Advertisement

কিলিং মিশন শেষে খুনিদের সঙ্গে কাদের খানের ফোনালাপ প্রকাশ

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৭

Advertisement

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সরকারদলীয় সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যা করার পর খুনিদের অবস্থান জানতে চেয়ে মোবাইল ফোনে কথা বলেন একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ডা. কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খান। কিলিং মিশন শেষ হওয়ার ২২ মিনিট পর কিলার গ্রুপের সদস্য রাশেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদি হাসানকে ফোন দেন তিনি। এ সংক্রান্ত ফোনালাপের চাঞ্চল্যকর ভয়েসকল এখন তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে সংরক্ষিত আছে। পুলিশ সদর দফতরের এলআইসি (ল’ফুল ইন্টার সেকশন) শাখা এরই মধ্যে ওই কথোপকথনের রেকর্ড সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন কোম্পানির কাছ থেকে সংগ্রহ করেছে।

পুলিশ সদর দফতরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা শনিবার বলেন, ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে রাশেদুল ইসলাম ওরফে মেহেদি হাসানকে ফোন দেন সাবেক সংসদ সদস্য কাদের খান। তবে কথা বলার সময় তিনি (কাদের খান) নিজের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেননি। ওই সময় তিনি তার গাড়িচালক হান্নানের মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। কাদের খান ফোনকল দিয়ে প্রথমে বলেন, ‘তোমরা এখন কোথায়? জবাবে মেহেদি বলে, আমরা বামনডাঙ্গা বাজার পার হচ্ছি।’

এরপর কাদের খান জানতে চান, ‘ওদিকের খবর কী বলো?’ জবাবে মেহেদি তাকে জানায়, ‘এতক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে।’

এরপর কাদের খান মেহেদিকে বলেন, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি চলে আসো।’

এর আগে একই মোবাইল ফোন থেকে ৫টা ১২ মিনিটে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাংবাদিক পরিচয়দানকারী চন্দন কুমার রায়ের সঙ্গে কথা বলেন কাদের খান। এ সময় তিনি সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের বাড়িতে কারা আছে, তা জানতে চান। কিলিং মিশনের আগে সংসদ সদস্যের বাড়ি ফাঁকা আছে বলে চন্দনই ক্লিয়ারেন্স দিয়েছেন কাদের খানকে।

সদর দফতরের ওই কর্মকর্তা জানান, সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন নিহত হওয়ার তিনদিন আগে ও পরে ওই এলাকায় ব্যবহৃত প্রায় ১০ হাজার মোবাইল ফোনের কললিস্ট যাচাই-বাছাই করা হয়। এর মধ্যে আড়িপেতে সন্দেহভাজন ৩৮টি মোবাইল ফোন চিহ্নিত করে এসব নম্বরের মালিকানা যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোবাইল কোম্পানির কাছ থেকে ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করা হয়। এসব ভয়েস রেকর্ডের মধ্যে ৮টিতে হত্যা পরিকল্পনা ও কিলিং মিশন সংক্রান্ত কথোপকথন পাওয়া যায়। এসব কথোপকথনের সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এবং ঘাতকদের চিহ্নিত করা হয় বলে ওই পুলিশ কর্মকর্তা জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের গ্রাহকদের ভয়েস রেকর্ড সংরক্ষণ করতে পারে। সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন কোম্পানির গ্রাহক সংখ্যা ও সার্ভার ক্যাপাসিটির ওপর ভয়েস রেকর্ড সংরক্ষণ সক্ষমতা নির্ভর করে। এক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে যে কোনো মোবাইল ফোনের ভয়েস রেকর্ড সংগ্রহ করতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় এরই মধ্যে চাঞ্চল্যকর অনেক অপরাধের পেছনে জড়িতদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে লিটন হত্যা মামলায় গ্রেফতার জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি ডা. কর্নেল (অব.) আবদুল কাদের খান শনিবার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। টানা তিন ঘণ্টা ধরে দেয়া জবানবন্দিতে তিনি চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী ও অর্থ জোগানদাতা হিসেবে দায় স্বীকার করেন। জবানবন্দি শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

এ বিষয়ে রাত সাড়ে ৯টায় সাংবাদিকদের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং করেন রংপুর রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি আহমেদ বশীর। সাংবাদিকদের তিনি জানান, মূলত প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের পথ বেছে নেন। এছাড়া তার মধ্যে ক্ষমতার লোভ এবং পরবর্তীকালে এমপি হওয়ার বিষয়টি জোরালোভাবে কাজ করেছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এমপি লিটনের পরিবারের কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে এমন কোনো তথ্য দেননি কাদের খান। বরং ৬ মাস আগে পরিকল্পনা গ্রহণ করে তিনি এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। অক্টোবর মাসে একবার হত্যাচেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বলে জানিয়েছেন।

ডিআইজি আহমেদ বশীর বলেন, হত্যা মিশনে অংশ নেয় ৩ জন। যাদের কাদের খান অস্ত্র দিয়ে পাঠিয়েছেন। এছাড়া তথ্য সহায়তাকারী হিসেবে আরও দু’একজনের নাম এসেছে। তিনি জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, যে ৩ যুবক এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন তাদের বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে এ কাজে তিনি বাধ্য করেছেন। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে বলে কাদের খান তাদের প্রলোভন দেখান।

ডিআইজি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মূল পরিকল্পনাকারীর জবানবন্দির মধ্য দিয়ে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি একেবারে স্পষ্ট হয়েছে। তাই তারা আশা করছেন, ১৫ দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে পারবেন।

১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে সাবেক এমপি কাদের খানকে বেলা আড়াইটার দিকে আদালতে আনা হয়। এরপর এ সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তুতি শেষে সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জয়নাল আবেদীনের খাস কামরায় জবানবন্দি গ্রহণ শুরু হয়। শেষ হয় রাত সোয়া ৯টায়।

এর আগে রিমান্ডের তৃতীয় দিন শনিবার দুপুরে কাদের খান এ হত্যাকাণ্ডের প্রধান ও একমাত্র পরিকল্পনাকারী হিসেবে দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিতে রাজি হন। অবশ্য তিনি শক্রবার তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছিলেন, আদালতে কোনো স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন না। একদিনের মধ্যে তিনি নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হত্যা পরিকল্পনায় তার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ থাকায় কাদের খান রিমান্ডের বাকি সময়টা আর পুলিশের কাছে থাকতে চাননি।

জবানবন্দি গ্রহণের উদ্দেশ্যে শনিবার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এ সার্কেল) রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হেলমেট এবং বুলেট প্র“ফ জ্যাকেট পরিয়ে কাদের খানকে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে আদালতে হাজির করা হয়।

এ সময় আদালত চত্বর ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়জুড়ে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা হয়। জজকোর্ট ভবনের সব গেট বন্ধ করে দেয়া হয়। কোনো গণমাধ্যমকর্মীকেও সেখানে ঢুকতে দেয়া হয়নি।

প্রসঙ্গত, এমপি লিটন হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাবেক এমপি কাদের খানকে রিমান্ড আবেদন করে ২২ ফেব্রুয়ারি জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। আদালত ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

Advertisement

 

Advertisement

কমেন্টস