সেই রাতে রেইনট্রিতে দুই ছাত্রীসহ ৪ জনকে ধর্ষণ করে সাফাত-নাঈম

প্রকাশঃ মে ২১, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেল আলোচিত ধর্ষণের ঘটনার আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। দু’জন নয়; ঘটনার রাতে চার তরুণীকে ধর্ষণ করেছিল আপন জুয়েলার্সের অন্যতম মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদ ও তার বন্ধু আবদুল হালিম ওরফে নাঈম আশরাফ। তাদের মধ্যে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন। অন্য দু’জনের কথা এতদিন অজানা ছিল। রিমান্ডে নাঈমকে জিজ্ঞাসাবাদের পর ধর্ষণের শিকার আরও দুই তরুণীর কথা জানা গেছে। তবে তার দাবি, ‘সম্মতি’ নিয়েই ওই রাতে তাদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে দুই বন্ধু। এদিকে বনানী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ করেছে পুলিশের তদন্ত কমিটি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বনানীর ওসির বিরুদ্ধে এ ঘটনায় গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রথমে দুই তরুণীকে পৃথক রুমে ধর্ষণের পর সাফাত-নাঈম তাদের গাড়িতে করে বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর অন্য দু’জনের সঙ্গে তারা একই ধরনের কাজ করে। বিভিন্ন সময় ধর্ষণের ঘটনার বাদীসহ দুই তরুণীর বক্তব্য পুলিশ নিলেও এখন বাকি দু’জনকে খুঁজছেন গোয়েন্দারা। পেলে তাদেরও বক্তব্য নেওয়া হবে। স্বেচ্ছায় নাকি জোরপূর্বক তাদের শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করতে বাধ্য করেছিল সাফাত-নাঈম; তা স্পষ্টভাবে জানবে পুলিশ। কেন তারা এতদিন বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছিলেন তাও জানার চেষ্টা করা হবে।

সূত্র জানায়, ২৮ মার্চ রেইনট্রি হোটেলে সাফাতের জন্মদিনের পার্টিতে মোট ছয় তরুণী উপস্থিত হন। তাদের মধ্যে একজন পার্টিতে নেচে-খেয়ে বাসায় ফিরে যান। বাকি চারজনকে ধর্ষণ করে সাফাত-নাঈম। আরেক তরুণীর সঙ্গে খারাপ আচরণ করার চেষ্টা করা হলেও মামলার বাদী অনুনয়-বিনয় করে তাদের হাত থেকে বাঁচিয়ে দেন। এদিকে এক তরুণী ঘটনার রাতে তার ব্যবহৃত পোশাক পুলিশের কাছে দিয়েছেন। ওই পোশাক তিনি না ধুয়ে রেখে দিয়েছিলেন। এখন পুলিশ সেই পোশাকের ডিএনএ পরীক্ষা করছে। এর সঙ্গে অভিযুক্ত নাঈমের ডিএনএ আলামত মিলিয়ে দেখা হবে। এ ছাড়া ছয়টি মোবাইল ফোন সেটের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য আদালতের অনুমতি নেওয়া হয়েছে। তবে এখনও নাঈমের মোবাইল ফোন সেটটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই ধারণা করা হচ্ছে, আলামত লুকাতেই সে সেটটি সরিয়ে ফেলেছে। তবে তার খোঁজ চলছে। এ ছাড়া নাঈম জিজ্ঞাসাবাদে শোবিজ জগতের অন্তত ৬০ তরুণীর নাম বলেছে, যাদের সঙ্গে তার কোনো না কোনোভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। নাঈম জানায়, অরিজিৎ সিংকে বাংলাদেশে আনার অনুষ্ঠানটি ছিল তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। এর পরপরই সাফাতের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়।

পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, যেহেতু রেইনট্রি হোটেলের মালিকের ছেলের মাধ্যমে সাফাত ওই হোটেল বুকিং নিয়েছিল তাই প্রয়োজনে তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান জানান, তদন্তের স্বার্থে আসামিদের কিছু ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস ও ডিএনএ নমুনা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আদালতের অনুমতিও নেওয়া হয়েছে। ধর্ষণের ঘটনার কোনো ভিডিও ফুটেজ এখনও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ফেসবুকে ধর্ষণের শিকার দুই তরুণীর ছবি ছড়িয়ে অপপ্রচারের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।

এদিকে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদের দেহরক্ষী রহমত আলী ওরফে আজাদকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তিন দিনের রিমান্ড শেষে গতকাল শনিবার পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে হাকিম তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পুলিশ মামলার এজাহারভুক্ত ওই আসামির নতুন করে রিমান্ডের আবেদন করেনি, সে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়নি। মামলার অন্যতম অভিযুক্ত নাঈম আশরাফ নামধারী আবদুল হালিমকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রয়েছে।

গত ২৮ মার্চ রাতে বনানীর ‘দ্য রেইনট্রি’ হোটেলে জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রী।

বনানী থানা পুলিশের গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে তদন্ত কমিটি: দুই তরুণী ধর্ষণের ঘটনায় মামলা নিতে বিলম্ব, ধর্ষিতাদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং আসামি গ্রেফতারে বনানী থানা পুলিশের বেশকিছু গাফিলতির প্রমাণ পেয়েছে পুলিশেরই তদন্ত কমিটি। রোববার এ-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য মিলিছে।

দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ পেয়েও মামলা নিতে বনানী থানা পুলিশ গড়িমসি, তাদের হয়রানি এবং থানার ওসি ফরমান আলীর বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করেন। অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমানকে প্রধান করে যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় (ক্রাইম) ও যুগ্ম কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেনকে সদস্য করা হয়।

তদন্তে কী পাওয়া গেছে তা প্রকাশ না করলেও কমিটির প্রধান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তারা তদন্ত শেষ করে এনেছেন। আজকালের মধ্যেই তা জমা দেওয়া হবে। যেসব পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দোষ প্রমাণিত হবে, তাদের শাস্তি পেতেই হবে।

কমেন্টস