যে ৫ কারণে হত্যা করা হয়েছে এমপি লিটনকে

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

জেএমবি ও জঙ্গিদের পরিকল্পনা, জামায়াত-শিবির চক্রের হামলা, রাজনৈতিক প্রতিপ, পারিবারিক শত্রুতা এবং সর্বশেষ জেলা পরিষদ নির্বাচন এই পাঁচ করণে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।

পুলিশি তদন্তে ওই ৫ বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। পুলিশ আশাবাদী খুব সত্বর হত্যার মূল উদ্দেশ্য বের হবে। হত্যার মোটিভ জানা সম্ভব হলেই প্রকৃত হত্যাকারীকে বের করা সহজ হবে।

এদিকে এমপি লিটনের হত্যা ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে এলাকাবাসী। হত্যার প্রতিবাদে সুন্দরগঞ্জ পৌর এলাকায় রবিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। উপজেলা আওয়ামী লীগের ডাকা এ হরতাল চলাকালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকে। এ ছাড়া গাইবান্ধা শহরেও জেলা যুবলীগের উদ্যোগে একটি বিােভ মিছিল বের করা হয়। বর্তমানে গোটা সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।

হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে রেল-সড়কপথে গাছ ফেলে এবং আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করা হয়। দুপুরে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী গাইবান্ধা-বামনডাঙ্গা রেলপথ ও বামনডাঙ্গা-রংপুর, বামনডাঙ্গা-নলডাঙ্গা, লক্ষ্মীপুর-গাইবান্ধা ও সুন্দরগঞ্জের বালারছিরা পাকা সড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। এ সময় রেল ও সড়কপথের দুধারের বড় গাছ কেটে সড়কের ওপরে ফেলে রাখে। এ ছাড়া সড়কের মাঝখানে ইট, কলাগাছ ও টায়ার জ্বালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

সকাল থেকে বামনডাঙ্গা রেলস্টেশনে দুটি ট্রেন আটকা পড়াসহ গাইবান্ধার সব রেল রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। সড়কে গাছ ও আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

অপরদিকে রেলপথ ও সড়কপথে গাছসহ আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টির খবর পেয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শরিফ আহম্মেদ বিজিবিসহ ঘটনাস্থলে গিয়ে রেলপথ ও সড়ক থেকে গাছ সরিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলেন।

১৮ জন আটক : সুন্দরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ আতিয়ার রহমান জানান, এই খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে শনিবার রাতেই ৬ জনকে এবং রোববার আরও ১২ জনসহ ১৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে আটকদের প্রায় সবাই জামায়াত-শিবিরের কর্মী। তবে গোপনীয়তার কারণে পুলিশ আটককৃতদের নাম জানায়নি।

কিলিং মিশনে অংশ নেয় ৫ জন : পুলিশের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রত্যদর্শীর বরাত দিয়ে জানায়, কিলিং মিশনে ৫ খুনি অংশগ্রহণ করে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধারণা করা হচ্ছে তারা বহিরাগত। কালো কোট-প্যান্ট পরা সবার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছর। তাদের একজনের মুখে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি ছিল। তারা দুটো মোটরসাইকেলে এসে বিকাল ৪টা থেকে এমপি লিটনের বাড়ি এবং আশপাশের এলাকায় রেকি করে। পরে এমপি লিটনের বাড়িতে প্রবেশ করে। এ সময় এমপি লিটন বাড়ির সামনে গাবগাছের নিচে বসে ছেলেদের বল খেলা দেখছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী খুরশিদ জাহান স্মৃতি ও এমপির শ্যালক বেতার। দুটি মোটরসাইকেলে ৫ জন কিলার এলেও তিনজন মোটরসাইকেলের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে। দুজন এমপি লিটনের কাছে জরুরি কথা আছে বলে এগিয়ে যায়। এ সময় এমপি তাদের অপো করতে বলে একটু পরে সাাৎ দেবেন বলে জানান। পরে সন্ধ্যা ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে ওই দুজনের সঙ্গে কথা বলার জন্য এমপি বাইরের বৈঠকখানায় প্রবেশ করলে তার স্ত্রী, শ্যালকও তার সঙ্গে যান। বৈঠকখানায় গিয়ে একজন কিলার এমপির স্ত্রীকে বলে, স্যারের সঙ্গে আমরা ব্যক্তিগত কিছু কথা বলতে চাই। এ কথা বলার পর স্ত্রী ও শ্যালক পাশের ঘরে চলে যান। এর কিছুণ পরেই তারা গুলির শব্দ শুনতে পেয়ে ছুটে আসেন। এমপি লিটনও তাকে গুলি করে মেরে ফেললÑ চিৎকার করে বৈঠকখানার পশ্চিম দিকের দরজা দিয়ে বাড়ির ভেতরে উঠোনে বেরিয়ে আসেন। এ সময় বাড়ির দুজন গৃহপরিচারিকা ও স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরলে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি লুটিয়ে পড়েন। পরে এমপির শ্যালক বেতার ও বাড়ির কেয়ারটেকার ইসমাইল এমপির বৈঠকখানা থেকে গুলির শব্দ শুনে ছুটে আসেন এবং পলায়নরত আততায়ী যুবকদের গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করলে গুলি ছুড়তে ছুড়তে তারা পালিয়ে যায়। বাড়ি থেকে বেরিয়েই কিলারদের একটি মোটরসাইকেল যায় বামনডাঙ্গার দিকে এবং অপরটি নলডাঙ্গার রাস্তায় চলে যায়।

৬ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করা হয় : পুলিশের সূত্র থেকে জানা গেছে, এমপি লিটনের বৈঠকখানা থেকে ৪ রাউন্ড গুলির খোসা ও ২টি ফায়ার্ড বুলেট উদ্ধার করা হয়েছে। সম্ভবত এই ফায়ার্ড বুলেট দুটিই এমপির দেহ ভেদ করে বেরিয়ে আসে এবং সে কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।

আওয়ামী লীগের রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য এবিএম মোজাম্মেল হক বলেন, জামায়াত-শিবির চক্র দেশকে অস্থিতিশীল করতেই লিটনকে হত্যা করেছে। এই চক্রকে দেশ থেকে সমূলে উৎখাত করা হবে।

এদিকে রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজে (রমেক) সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। তিন সদস্যের চিকিৎসক প্রতিনিধি দল ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে।

ময়নাতদন্ত দলের প্রধান ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. নারায়ণ চন্দ্র ও রমেকের অধ্য ডা. অনিমেষ মজুমদার বলেন, এমপি লিটনের শরীরে পাঁচটি গুলি লাগে। এর মধ্যে বুকে দুটি, পিঠে একটি ও হাতে দুটি। তার ফুসফুস, লিভার ও কিডনি জখম হয়। এ কারণে প্রচুর রক্তরণ হয়। আমরা মৃতদেহ থেকে একটি গুলি বের করেছি। মরদেহ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছি।

Advertisement

কমেন্টস