ভিন্নমত প্রকাশই ত হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রাণ: মাহফুজ আনাম (ভিডিও)

প্রকাশঃ এপ্রিল ২৯, ২০১৭

মাহফুজ আনাম। ২০১৭ সালের ১৫ মার্চ ‘দি ডেইলি স্টার’ এর সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনামের মুখোমুখি হয় বিডিমর্নিং। বিভিন্ন বিষয়ে বিডিমর্নিংকে তিনি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন ডেইলি স্টারের নিজ কার্যালয়ে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেন বিডিমর্নিং এর হেড অফ নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফক্যামেরায় ছিলেন মাজেদুল হক তানভীর ও আশ সাকির গাজী। আজ শেষ পর্ব প্রকাশিত হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, আগে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেত। এখন দেখা যায় যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ না। আপনি জানেন যে, কয়েকদিন আগে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের নিয়ে বিরুপ মন্তব্য করেছেন। তা ছাড়া কিছুদিন আগে বাংলাদেশের একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে আঘাত আসতেছে।এখন প্রশ্ন হলো সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ চিন্তা-চেতনা থেকে দূরে কেন?

মাহফুজ আনাম: আপনার প্রশ্নটা ঠিক বুঝলাম না। সাংবাদিকরা  চিন্তায় ঐক্যবদ্ধ হবে কেন? সৃজনশীলপেশা চিন্তা ত সব সময় ভিন্ন ধরনের হয়। এই যে, আপনি বললেন-আগে আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সাংবাদিকরা একভাবে বলত। আমি প্রথমে আপনার কথাটি গ্রহণ করতে পারলাম না। আপনার কাছে যদি উদাহরণ পেতাম তা হলে বুঝতে পারতাম।কিন্তু আমার কাছে এটা অবাস্তব মনে হয়। ভিন্নমত প্রকাশই ত হচ্ছে সাংবাদিকতার প্রাণ। ধরেন একটা ফরেন পলিসিতে এক কাগজ বলবে সরকার এটা ঠিক করছে না। এটা করা উচিত। আরেক কাগজ বলবে না ঠিকই হয়েছে।তো এভাবেই ত ভিন্নমতপ্রকাশ। এক হয়ে যাওয়া ত, কোন ইস্যুতে আমি মনে করি যেকোনো ইস্যুতে সব সাংবাদিক যদি একভাবে চিন্তা করে তাহলে এটা একটা খুব ভয়াবহ ব্যাপার। তাহলে আপনার চিন্তার বৈচিত্র কোথায় রইল?

আমি আবার ফিরে যাই, যে ঔপন্যাবেশবিরোধী আন্দোলনে যখন সাংবাদিকতা অংশ ছিল তখন আমাদের একমত। যে আমরা ঔপন্যাবেশিক শাসন ভেঙে দিচ্ছি। পাকিস্তানে বিরুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা একমত। ওগুলো ত ছিল স্বাধীনতা। স্বাধীনতায় ত আমরা একমত হবোই।

তারপরও এখনো আমরা সাংবাদিকরা একমত হতে পারি। যেমন সামরিক শাসন, খোদা নাখাস্তা কোনদিন আবার বাংলাদেশে আসে। তখন আমরা সমস্ত সাংবাদিকরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হবো। আমি একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের কথা বলছি। গণতন্ত্র যখন দেশে বিরাজমান, সেই গণতন্ত্র যতই ত্রুটিপূর্ণ হোক, যতই অসম্পন্ন হোক, একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশে সাংবাদিকরা ভিন্নচিন্তা করবে এটাই আবশ্যক, এটাই আশা করি।কিন্তু যেখানে গণতন্ত্র নাই মানে সামরিক শাসন, ঔপন্যাবেশিক শাসন যেখানে ত সাংবাদিকরা। ওইখানে আমি আপনার সাথে একমত। যদি বলে ব্রিটিশের আমলে… স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় আমরা সবাই একমত প্রকাশ করবো তাহলে সেটি সাংবাদিকতা নয়। সেটি হবে প্রপাগান্ডা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, আমরা একটু ভিন্ন আঙ্গিকে যাচ্ছি। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ানোর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সাংবাদিকতা শুরু হলো এই উপমহাদেশ মানে বাংলাদেশে। এখন বর্তমানে ১৭টি ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা পড়ানো হচ্ছে। এখানে বেশিরভাগই থিওরিটিক্যাল। যেগুলো আমরা ফিল্ডে আসলে অনেকাংশে পাই না। আপনারা যারা মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার সাথে আছেন আপনারা কি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন কার্যক্রম দিয়ে তাদের গড়ে তোলার কোন চিন্তা-পরিকল্পনা আছে কিনা?

IMG_9360

মাহফুজ আনাম: না। এটলিস্ট আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তাদের গড়ে তোলা সম্ভব না। মাঝে মাঝে উনারা ডাকলে যাই। তবে আমি এটি খুব আশাব্যাঞ্জক ঘটনা মনে করি যে, এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা পড়ানো হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানিক মানে ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতায় পাস করে যখন তারা সাংবাদিকতা পেশায় আসেন তখন অবশ্যই তাদের একটি গুণগত মান থাকে। যেমন ধরুন একটি রিপোর্ট করতে হলে কীভাবে সোর্সিং করতে হবে। একটি তথ্য যোগাড় করতে হলে সেটিকে কীভাবে ভেরিফাইড করতে হবে? এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কিতাবি শিক্ষাতে আসে এবং এগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। তারপর সাবিং এর ব্যাপারে কীভাবেএকটি স্টোরি লেখবেন? কীভাবে ইন্ট্রো কি হবে? তারপর এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় কি হবে? এগুলো খুব ভালো। কিন্তু আল্টিমেটলি আপনি ভালো সাংবাদিক না খারাপ সাংবাদিক? আপনি শক্তিশালী অর্থে নিষ্ঠাবান সাংবাদিক না কাজের জন্যে সাংবাদকতায় আসছেন? এটি নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিত্বের উপর।আপনার ভেতর থেকে মানে মত প্রকাশের, তথ্য উদঘাটনের, সমাজসেবার, সত্য উদঘাটনের একটি স্প্রিড ভিতর থেকে আসতে হবে। যেটা ইউনিভার্সিটির শিক্ষায় পাওয়া যায় না। এইটা আপনার মানসিকতার ব্যাপার। এইটা আপনার ব্যক্তিত্বের ব্যাপার। ইউ হ্যাভ টু বি ইউ হ্যাভ টু লাভ ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশন। আপনার ভিতর থেকে মতপ্রকাশ প্রতি একটা, কি বলবো একটা প্রচণ্ড আগ্রহ থাকতে হবে। একটা কি বলবো একটা স্প্রিড থাকতে হবে। ওই স্প্রিড, আপনার মতপ্রকাশের স্প্রিড, আপনার সমাজসেবার স্প্রিড, আপনার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করার একটা স্প্রিড। ওই স্প্রিডের সঙ্গে  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশিক্ষণ যখন সংমিশ্রিত হয় তখন আমি মনে করি সাংবাদিকতার একটি পরিস্ফুটন ঘটতে পারে। শুধু সাংবাদিকতার ট্রেনিং দিলেন আর মানসিকতা নাই তাহলে হবে না। আবার মানসিকতা আছে আপনি কোন ট্রেনিং পাচ্ছেন না তাহলে স্পিহা হবে, আগ্রহ হবে বাট দক্ষতার অভাব হবে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, সাংবাদিকতায় অনেকস্থানে বেতন-ভাতা নিয়ে একটি প্রশ্ন আছে। যদিও এখন ৯ম ওয়েজবোর্ডের দাবি করা হচ্ছে। অনেকস্থানে এটি দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে নবীন সাংবাদিকরা যারা আশা নিয়ে আসছে তারা আগ্রহ হারাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এটি কীভাবে কাটিয়ে উঠা যায়?

মাহফুজ আনাম: মানে আপনি কেন, কীভাবে বুঝেন আগ্রহ হারাচ্ছে?

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, আপনার প্রতিষ্ঠান হয়তো বেশি দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ৭ম, ষষ্ঠটিও দিচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সে যে কাজ করার স্প্রিডটা সেটা কমে যাচ্ছে…

মাহফুজ আনাম: না। প্রথমে মনি করে যে, এই ধরেন ওয়েজবোর্ড ব্যাপারটা এখন আর এটার প্রয়োজন নাই। আপনি ওরাই সাংবাদিকতায় আসবে ভালো সাংবাদিক প্রতিষ্ঠান গড়বে যারা ওই সেন্সে সাংবাদিকতায় সাফল্য। এখন ঢাকাতে ধরেন প্রায় ১০০ খবরের কাগজ…

ফারুক আহমাদ আরিফ: বের হচ্ছে, ২৬টি টেলিভিশন।
মাহফুজ আনাম: বের হচ্ছে। ৩০টা খবরের কাগজ ত আমিই প্রত্যেকদিন দেখি। ঢাকার যে মার্কেট সেখানে ৩০টা কাগজ সমর্থন করার মত পাঠকসংখ্যা কি আছে? আপনি কলকাতার দিকে দেখেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ। সেখানে এক একটি পত্রিকার ৫ লক্ষ, ৬ লক্ষ, ৭ লক্ষ সার্কোলেশন। ওইখানে ত একশ দেড়শটা কাগজ নেই। আপনি শিল্পায়নের দিকে যাচ্ছেন। শিল্পের দিকে গেলে আপনাকে দেখতে হবে সেটার মার্কেট সাইজ কত? দক্ষ ব্যক্তিকে হায়ার করে সেখানে ভালো প্রোডাক্ট তৈরি করবেন। এখন সাংবাদিকতাটা অনেকটা রাজনীতির…

ফারুক আহমাদ আরিফ: হাতিয়ার?
মাহফুজ আনাম: রাজনৈতিকভাবে একটা তোষামোদি করার অস্ত্র। অনেকেই শিল্পপতি হচ্ছেন। তারা নিউজ পেপার বের করছেন। এটাকে আমি খারাপ দেখি না। তারপরেও কোয়ালিটি সাংবাদিকতার জন্যে এগুলো সহায়ক শক্তি নয়। আর আমি ত মনে করি এখন সাংবাদিকতায় বেশ ভালো বেতন আছে। অার বেতন ত হলো একটা দিক। আপনি যে সাংবাদিক হতে আসছেন আপনার দক্ষতার ত ব্যাপার অাছে। আপনার দক্ষতা কী? এখানে একটা বিরাট প্রশ্ন আছে। তবে আমি মনে করি এখানে যদি সত্যি সত্যি একটা মুক্তপরিবেশ দেওয়া যায়, ওয়েজবোর্ডের কোন বাধ্য-বাধকতা থাকবে না। এই ধরেন আবার ওয়েজবোর্ড দাবি হচ্ছে। এটি কোন ভিত্তিতে করা হচ্ছে? আমি যেখানে জানি বাংলাদেশে শত শত কাগজের মধ্যে ১০/১২টা কাগজ ছাড়া কেউ ওয়েজবোর্ড দেয় না। এটা সরকার জানে, সাংবাদিকরা ভালো করেই জানে। আবার যখন ওয়েজবোর্ড হবে তখন ওই ১০/১২টা কাগজই ওয়েজবোর্ড দিবে। যে জিনিসটা সার্বজনীন নয়, সেই জিনিসটার জন্যে আইনপ্রণয়ন কেন? আইন ত হয় সবার জন্যে। আপনি একটি আইন করছেন অথচ তা প্রয়োগ করছেন না। তাহলে একটা বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কাগজ যাকে বলে কোম্প্লাইন, আমরা যারা আইন মেনে চলি তখন আমাদের উপর বোঝাটা বাড়ছে। যারা দিচ্ছে না, তারা দিচ্ছেই না। তারা ৫ম টা দেয়নি, ৬ষ্ঠটি দেয়নি, ৭টাও দেয়নি এখন ৯ম টাও দিবে না। তাদের জন্যে ত প্রয়োজন হচ্ছে না। ত ওইদিকে সরকার কি করছে? আমি মনে করি এইটা একটা বৈষম্যমূলক একটা ব্যবস্থা। সত্যিকার অর্থে আমরা যারা আপ্রাণ চেষ্টা করি, ভালো ভালো কাগজ বের করি তাদের জন্যে এটা একটা ডিস-ইনসেড।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, ২০১৫ সালে সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপরে সরকার প্রথমে ১০ ও পরে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছিল। তার প্রতিবাদে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন’ দেশব্যাপী মুভমেন্ট (আন্দোলন)পরিচালনা করে। এ ক্ষেত্রে ডেইলি স্টার সংবাদ, কলাম প্রকাশ করে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে নো ভ্যাট অন এডুকেশনের প্রথম কর্মসূচি ৫ জুলাইয়ের কর্মসূচির ছবি ফিচার করেছিল। স্যার এটি বাংলাদেশি একটি আন্দোলন কিন্তু বিশ্বের ৫৪টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় এই নিয়ে ১১৭টি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আপনার একটি পত্রিকা আছে এশিয়ান নিউজ সেখানেও সংবাদ, কলাম প্রকাশিত হয়েছে। রয়টার্স, বিবিসসহ বিভিন্ন জায়গায়। এখন আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে বর্তমানে ছাত্ররা রাজনীতি করতেছে বিভিন্ন দলভিত্তিক। কিন্তু ছাত্রদের অধিকার আদায়ের যে রাজনীতি, ডাকসু, রাকসু, চাকসুসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হচ্ছে না। এটি কেন? ছাত্ররা কেন নিজেদের অধিকার আদায়ের চেয়ে রাজনীতি লেজুড়ভিত্তির দিকে চলে যাচ্ছে?
মাহফুজ আনাম: হে হে হে, এটি ত আপনি ভালো জানেন। এটা ত আমরা খুব গর্ববোধ করি ছাত্ররাই বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহ্য। তো সেই ঐতিহ্য সবাই বলছেন যে নাই। সেটা ত অবশ্যই অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, আমাদের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ছাত্ররা যে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে এখন তা আর হচ্ছে না। তবে আমি একটুখানি ফিল করি যে ছাত্ররা ত রাজনীতি তারা করবেই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ে। তবে কলেজ বা স্কুল পর্যায়ে হোক এটা আমি মনে করি না। কিন্তু শিক্ষার প্রতি যে অনুরাগ সেটার কদ্দূর হচ্ছে?কোয়ালিটি অফ এডুকেশনের কি ব্যাপার?আপনি প্রশ্ন করলেন ছাত্র সংসদ কেন হচ্ছে না? আপনার ইক্যুয়ালি প্রশ্ন করা উচিত আমাদের যে ধরনের ব্যাচেলর ডিগ্রি নিয়ে ছাত্ররা বেরিয়ে আসছে। মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বেরিয়ে আসছে তাদের কোয়ালিটিটি কী? এটা কি শুধু একটি সার্টিফিকেট? বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু একটি সার্টিফিকেট প্রদান করা বা কিছু কিছু ক্ষেত্রে সার্টিফিকেট বিক্রি করার প্রতিষ্ঠান হচ্ছে? না তারা সত্যি সত্যি জ্ঞান দিচ্ছে ছেলে-মেয়েদের?এটা ত দেশগড়ার সাথে ওতপ্রতোভাবে জড়িত। হিউম্যান রিসোর্স হচ্ছে বিশ্বে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনার ঘরে, আপনার দেশে কয়টা সোনার খনি আছে, কয়টা কয়লারখনি আছে, কয়টা তেলের খনি আছে? কয়টা গ্যাসের খনি আছে এগুলো সব প্রয়োজন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন যা দেখা গেছে, তা হচ্ছে মানবসম্পদ। মানবসম্পদ তৈরি হয় কোত্থেকে? মানবসম্পদ তৈরি হয় স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তো সেখানে আমরা কোথায় আছি? তো আমার কাছে মনে হয় এই প্রশ্নটা আরো বেশি করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা উচিত, সাংবাদিকতা থেকে আরো বেশি করা উচিত। কোয়ালিটি অফ আওয়ার হিউম্যান রিসোর্স। এটা হবে একবিংশ শতাব্দির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্স। আজকে ধরেন যারা বিশ্বে খুব সুপ্রতিষ্ঠিত নামগুলো স্টিব জবস একটি নাম, বিল গেটস একটি নাম। এই ধরেন গুগল একটি প্রতিষ্ঠান, অ্যামাজান একটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো ত মেধাভিত্তিক, খনিজসম্পদ ভিত্তিক নয়। সে মেধাবিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলাদেশ কীভাবে…

IMG_9348

ফারুক আহমাদ আরিফ: অবদান রাখবে?
মাহফুজ আনাম: অবদান রাখবে এবং তার নিজের অবস্থান দৃঢ় করবে। একেবারেই মানবসম্পদ নেই। এই যে দেখুন, গার্মেন্টস ইনডাস্ট্রি, আজকে আমাদের গার্মেন্টস ইনডাস্ট্রির বয়স প্রায় ৪০ বছর। এখন পর্যন্ত আমাদের মিড লেভেল এবং আপার মিড লেভেলের মেনেজমেন্টের জন্যে শ্রীলঙ্কানদের আনছি, ভারতীয়দের আনছি। বাংলাদেশের মিড লেভেল, হাই লেভেল মেনেজমেন্টে লোকের অভাব। মালিক আমরা, কিন্তু মেনেজমেন্ট পর্যায়ে মিড লেভেল, হাই লেভেলের এখনো বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। কেন আমাদের দেশের গার্মেন্টস মেনেজমেন্টের জন্যে বাহির থেকে লোক আনতে হবে? কেন আমার দেশে গার্মেন্টসে মেনেজমেন্ট ফ্যাকাল্টি খোলা হচ্ছে না এই প্রশ্ন রইল প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলোর প্রতি। গার্মেন্টস ইনডাস্ট্রি মেনেজমেন্ট এই একটা ডিপার্টমেন্ট কেন হচ্ছে না? এটার ত একটা প্রয়োজনীয়তা আছে। এখন ত আমরা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস রফতানিকারক দেশ। সেখানে আমার যে দক্ষ মানবসম্পদ দরকার শুধুমাত্র গার্মেন্টস সেক্টরে, সেটার প্রোডাকশন কোথা থেকে হচ্ছে? আমার ত একটা মেনেজমেন্ট ট্রেনিং আছে বুঝলাম। প্রত্যেকটা ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ হচ্ছে, কম্পিউটার সাইন্স হচ্ছে। মেনেজমেন্ট জেনারেলি প্রয়োজন। গার্মেন্টস মেনেজমেন্ট ইনডাস্ট্রি এমন একটি ফোকাস মেনেজমেন্ট কেন দিচ্ছি না? এখনো আমি মিড ও আপার মিড লেভেল মেনেজমেন্টে আমি দক্ষতা অর্জন করছি না। এটা একটা প্রশ্ন আমার মনে হয় সবাকে করা দরকার।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বৃহত্তর ময়মনসিংহে আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আবুল মনসুর আহমদদের মত আস্থাশীল নেতৃত্ব এখনো গড়ে উঠেনি তাদের পরে। এমনকি বাংলাদেশেও। আপনি পিতা আবুল মনসুর আহমদকে কেমন দেখছেন?
মাহফুজ আনাম: হে হে, আমি অত্যন্ত লজ্জিত, এমন একটি বিরাট ব্যক্তিত্বের ছেলে হয়ে আমার আমি কিছুই মানে হলাম না। এবং আব্বার যে ঐতিহ্য, মানে উনার এক অদক্ষ, অদক্ষ না, কি জানি বলে অযোগ্য ছেলে হলাম এটি প্রথমে মনে বিরাট এক দুঃখ। আরেকটা দুঃখ হলো উনার যে রচনাবলী, উনার যে লেখনি, উনার যে চিন্তা এটি বাংলাদেশে এখন আর সেভাবে পাওয়া যায় না। এটার মূল্যায়ন করা উচিত। সমাজে মূল্যায়ন করা উচিত ছিল সেটি করা হয়নি। বাট ঠিক আছে, এটা আমার একটা দুর্ভাগ্য। আমি মনে করি এটি দেশের জন্যে একটি দুর্ভাগ্য। তবে উনি একজন বিশাল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমি অত্যন্ত নিজেকে গর্বিত মনে করি, অনেক সৌভাগ্যবান মনে করি যে, উনার ঘরেই আমার জন্ম হয়েছে। আমার মাও একজন লেখিকা ছিলেন। তার দুটি বই রয়েছে। আধুনিকা স্ত্রী ও আধুনিক স্বামী। এবং ওগুলো যদি পাঠ করা হয় তাহলে আপনি দেখবেন যে, উনি নারী হিসাবে এখনকার নারীবাদীরা যেসব দাবি ও নারীদের সমতার যেসব ইস্যুগুলো আলোচিত হচ্ছে তা তিনি ৪০ দশকে, ৫০ এর দশকে লেখে গেছেন। তো আমার পিতা একজন ভিতর থেকে গণতান্ত্রিক, গণতন্ত্রমনা ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সারাজীবন তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার এবং দেশকে গণতন্ত্র দ্বারা পরিচালনা এজন্যই তিনি সারাজীবন রাজনীতিতে মূল মন্ত্র। আরেকটা ছিল যে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্পর্কে মানে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কি এ ব্যাপারে উনার কিন্তু একেবারে ভিন্ন ধরনের একটি চিন্তা ছিল। যেই চিন্তার সাথে অনেকেই একমত নাও হতে পারেন। কিন্তু উনার চিন্তাটা কি এটা আমার মনে হয় জাতির সামনে আসা উচিত। উনি কি ভেবেছেন? এবং ওই ব্যাপারে ভাষার রুপ কি? এগুলো আমি মনে করি উনার অমূল্য অবদান। যেটা জাতির সামনে আরো বলিষ্টভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। আরো বেশি সবার কাছে আসার ব্যাপারে, সমাজ হিসেবে, দেশ হিসেবে আমাদের উদ্যোগটা আরো বেশি প্রয়োজন।
ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, আপনার মূল্যবান সময় থেকে বিডিমর্নিংকে সময় দেওয়ার জন্যে অনেক অনেক ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞতা।
মাহফুজ আনাম: হ্যা, হ্যা, আপনি এসছেন আমার পিতা সম্পর্কে জানতে। তার জন্যে আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

Advertisement

কমেন্টস