‘বাংলার শিখা’ নিলামে তুলে জাহাজশূন্য হচ্ছে বিএসসি

প্রকাশঃ মে ১২, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

দিন দিন জাহাজ শূন্য হয়ে পড়েছিলো বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন। তার মধ্যে ২৫ বছরের পুরনো ‘বাংলার শিখা’ দুই বছর ধরে বসা। জাহাজটি থেকে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের (বিএসসি) আয় তো ছিলই না বরং মাসে ব্যয় হচ্ছিল ৬০ লাখ টাকা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এ সংস্থাটিকে বছরে কেবল এই একটি জাহাজের পেছনে লোকসান দিতে হচ্ছে ৭ কোটি টাকারও বেশি। তাই লোকসানের পাল্লা আর ভারি না করে ‘বাংলার শিখা’কে স্ক্র্যাপ হিসেবে নিলামে তুলতে যাচ্ছে বিএসসি। আগামী ২৪ মে নিলাম। এর আগে আরও ১০টি জাহাজ নিলামে বিক্রি করে সংস্থাটি।

কোনো নতুন জাহাজ যুক্ত না হওয়ায় বিএসসি’র বহরে এখন জাহাজ সংখ্যা ৩৬ থেকে নেমে দাঁড়াচ্ছে ২টিতে। ফলে জাহাজশূন্য হয়ে পড়ছে বিএসসি। বহরে থাকা দুটি জাহাজ (‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘সৌরভ’) বর্তমানে ‘বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন’র (বিপিসি) তেল পরিবহনে ভাড়ায় খাটছে। এ জাহাজ দুটির অবস্থাও করুণ। যে কোনো সময় জাহাজ দুটি অকেজো হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। একসময় বিপিসি তাদের বেশিরভাগ তেল বিএসসির জাহাজের মাধ্যমে পরিবহন করলেও ধীরে ধীরে বিপিসি বেসরকারি জাহাজের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বিএসসির জীর্ণদশার জন্য অনেকেই অনিয়ম-দুর্নীতিকে দায়ী করছে। এরপরও আশার আলো দেখাচ্ছেন সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, আগামীতে নতুন নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে বিএসসি ঘুরে দাঁড়াবে।

সূত্র বলছে, ১৯৭২ সালে এমভি বাংলার দূত এবং এমভি বাংলার সম্পদ নামে দুইটি জাহাজ নিয়ে যাত্রা শুরু বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন। সংস্থার বহরে জাহাজের সংখ্যা ৩৬টিতে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিয়ম-দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনায় সংস্থাটি লোকসান দিতে দিতে এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। জাহাজ বিক্রি করে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে।

কথা হয় বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) মো. আলমগীরের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাংলার শিখা জাহাজটি পরিচালনায় মাসে ব্যয় হচ্ছিল ৬০ লাখ টাকা। দু’বছর ধরে কোনো আয় ছিল না। তাই বোর্ড কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে এটি নিলামে তোলা হচ্ছে। স্ক্র্যাব হিসেবে ১৫ কোটি টাকায় এটি যে কেউ কিনবে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ধ্বংসের একেবারে শেষ প্রান্তে চলে এসেছে বিএসসি। বহির্বিশ্বে চলাচলের উপযুক্ততা হারিয়েছে বহু আগেই।

সর্বশেষ ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নিলামে ওঠা ‘বাংলার শিখা’ জাহাজটি শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে গিয়েছিল। এটির দুটি ইঞ্জিনই বিকল। গেল রোয়ানু যখন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় আঘাত হানে তখন এটি নোঙর ছিঁড়ে সন্দ্বীপ চ্যানেল উপকূলে আছড়ে পড়ে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন বিদেশ থেকে যে জ্বালানি তেল আমদানি করে আনে, তা আসে মাদার ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে। এসব মাদার ট্যাঙ্কার গভীরতার কারণে বন্দরের বহির্নোঙরে অর্থাৎ কুতুবদিয়ার কাছাকাছি নোঙর করে। ফলে এসব জ্বালানি তেল লাইটারিংয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেলের তিন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার পতেঙ্গার গুপ্তখালের অয়েল ট্যাঙ্কে নিয়ে আসা হয়। এ মূল কাজটি করানো হচ্ছিল বিএসসির মাধ্যমে। এখন প্রশ্ন উঠেছে, বিএসসির যে দুটি জাহাজ এখনও টিকে আছে তার মেয়াদও পার হয়েছে বহু আগে। ‘বাংলার জ্যোতি’ ও ‘বাংলার সৌরভ’ নামে এ দুটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বহু নিয়ম উপেক্ষা করে চলাচল করছে। জাহাজ দুটির বহির্বিশ্বে যাওয়ার অনুমোদন হারিয়েছে অনেক আগেই। অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সূত্র বলছে, বিএসসি নতুন জাহাজ কেনার সক্ষমতা হারিয়েছে বহু আগে। তবে কিছু দিন পর পর সংস্থাটির পক্ষ থেকে তাদের বহরে মাদার ট্যাঙ্কারসহ কনটেইনার জাহাজ যুক্ত হচ্ছে- এমন একটি বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি শেষ হওয়া বার্ষিক সাধারণ সভায়ও এ ধরনের বড় একটি পরিকল্পনা পেশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, নতুন নতুন পরিকল্পনা ও প্রকল্প নিয়ে বিএসসি আবার ঘুরে দাঁড়াবে। বলা হয়েছে, দেশে বেশ কয়েকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মাসে সাড়ে ৪ লাখ টন কয়লা প্রয়োজন হবে।

এ লক্ষ্যে কয়লা পরিবহনে ৮০ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন দুটি নতুন মাদার বাল্ক ক্যারিয়ার এবং ১০ থেকে ১৫ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন বাল্ক ক্যারিয়ার বিদেশি ঋণে কিনতে এরই মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। আরপিও’র মাধ্যমে শেয়ার বিক্রি ও সংস্থার নিজস্ব অর্থে প্রায় ৩৬ হাজার ডিডব্লিউটি সম্পন্ন নতুন একটি কেমিক্যাল, ক্রুড অয়েল ট্যাঙ্কার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর ক্রয়ের কাজ চলছে, যা আগামী দুই মাসের মধ্যে জাহাজটি বিএসসির বহরে যুক্ত হবে।

কমেন্টস