Advertisement

ছেলের জন্মদিনে দুই তরুণী ধর্ষণ হওয়া নিয়ে মুখ খুললেন আপন জুয়েলার্সের মালিক

প্রকাশঃ মে ৮, ২০১৭

Advertisement

বিডিমর্নিং ক্রাইম ডেস্ক- 

রাজধানীর বনানীতে ধর্ষিত  হওয়া দুই তরুণীকে গভীর রাতে তাদের বন্ধুদের সঙ্গে ‘রুম পার্টি’তে অংশ নিতে বাধ্য করেছিলো অভিযুক্তরা। গভীর রাতের ওই বিশেষ পার্টিতেই হয় তাদের সর্বনাশ। ঘটনাটি গত ২৮ মার্চের। কিন্তু মামলা হয়েছে তার এক মাস পর ৬ মে। ঘটনার শিকার তরুণীরা প্রাণভয়ে মামলা করেতে ভয় পেয়েছিলেন এতো দিন। কিন্তু যখন তারা ৪ মে মামলা করতে গেলেন, তখন পুলিশ মামলা না নিয়ে উল্টো নানা তালবাহানা করে ৪৮ ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিয়ে। অভিযোগ ২৫ লাখ টাকার টাকার টোপে নাকি পুলিশ মামলা নিতে ৪৮ ঘণ্টা দেরি করে। ধর্ষকরা যে কৌশলে ও ভয় দেখিয়ে তরুণীদের মামলা থেকে বিরত রেখেছিল, তা স্পষ্ট। দুই শিক্ষার্থীকে চাপে রাখাসহ ব্ল্যাক মেইল করতেই ধর্ষণের ঘটনা ধর্ষকরা ভিডিও করেছিল। এবার ঘটনার নতুন মোড়  দিলেন অভিযুক্ত অন্যতম আসামি সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ ও অভিযুক্তদের পরিবারের অন্য সদস্যরা।

বনানীতে দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্ত অন্যতম আসামি সাফাত আহমেদের বাবা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ। তিনি এই ঘটনাকে ব্লাকমেইল হিসেবে অভিযোগ করে বলেন, ‘ঘটনার পেছনে তার ছেলের সাবেক স্ত্রীর সম্পৃক্ততা রয়েছে। তার ষড়যন্ত্রেই সবকিছু হচ্ছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে আমরা মানহানীর মামলা করবো।’ প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন , ‘ধর্ষণ মামলা কি একমাস পর হয়?’  কেউ পাপ করলে তার শাস্তি হওয়া দরকার বলেও মন্তব্য করেন দিলদার আহমেদ।

রবিবার সন্ধ্যায় দিলদার আহমেদের কাছে তার ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ফোনে এসব কথা বলেন তিনি।

দিলদার আহমেদ বলেন, ‘দুই বছর আগে সাফাত প্রেম করে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ উপস্থাপিকাকে বিয়ে করে। মেয়েটির চরিত্র ভালো ছিল না। আমি বিয়েটি মেনে নেইনি। দুমাস আগে ওই মেয়ের সঙ্গে সাফাতের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। সেই মেয়েটি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য এই ষড়যন্ত্র করেছে। সে-ই দুটি মেয়েকে নিয়ে বনানী থানায় গেছে। নিজেকে ওই মেয়েদের খালাতো বোন বলে পরিচয় দিয়েছে।’

ঘটনার সময় সাফাতের সাবেক স্ত্রী হোটেলে ছিল কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সময় সে ছিল না। কিন্তু সে থানায় মেয়েদের নিয়ে মামলা করতে গেছে।’ তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘ধর্ষণ মামলা হয় ২৪ ঘণ্টায়। ধর্ষণ মামলা কি একমাস পর হয়?’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন লোক পাপ করলে তার শাস্তি হওয়া উচিৎ। কিন্তু পাপ না করলে শাস্তি হওয়া উচিৎ না। ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে, মেয়েদের ডাক্তারি পরীক্ষা হচ্ছে। সকল তদন্ত শেষ হলেই আসল জিনিস ভেসে ওঠবে। প্রমাণিত হলে অবশ্যই আইন  অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ হবে। আর তা নাহলে আমরা মানহানির মামলা করবো। একটা মেয়েকে কি ধর্ষণ করা যায়? ধর্ষণ হলেও মামলা হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে।’

ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পুলিশকে টাকা দিয়েছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি কেন থানায় টাকা দেবো? গণমাধ্যমে বিষয়টি ভরে গেছে। পুলিশ টাকা খাবে নাকি? আমি কোনও টাকা দেইনি।’

দিলদার আহমেদ বলেন, ‘আমি একজন বাবা হিসেবে এটুকু বলতে পারি, যেহেতু আমার সন্তান, আমি ছেলের পক্ষেই বলবো। তবে তদন্তে যা হবে আমি তা মেনে নেবো। কিন্তু আমি জানি, আমার ছেলে এর সঙ্গে জড়িত না। সে ব্লাকমেইলের শিকার হয়েছে। আমার সম্পত্তি লুটপাট করার জন্য আমার ছেলের সাবেক স্ত্রী এই ষড়যন্ত্র করছে। তারা আমার পরিবারটিকে ধ্বংস করার জন্য এসব করেছে।’

ছেলের সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে এই দুই তরুণীর কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে কিনা? এর জবাবে আপন জুয়েলার্সের মালিক বলেন, ‘তার সঙ্গে এই মেয়েদের কোনও আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। থানায় গিয়ে বলেছে সে ওই মেয়েদের খালাতো বোন।’

সাফাতের সাবেক স্ত্রী যে বনানী থানায় গিয়েছিল, তা আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন? এর উত্তরে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আরে থানা থেকে। আমিতো ছেলের বাবা। আমার ছেলে কিছু করলে, সেটা আমার কানে আসবে। মানুষ আমাকে ফোন দেবে।এটাইতো স্বাভাবিক।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাফাত আহমেদের সাবেক স্ত্রী ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা বলেন, এখানে ব্যক্তিগত শত্রুতা নয়। ধর্ষণের শিকার দুই তরুণী তার পূর্বপরিচিত হওয়ায় তিনি তাদের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলেন। ঘটনার রাতে দুই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী যে অস্ত্রের মুখে ধর্ষণের শিকার হন তার অকাট্য প্রমাণ রয়েছে।

গত ২৮ মার্চ বনানীর রেইনট্রি হোটেলে একটি পার্টিতে দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হন। এই ঘটনার একমাস পর বনানী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন এক তরুণী।

মামলার এজাহারে বলা হয়, সাদমান সফিক তাদের পূর্ব পরিচিত। প্রায় দুই বছর থেকে তার সঙ্গে পরিচয় রয়েছে। ঘটনার ১০-১৫ দিন আগে গুলশান-২ নম্বরের ৬২ নম্বর রোডের দুই নম্বর বাড়ির বাসিন্দা দিলদার আহমেদের ছেলে সাফাত আহমেদের সঙ্গে পরিচয় হয় তাদের। এরপর জন্মদিনের দাওয়াত দিয়ে গত ২৮ মার্চ সাফাত আহমেদ তার গাড়ি পাঠিয়ে ড্রাইভার ও বডিগার্ডের মাধ্যমে তরুণীদের নিজ নিজ বাসা থেকে বনানীর রেইনট্রি হোটেলের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয়।

এজাহারে আরও বলা হয়,অনুষ্ঠান সম্পর্কে তাদের বলা হয়েছিল হোটেলের ছাদে অনেক বড় অনুষ্ঠান হবে। সেখানে অনেক লোকজন থাকবে। কিন্তু তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ভিন্ন দৃশ্য দেখেন। তারা সেখানে রুম পার্টির আয়োজন দেখতে পান। তাছাড়া হোটেলে গিয়ে তারা আরও দুই তরুণীকে দেখতে পান।এসব দেখে অনুষ্ঠানের পরিস্থিতি ভালো মনে হয়নি তাদের। একপর্যায়ে সেখান থেকে তারা চলে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। এতে আসামিরা তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। আসামি সাফাত ও নাঈম তাদের ওপর অস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়। তাদের বেদম মারধর করা হয়। একপর্যায়ে দুই তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে আসামিরা। শুধু তাই নয়। ধর্ষণের সময় এক নম্বর আসামি সাফাতের গাড়ি চালক বিল্লালকে দিয়ে ঘটনার ভিডি চিত্র ধারণ করা হয়।

হোটেলে নির্যাতিত হওয়ার পর ঘটনা গোপন রাখার জন্য তাদের ওপর চাপ দেয়া হয়। বিশেষ করে সাফাত তার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী পাঠিয়ে তাদের নানা ধরনের ভয়ভীতির মধ্যে রাখে। এ কারণে তাদের মামলা করতে দেরি হয়।

মামলার এক নম্বর আসামি সাফাত আহমেদের পিতার নাম দিলদার আহমেদ সেলিম। তিনি দেশের শীর্ষ স্থানীয় স্বর্ণলঙ্কার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আপন জুয়েলার্সের মালিক।দুই নম্বর আসামি নাঈম আশরাফ একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে যুক্ত। তার বিস্তারিত পরিচয় ও পরিবারের সদস্যদের নাম পাওয়া যায়নি। তবে তিনি রাজধানীর মিরপুর এলাকায় থাকেন বলে জানা গেছে।মামলার তিন নম্বর আসামি সাদমান সাকিফের বাবার নাম মোহাম্মদ ওরফে জনি। তিনি রাজধানীর তেজগাঁও লিংক রোডে অবস্থিত রেহনাম রেগনাম সেন্টারের মালিক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নাঈম আশরাফের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরে ইন্টারেনেটে কথা বলার অ্যাপস ভাইবারে তার সঙ্গে কথা হয়। এ সময় নাঈম ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সামাজিক মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ার আশঙ্কায় তিনি মিডিয়ার সামনে আসছেন না। তাদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না। সেদিন রাতে যা কিছু হয়েছে তার সবকিছু সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে।

পরিবারের বক্তব্য

ধর্ষণের অভিযোগকারী দুই তরুণী রাজধানীর দুটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এদের একজন নিকেতন আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে কয়েকজন সহপাঠীর সঙ্গে মেসে থাকেন। নিকেতন এলাকাতেই আরেকজন ভাড়া থাকেন তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে।

ধর্ষণ মামলার বিষয়ে কথা বলার জন্য রবিবার এ দুই শিক্ষার্থীর বাসায় গেলে উভয় পরিবারের সদস্যরা জানান, বিষয়টি মিডিয়ায় আসুক- এটি তারা চান না। কারণ এতে করে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে।

এক তরুণীর মা জানান, তার মেয়ে ঘটনার দিন ধর্ষণের শিকার হয়েছিল কিনা সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে এমনিতে পড়াশোনা নিয়েই থাকে। তবে অস্বীকার করব না সে একটু বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করে।

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, মার্চের কোনো একদিন সে আমাকে এসে জানাল, তার এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টি আছে। সেখানে দাওয়াত খেতে যাবে। রাতে নাও ফিরতে পারে। পরদিন ভোরে মেয়ে ঠিকঠাক বাসায় এসেছে। ধর্ষণ বা তার সঙ্গে কেউ খারাপ আচরণ করেছে- এমন কোনো কথা সে বলেনি।

আরেক তরুণীর মা বনানী থানায় মামলা দায়েরের পর ঢাকায় এসেছেন।রবিবার দুপুরে তিনি বলেন, ধর্ষণ মামলার বিষয়ে আমার মেয়ে আমাকে কিছুই জানায়নি। সে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়ে ভার্সিটি থেকে ফিরলে আমি মামলার বিষয়ে প্রশ্ন করব।

প্রভাবশালীদের কোনো পক্ষের চাপের কারণে আপনারা ভীত কিনা জানতে চাইলে এক তরুণীর মা বলেন, আমরা সাধারণ ফ্যামিলি। মেয়েটার বিয়েশাদি দিতে হবে। তাই এখন এমন কিছু বলব না যাতে আমরা আরও বিপদে পড়ি।

অপর মেয়ের মা বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। যদি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকে তবে আমরা ন্যায্য বিচার চাই। তবে অযথা কাউকে যেন হয়রানি করা না হয়।

ধর্ষণ নয় সমঝোতা

এদিকে ধর্ষণের এ অভিযোগ মোটেও আমলে নিতে রাজি নন আসামিদের পরিবারের সদস্যরা। এক নম্বর আসামি জুয়েলারি ব্যবসায়ী দিলদার আহমেদ সেলিম  জানান, তার ছেলে নিরপরাধ। ছেলেকে ব্ল্যাকমেইল করতে ধর্ষণ মামলা করা হয়েছে।

২৮ মার্চ আসলে কী ঘটেছিল- এমন প্রশ্নের উত্তরে দিলদার আহমেদ বলেন, সেদিন সাফাতের জন্মদিন ছিল। রেইনট্রি হোটেলটি আমাদের পরিচিত। সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে তার জন্মদিন উদযাপনের কথা।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পার্টিতে তার বান্ধবীরা যোগ দিয়ে থাকতে পারে। সেখানে বান্ধবীদের সঙ্গে যদি কিছু হয় তবে তা নিশ্চয় সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে। ধর্ষণের প্রশ্নই ওঠে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান জোনের এডিসি আব্দুল আহাদ বলেন, ‘ধর্ষণ ঘটনায় জড়িতদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম বিভিন্ন স্থানে  অভিযান চালাচ্ছে। তবে এখনও কোনও আসামি ধরা পড়েনি।’ রেইনট্রি হোটেলের ওই দিনকার ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন,  ‘হোটেল কর্তৃপক্ষ সর্বশেষ একমাসের ফুটেজ সংরক্ষণ করে থাকে। তাই ধর্ষণের ঘটনার কোনও ফুটেজ পাওয়া যায়নি।’

Advertisement

Advertisement

কমেন্টস