‘প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব মিলাতে গেলে বলবো ভাষা আন্দোলনের অপ্রাপ্তিটাই বেশি’ (অডিও)

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০১৭

ছবি-মাজেদুল হক তানভীর

ভাষাসৈনিক আহমদ রফিক। একটি জীবন্ত ইতিহাস। ভাষা সংগ্রামে জড়িত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। মেডিকেলে পড়াশোনা বন্ধ করে জীবন ও আন্দোনের প্রয়োজনে তিনি চলে যান আন্ডারগ্রাউন্ডে। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার ফলে ডাক্তারি পড়েও সে পেশায় যেতে পারেননি সরকারের অত্যাচারে। বিডিমর্নিং এর সাথে দেয়া তাঁর একান্ত সাক্ষাৎকারটির শেষ পর্ব আজ প্রকাশিত হলো। সাক্ষাৎকারটি নেন বিডিমর্নিং এর হেড অফ নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ ও ক্যামেরায় ছিলেন মাজেদুল হক তানভীর

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, আপনি পড়লেন ডাক্তারি, হয়ে গেলেন সাহিত্যিক?
আহমদ রফিক: ডাক্তারি করা হলো না। মেডিকেল লাইন ছেড়ে দিলাম। তখনকার দিনে এক নাম্বার ফার্মাসিটিকেল কোম্পানি এলভার্ট ড্যাভিট। সেখানে টেকনিকেল ইনফরমেশন চিফ হিসেবে চাকরি নিলাম। ড্রাগ সেক্টরে বাকি জীবনটা আমার সেখানেই কাটল। ৬০ এর দশকে আমি দুটি আলাদা কাজ করেছিলাম। সেটিও মনের তাগিদে। তখন বাঙালিয়ান একটি জোয়ার বইছিল। অথচ তখন পূর্ব বাংলায় শিল্পখাতে বাঙালিদের কোন অবস্থান ছিল না। সকল বড় শিল্প-কারখানা, ব্যবসা সব অবাঙালিদের হাতে ছিল।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বিহারী বা…
আহমদ রফিক: বিহারী বলে নয়, সব অবাঙালি। ১৯৬৪ সালে ওরিয়ন ল্যাবরেটরিজ নামে একটি প্রাইভেট লিমিটেড ওষুধ কোম্পানি করি। ওরিয়ন নামের কারণ হলো সপ্তর্ষী তো ৭ জন। সাত বন্ধুর টাকা দিয়ে কোম্পানিটি করি। আমার তো টাকা-পয়সা ছিল না। কারণ আমার ছাত্রজীবন থেকেই একটি পত্রিকা বের করার ইচ্ছা ছিল। ৬৪ সালেই নাগরিক নামে ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা বের করি। এই পত্রিকায় লেখেননি এমন কোন প্রতিষ্ঠিত লেখক পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। শওকত ওসমান, আহসান হাবিব, শামসুর রাহমান, সাঈদ আতিকুল্লাহসহ প্রতি সংখ্যায় তাদের লেখা থাকতো। এটি ১৯৭০ তথা ৭১ এর ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত খুব ভালোভাবে চালিয়েছি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বাংলা একাডেমির ভবনটি (বর্ধমান হাউজ) তখনকার সময়ের প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবন ছিল। আপনাদের এতটা দুঃসাহস কীভাবে হলো যে, প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবনটিকে বাংলা ভাষার গবেষণাগার হিসেবে চাইলেন? এখন যেমন আমরা কেউ বলতে পারি না যে প্রধানমন্ত্রীর বাস ভবনটি এই কাজের জন্যে ছেড়ে দিতে হবে?

আহমদ রফিক: মুখ্যমন্ত্রী? তখন প্রধানমন্ত্রীই বলা হতো। এটাতো শুধু আমাদের নয়। ২১ দফার অঙ্গ ছিল। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের ২১ দফায় এটি ছিল। যুক্তফ্রন্টের আন্দোলনটি একটি অসাধারণ আন্দোলন ছিল। এটির সুুব্যবহার করা হলো বা হলো না সেটি ভিন্ন কথা। সেখানে কৃষক, তাঁতি, কুমার, শ্রমিক, ছাত্র। ১৯ নং দফায় প্রাদেশিক স্বায়িত্ব শাসন ছিল। যা পরবর্তীতে শেখ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) সাহেব ১৯৬৬ সালের ৬ দফায় নিলেন। এগুলো সব মওলানা ভাসানীর কন্ট্রিভিউশন। তাঁর হাতে করা। মওলানা ভাসনীই প্রথম বলেছিলেন এই বাড়ি বাংলা ভাষার গবেষণাগার হবে। তিনি বাংলা একাডেমি বলেননি। ২১ দফায় এটি লেখা ছিল বর্ধমান হাউজ বাংলা ভাষার গবেষণাগার হবে। ১৯৫৫ সালে আবুল হোসেন সরকার মন্ত্রিসভা গঠন করার পর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আহমদ রফিক

ফারুক আহমাদ আরিফ: বাংলা একাডেমি শুধু কিছু বই প্রকাশ করছে, বইমেলা করছে। বাংলা একাডেমি বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধনে আর কি কি কাজ করতে পারতো বা পারে?
আহমদ রফিক: আমি তুলনা দিয়ে বলেবো পশ্চিমবঙ্গে বাংলা আকাডেমি বলে। এটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। ওদের (বাংলা একাডেমি) কাজ শুধু বই প্রকাশ নয়, এর জন্মদিন ওর মৃত্যুদিন ইত্যাদি পালন নয়। এটি প্রথমেই বলা হয়েছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণাগার। এই কাজটি তারা যতটা না করছে তার চেয়ে বেশি করছে আনুষ্ঠানিকতা তার জন্মদিন ওর মৃত্যুদিন। আমি যদি ফেব্রুয়ারির কথা বাদই দেই একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসের কথা ভিন্ন। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস ভাষা দিবস নিয়ে কিছু করলো ঠিক আছে। তারা অমুকের জন্মদিন তমুকের মৃত্যুদিন পালন করছে। এগুলো বাংলা একাডেমির কাজ না। তাদের কাজ বাংলা ভাষার গবেষণা করা। কিছু ভালো কাজ তারা করেছে যেমন কিছু অভিধান তারা বের করেছে। তেমনি গবেষণামূলক কাজ করা প্রয়োজন। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, বাংলা একাডেমির সদস্য সংখ্যাও নির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এখানে আলু ব্যবসায়ী, পটল ব্যবসায়ী, বীমা ব্যবসায়ী সবাই আছে কে নাই। এটি হতে পারে না। খুব লিমিটেড হতে হবে সদস্য সংখ্যা।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি বলতে চাচ্ছেন যারা ভাষা নিয়ে, শিক্ষা সংস্কৃতি নিয়ে, সাহিত্য নিয়ে কাজ করে তারাই শুধু সদস্য হবে?
আহমদ রফিক: হ্যাঁ। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্যিক, সাংবাদিকতায় জড়িত ব্যক্তিরা সদস্য থাকবে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনারা আন্দোলন করেছিলেন বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্যে। আপনি কি মনে করেন বাংলা ‘রাষ্ট্রভাষা’ হয়েছে?
আহমদ রফিক: এই আন্দোলন করার ফলে ১৯৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬ এই ৪ বছর আমরা শহীদ দিবস পালন করেছি। প্রভাতফেরী, মিছিল, স্লোগান, বিকালে জনসভা ইত্যাদি। প্রচুর লোক সমাগম হতো। ১৯৫৬ সালে যখন পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান রচিত হলো তখন গণপরিপষদ উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা নিল নামকাওয়াস্তে। সেখানে বলা হলো- শর্ত থাকে যে, আগামী ২০ বছর ইংরেজি ব্যবহার করা হবে তারপর যা হবে হবে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ৬০ দশকের আন্দোলন, ৬৯ গণঅভুত্থান, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশ হলো। দু দুটি সংবিধান হলো। খুব ভালো কথা, তাতে চতুর ৪টি স্তম্ভও দেওয়া হলো, সেখানেও বলা হলো প্রজাতন্ত্রের রাষ্টভাষা বাংলা। অর্থাৎ রাষ্টভাষা হলো। কিন্তু স্বাধীন দেশে এটাই হলো ট্রাজেডি পাকিস্তানীরা যা খুশি করার করুক, করতেই পারে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে যেখানে সংবিধানে বলা হলো প্রজাতন্ত্রের ভাষা হবে বাংলা। তার অর্থ হচ্ছে অফিস, শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞানশিক্ষা, উচ্চ আদালত সব কিছুতেই বাংলা হওয়ার কথা। মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার কথা। আপনি ইউরোপের জাতি দেশগুলোর দিকে যদি তাকান তা হলে দেখবেন ফ্রান্স, জার্মান, ইংল্যান্ডের প্রত্যেক জায়গায় তাদের মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষারও মাধ্যম। সেখানে আমরা এসে ভুলে গেলাম। সংবিধানে বললাম কিন্তু বেমালুম ভুলে গেলাম। আমাদের উচ্চশিক্ষা, উচ্চ আদালতে ঔপনিবেশিক রাজভাষা ইংরেজি। আমাদের ৩টি স্লোগান প্রধানত যা প্রতিটি মিছিলে দিয়েছি- ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই, সর্বস্তরে বাংলা চালু কর।’ এই সর্বস্তরে বাংলাটা চালু হলো না। আজকে একজন ভাষাসংগ্রামী হিসেবে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসেব মিলাতে গেলে বলবো ভাষা আন্দোলনের অপ্রাপ্তিটাই বেশি। কারণ জাতীয় জীবনে জীবিকার সাথে যদি মাতৃভাষার কোন যোগ না থাকে রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিক আমলে। তাহলে হয়কি যে সমাজ তৈরি হয় ভূমি, ভাষা ও রাজনীতি কেন্দ্রিক হলো না। বাংলা ভাষার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা নাই। আমরা অবিরাম ভুল বানানে লেখি। আমাদের সাইনবোর্ডে এখানে সেখানে সব জায়গায় বানান ভুল। এক কথায় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি চরম অমর্যাদা। সেটাতো হলো না আজ থেকে ১০ বছর আগের কথা, আমি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলতাম আপনার নিজেদের সন্তানদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়াচ্ছেন, বাংলা ভালো করে বুঝে না-পারে না? তারা বললো আমাদের সন্তানের ক্যারিয়ারের দিকে চিন্তা করতে হবে। আমি তাদের সাথে একমত হলাম। কারণ দোষটা তাদের না। দোষটা আমাদের রাজনীতিবিদদের। ভাষা হলো জীবিকা অর্জনের মাধ্যম। তার সাথে যদি মাতৃভাষার সংযোগ না থাকে তাহলে তো সমস্যা। কারণ বৈষয়িক দিকটা বড় দিক অর্থনৈতিক দিকটি তো আছে। একজন ছাত্রের শিক্ষার বাহন ও রাজভাষা না হয়ে ঔপনিবেশিক ভাষা থাকলে আপনি সেটি কেন শিখবেন? আমরা কি মাতৃভাষা ধুয়ে পানি খাবো? এমন কথাও আমাকে শুনতে হয়েছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনাদের বকেটি দাবি ছিল পাঠ্যপুস্তক বাংলা ভাষা মাতৃভাষাতে হোক?
আহমদ রফিক: বাংলা ভাষাতেই আছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: উচ্চ পর্যায়ে।
আহমদ রফিক: হ্যাঁ, উচ্চ পর্যায়ে সেটা হচ্ছে না। বলে অনুবাদ করার লোক নেই। একেবারে বাজে কথা। কয়েকদিন আগেই একটি ইংরেজি মাধ্যমে একজন বাচ্চাটাকে বাংলা বলার কারণে শাস্তি দেওয়া হলো। আপনারা কিন্ডার গার্ডেন থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত খোঁজ নিয়ে দেখেন বাংলার কি দূরাবস্থা ঠিক কিনা?

আহমদ রফিক

ফারুক আহমাদ আরিফ: আমরা সাংবাদিকতায় পড়াশোনা করি। সেখানে সব বই ইংরেজিতে।
আহমদ রফিক: সেটাই বলছি। শিশুদের জন্যে বেশি জরুরি। এসবস্থানে সরকারের কোন হাত নেই।

মাজেদুল হক তানভীর: বাংলা বুঝে না। ময়লা বুঝে না, তারা বুঝে ডাস্ট।
আহমদ রফিক: হ্যাঁ ডাস্ট। ওই যে বললাম বাংলায় কথা বলায় শাস্তি। সবচেয়ে বড় কথা হলো এখানে সিলেবাস তৈরি, পাঠ্যক্রম বলুন কোথাও সরকারের হাত নেই। আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে ডেপুটি স্পিকারকে প্রশ্ন করলাম এই যে এভাবে চলছে এটি সংবিধান লঙ্ঘন না? তিনি কোন জবাব দেননি। কারণ জবাব দেওয়ার নেইতো কিছুই। আমি সরকারের বহু লোককে বলেছি সংবিধানে লেখা আছে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা কিন্তু উচ্চ আদালত, অফিস সব জায়গায় ইংরেজি এটি সংবিধান লঙ্ঘন না? প্রেসক্লাবে একটি অনুষ্ঠান হয়েছিল আইনজীবীদের সেখানেও বলেছি। ড. কামাল হোসেনকে দেশ টিভির টকশোতে বললাম উচ্চ আদালতে সওয়াল-জওয়াব, রায় সব কিছু বাংলাতে করা যায় না? তিনি বললেন সম্ভব। বলেই খালাস কিন্তু তারা কিছুই করেননি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বাংলাদেশের এই অঞ্চলে ৫২ টাই মূল বীজ। তা থেকেই আমরা স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে গেলাম।
আহমদ রফিক: হ্যাঁ আমাদের রাজনীতিবিদরা তো স্বীকার করেন ভাষা আন্দোলনটাই আমাদের বীজ। কিন্তু তারা বলেন এক আর করেন আরেক।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার আপনি কি মনে করেন আপনারা জড়িত না থাকার কারণে আপনারা যা চেয়েছিলেন তা হয়নি?
আহমদ রফিক: আমরাতো লেগে আছি। আমি এই বয়সে গিয়ে রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করবো? আমার কাজ লেখা। আমি তো লেখে যাচ্ছি। শুধু ফেব্রুয়ারি নয় সারা বছরই লেখছি। কোথাও বক্তব্য দিতে গিয়ে বলি। তোমরা তরুণরাই একমাত্র ভরসা। তোমরা এগিয়ে এসো। এই যে, এখন আপনাকে বলছি। আমি যখন ভাষা আন্দোলন করেছি তখন বয়স ছিল ২৩ বছর। এই তারুণ্যই সেদিন রাজনীতিবিদরা চেয়েছিল ১৪৪ ধারা না ভাঙার। ভাষা আন্দোলনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ১৪৪ ধারা ভাঙা। আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পুলিশের গুলি। এই গুলির জন্যেই সেদিন সারা প্রদেশে আগুন ছড়িয়ে পড়ার মতো সংগ্রাম শুরু হলো।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, তখন রাজনৈতিকদলগুলো ১৪৪ ধারা ভাঙতে চাইল না। সেখানে আপনার কোন দুঃসাহসে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলেন?
আহমদ রফিক: আমরা শুধু না, সাধারণ ছাত্রদের পর্যন্ত কেউ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত ১৪৪ ধারা ভাঙা যাবে না তা কেউ মানে নাই। ২০ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত ছিল ১৪৪ ধারা ভাঙা যাবে না। তাই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, আগামীকাল আমতলায় মিটিংয়ে যে সিদ্ধান্ত আসবে তা সবাই মেনে নিবে। সেখানে ২১ ফেব্রুয়ারি সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভঙের এবং সবাই রাস্তায় বেড়িয়ে এলো তার পরিণাম হলো ৩টার সময় গুলি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হয় আন্দোলনের সূতিকাগার। এখান থেকেই আন্দোলন শুরু হয়। আপনি বললেন মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা ডাক্তারি বই পড়াশোনার পরিবর্তে সাহিত্যটা বেশি পড়তেন, রাজনীতি করতেন-নাটক, তথা সংস্কৃতিতে জড়িয়ে ছিলেন। এতে দেখা যায় নেতৃত্বটা ঢাবি থেকে ঢাকা মেডিকেলে চলে এলো?
আহমদ রফিক: ইতিহাস পড়লে দেখবেন ২১ ফেব্রুয়ারিতে গুলি চালানোর পর থেকে আন্দোলনটি পরিচালিত হতে থাকে ঢাকা মেডিকেলকে কেন্দ্র করে। এখানকার হোস্টেল থেকেই আন্দোলন পরিচালিত হতে থাকে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনাদের পড়াশোনা, আপনাদের কার্যক্রমে নেতৃত্বটা এদিকে চলে এলো?
আহমদ রফিক: কাজেই এখন তো আর কিছু বলার নেই। এখন কথা হলো আপনি কিছু বলবেন?

আহমদ রফিক

মাজেদুল হক তানভীর: না, আমার একটি বিষয় জানার ছিল। এইযে এখন তরুণরা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সর্বসাধারণ সবাই বলছেন ধর্মের অপব্যবহার করে তাদেরকে মিস গাইড করা হচ্ছে। ঠিক আছে ধর্মের অপব্যহার করে কিন্তু কথা হচ্ছে ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়াও কি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে না?
আহমদ রফিক: আমি আপনার কথার সাথে পুরোপুরি একমত। আমি প্রথম কথা বলবো রাজনৈতিকভাবে সুশাসনের অভাব, গণতান্ত্রিক সুসাশনের অভাব। সেই সঙ্গে ভাষা, সাহিত্য অর্থাৎ মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, মাতৃসাহিত্যের সাথে শৈশব-কৈশর থেকে যে যোগাযোগ আত্মীকরণ সেই জিনিসটার অত্যন্ত অভাব। সেই অভাবের কারণেই তরুণদের মধ্যে বিভ্রান্তি-বিচ্যুতি এটা ঘটছে। তারপরও যদি আমার সামনে কোন রোল মডেল না থাকে, রোল মডেল। তাহলে আমি আমার খুশি মত চলবো। আমাদের এখানে সে রকম কোন আদর্শ রাজনৈতিক রোল মডেল নেই, সমাজ সংস্কৃতি ক্ষেত্রেও নাই যা তরুণদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। জানি না আপনারা আমার কথার সাথে একমত হবেন কিনা?

ফারুক আহমাদ আরিফ-মাজেদুল হক তানভীর: হ্যাঁ, একমত।
আহমদ রফিক: সেটাও একটা বড় কারণ এই সর্বনাশা ঝোক, জঙ্গিবাদের দিকে চলে যাওয়া। এটা কিন্তু আপনাকে আমি স্পষ্ট করে বলি কনফিডেন্টলি বলি এগুলো হচ্ছে হতাশা থেকে। যে আমি যা চেয়েছিলাম দেশটাকে যা চেয়েছিলাম তা হয়নি। তাই আমি যা খুশি তা করতে পারি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, ১৯৯০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির পর থেকে কোন ছাত্রসংসদ নেই। এখন নেতা হচ্ছে বিভিন্ন পারপাসে? ছাত্র সংসদ না থাকার কারণে…
আহমদ রফিক: অবশ্যই ছাত্রসংসদ নেই। ছাত্র আন্দোলনকে নষ্ট করছে মূল রাজনৈতিক দলগুলো তাদের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে ব্যবহার করে। আমাদের সময় ছাত্র আন্দোলন কোন দলের লেজুড় ছিল না। থাকলে ভাষা এই আন্দোলন হতো না।

ফারুক আহমাদ আরিফ: ৫৪ বিজয় হতো না, যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে?
আহমদ রফিক: না। তখন ছাত্র রাজনীতি স্বাধীন ছিল। ১৯৫২ সালে যে ছাত্র ইউনিয়ন হলো তারাও তো স্বাধীনভাবে কাজ করেছে। তারা কমিউনিস্ট পার্টির সাথে লেজুড় হয়ে কাজ করেনি এখন যেমন করছে। এদিক থেকে কথা হলো রাজনীতি নিজে নষ্ট হয়েছে। ছাত্র রাজনীতি নষ্ট করেছে। এখন তরুণদের ওপর ভরসা করা যাচ্ছে না কারণ তরুণদের বিরাট অংশ মাদকাসক্তি খুন, গুম, চাঁদাবাজি, টেন্ডারের সাথে জড়িত।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আমরা দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রসংসদ চালুর দাবি জানিয়ে আসছি। গত ৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাহেব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন আমাদের কথা হচ্ছে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৩৮টি, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ৯৬টি, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ১৭টি, সরকাররি-বেসরকারি মেডিকেল আছে ১০০, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনার্স পর্যায়ে কলেজ আছে ২২৪৪টিসহ সর্বমোট ২৪৮৪টি প্রতিষ্ঠানে এইচএসসির পরে পড়াশোনা করানো হয়। এই পর্যায়ে যদি ছাত্র সংসদ চালু করা যায় তবে দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আপনার মনে হয়?
আহমদ রফিক: কোনটা চালু করা হলে?

ফারুক আহমাদ আরিফ: ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র সংসদ।
আহমদ রফিক: ছাত্র রাজনীতি, ছাত্র সংসদ। সংসদীয় ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার তো কোন আছে বলে আমি মনে করি না। ছাত্র রাজনীতি নষ্ট হয়েছে লেজুড় বৃত্তির কারণে। এটির দায় সরকার বা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। তেমন না?

ফারুক আহমাদ আরিফ: জী, স্যার।
আহমদ রফিক: বরং দল প্রভাবিত ছাত্র রাজনীতি না হয়ে মুক্তমনা ছাত্র রাজনীতি থাকা উচিত। এটির হয়তো কিছু খারাপ দিক কিছু থাকবে তেমনি ভালো দিকও কিছু তৈরি হবে। সেই ভালো দিকটাই ভবিষৎ সম্ভাবনা। এইযে আমি বলি শাহবাগে জাগরণ।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বিশাল অর্জন।
আহমদ রফিক: কিন্তু এটি নষ্ট করে দেওয়া হলো। তার মানে হলো তরুণ যদি এখনো এগিয়ে আসে। এই যে, আমরা ভাষা আন্দোলন করলাম। এতে দেখেছি ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে প্রতিটি শহরের সাধারণ মানুষ আর শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকরা এগিয়ে এসেছে। তার মানে ছাত্র আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়েছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, ভাষা আন্দোলন আপনার নাম, গাজিউল হক সাহেব ছিলেন, আব্দুল মতিন স্যারসহ আপনাদের বেশ কয়েকজনের নাম আসছে। তা ছাড়া আপনাদের সাথে যারা ছিলেন তাদের ম্যুরাল করা, রাস্তা করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে হল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করা যেতে পারে কিনা। যেহেতু ভাষা আন্দোলনই এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মূল বীজ?
আহমদ রফিক: এগুলোর দরকারইবা কি? দরকার আছে?

আহমদ রফিক

ফারুক আহমাদ আরিফ: স্যার, মানুষ অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্যে।
আহমদ রফিক: হা হা (হাসি) অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্যে। যাইহোক এখন রাজনীতি হয়েছে দলকেন্দ্রীক ঠিক না। ক্ষমতাসীন হোক বা বিরোধী দল সবাই একই। এই রাজনীতি তো সুস্থ্য রাজনীতি না। তারা নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী কাজ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হোক আর মেডিকেল হোক সেখানে ভর্তির ব্যাপারে দেখা যায় যখন যে দল থাকে তার প্রাধান্য। সেখানে চিকিৎসা হোক, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কলা কোনটাই শিক্ষার স্তরটি আর উৎকৃষ্ট পর্যায়ে থাকে না। কারণ আমি যখন কাউকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেই তখন সেটি মান নিয়ে চিন্তা করবো না।

ফারুক আহমাদ আরিফ: সেখানে আনুগত্যটা চিন্তা করা হয়।
আহমদ রফিক: এখন আনুগত্যের রাজনীতি-সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। এরা অনুগত ভৃত্তের মত কাজ করছে।

ফারুক আহমাদ আরিফ: আপনি কেমন বাংলাদেশ চান?
আহমদ রফিক: আমরা তো চেয়েছিলাম ৫০ দশকেই, বলেছিলাম বিপ্লব করতে হবে। বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশ হবে অর্থনৈতিক শোষণমুক্ত শ্রেণিবৈষম্যহীন সমাজ, সুস্থ্য মূল্যবোধের গণতান্ত্রিক সমাজ, অসাম্প্রদায়িক সমাজ। সেইখানে ভূ-রাজনীতিক স্বাধীনতা পেলাম ওইখানে একটি পরিবর্তন ঘটলো পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। কিন্তু আপনি সমাজটাকে পরিবর্তন করতে চেষ্টা করলেন না। এটি বহুবার বহু লেখায় বলেছি ভূ-জাগতিক স্বাধীনতা পেলাম কিন্তু সামাজিক স্বাধীনতা যেটা সামাজিক মূল্যবোধ, সমাজ পরিবর্তন সুস্থ্য সমাজ। এই যে, কথায় কথায় নূর হোসেনরা কোথা থেকে আসে? সমাজটাকে ক্ষত-বিক্ষত করা হয়েছে। কাজেই এই ক্ষত-বিক্ষত সমাজটা দিয়ে আপনি কি করবেন? উত্তরায় সেভেন স্টার, নাইন স্টার নামে স্কুল ছাত্ররা খুন-খারাবি করছে। গ্যাং তৈরি করছে এটি বিশ্বাস করা যায়?

মাজেদুল হক তানভীর: আপনি যে বয়সে উপন্যাস লেখছেন তারা সেই তারা বয়সে খুন-খারাবি করছে।
আহমদ রফিক: কি?

ফারুক আহমাদ আরিফ: না, তিনি বললেন-আপনি যে বয়সে উপন্যাস লেখছেন তারা সেই বয়সে খুন-খারাবি করছে।
আহমদ রফিক: ও হা হা (হাসি)।

ফারুক আহমাদ আরিফ: বিডিমর্নিংকে সময় দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
আহমদ রফিক: আপনারাও ভালো থাকুন। বিডিমর্নিং এর কর্মী, পাঠক সবাইকে ধন্যবাদ।

(অডিও সংযুক্ত হবে)

Advertisement

কমেন্টস