেন। এটা নিয়ে কোনো হইচই নয়। একটা কিছু যখন করে ফেলেছে, সেটাকে আমাদের সরাতে হবে। সেটার জন্য আপনারা একটুকু ভরসা অন্তত রাখবেন যে এ বিষয়ে যা যা করার আমি তা করব।’

কমেন্টস