কুঁচে ব্যবসায় ৫ হাজার পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা

প্রকাশঃ আগস্ট ৩, ২০১৬

এসএম হাবিব, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি-

বছর দশেক আগে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের বেজপাড়া গ্রামের তোতা দাস(৫৫) প্রথম কুঁচের ব্যবসা শুরু করেন। সে সময় স্থানীয় বাজার পর্যন্ত এই ব্যবসা সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে কুঁচে ঢাকায় বাজারজাত করা হচ্ছে।

বিদেশে রফতানিযোগ্য কুঁচের বাজার মূল্য ভালো পাওয়ায় কালীগঞ্জ উপজেলার বেজপাড়া গ্রামের কুঁচে শিকার ও ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট শতাধিক পরিবারে স্বচ্ছলতা এসেছে। শুধু কালীগঞ্জ উপজেলার বেজপাড়া নয় বাইসা, খালকুলা, বাদুরগাছাসহ ঝিনাইদহ জেলার সকল উপজেলার কমপক্ষে ৫ হাজার পরিবার কুঁচে শিকার ও ব্যবসায় স্বচ্ছলতা পেয়েছে। কুঁচে ব্যবসায়ীদের সূত্রমতে ঝিনাইদহ জেলায় শিকারি ও ব্যবসায়ী মিলে কমপক্ষে ১০ হাজার লোক এই পেশায় জড়িত।

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কুঁচে শিকারি গয়া দাস(৫০)দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কুঁচে শিকার করে আসছেন। ৫ বছর আগে ঢাকায় কুঁচের বাজার সৃষ্টি হওয়ায় শিকার করা কুঁচে বর্তমানে স্থানীয় আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করেন। এতে পূর্বের তুলনায় আয় বেড়েছে। এক সময় সুদে ঋণে জর্জরিত গয়া দাস এখন ঋণমূক্ত। ঋণের দায়ে ভিটে-বাড়ি হারানো গয়া দাস কুঁচে শিকারের অর্থে ৩ শতক জমি কিনেছেন। থাকার ঘর করেছেন।

৩ মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। গয়া দাস বলেন, ‘শুধু আমি নয় এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সুদে ঋণে জর্জরিত হয়ে তাদের সহায় সম্বল সব হারিয়েছিল। বর্তমানে কুঁচে শিকার পেশায় এসে সুদে ঋণ থেকে মুক্তি পেয়েছে অনেকে। এ গ্রামে সুদে ঋণগ্রস্থ লোক এখন আর তেমন নেই।’

জেলার একই উপজেলার কুঁচে শিকারি দিপক ও কিশোর জানান, তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুঁচে শিকার করেন। এর মধ্যে ঝিনাইদহ জেলার নলডাঙ্গা ইউনিয়নের কাজুলি বিল, কোটচাঁদপুর উপজেলার দোপিলা, সদর উপজেলার গাড়াগঞ্জ, যশোর বাস টার্মিনালের পাশের জলাভূমি, বরিশালের বিভিন্ন হাওড় ও বিল থেকে কুঁচে শিকার করেন। এছাড়া কুষ্টিয়া কুমারখালি, যশোর জেলার কেশবপুর, চৌগাছা, বসুন্দিয়া, খুলনার ফুলতলা, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার জলাবদ্ধ অঞ্চল থেকেও কুঁচে শিকার করা হয় বলে তারা জানান। কুঁচে সাধারণত হাত দিয়েই ধরা হয়।

তবে বর্ষা মৌসুমে বড়সি ও চাই নামক বাঁশের তৈরী এক ধরনের যন্ত্র দিয়ে কুঁচে শিকার করা হয়। কালীগঞ্জ ও শৈলকুপার কয়েকজন কুঁচে শিকারির সাথে কথা বলে জানা যায় মাঝারি সাইজের প্রতি কেজি কুঁচে ১’শ ৪০ টাকা থেকে ১’শ ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। তবে শীত মৌসুমে কুঁচের সাইজ বেশ বড় হয়। এ সময় কেজি প্রতি কুঁচে ২’শ৫০টাকা থেকে ৩’শ টাকা দরে বিক্রি হয়। এতে মৌসুমে জন প্রতি প্রতিদিন কমপক্ষে ৫’শ থেকে ৬’শ টাকা আয় হয়।

ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কুঁচে ব্যবসায়ী বিপুল দাস জানান, তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কুঁচে কিনে পরে পিকআপে করে ঢাকায় পাঠান। শুধু তিনি নন উপজেলার বেজপাড়া গ্রামের গনি দাস, তোতা দাস, যাদব দাস, রিপন দাস, শংকর দাস ও দেবেন দাসও বিভিন্ন এলাকা থেকে শিকারিদের নিয়ে আসা কুঁচে ক্রয় করে ঢাকার আড়ৎদারদের কাছে বিক্রি করেন। ঝিনাইদহ জেলা থেকে প্রতি মাসে কমপক্ষে ২০ টন কুঁচে ঢাকায় পাঠানো হয় বলে তিনি জানান। ঢাকার আড়ৎদাররা দেশের বিভিন্ন এলাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কুঁচে সংগ্রহ করে তা চীনে রফতানি করে। তিনি দাবি করেন, কুঁচে রফতানির মাধ্যমে দেশীয় অর্থনীতিতে প্রতি বছর যোগ হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। দেশীয় অর্থনীতিতে নিজেদের সম্পৃক্ত রাখতে পারায় গর্ববোধ করেন বিপুল দাস।

শৈলকুপার কুঁচে ব্যবসায়ী কুমার বিশ্বাস জানান, ‘বছরের আষাঢ়, শ্রাবন, ভাদ্র ও আশ্বিন এই চার মাস অফ সিজেন। এ সময় কুঁচে তেমন পাওয়া যায় না। পেলেও সে গুলো খুব ছোট। যার কারণে বাজর দর ভালো পাওয়া যায় না। এসময় কুঁচে শিকারিরা বেকার হয়ে পড়ে। এই চার মাস পরিবার পরিজন নিয়ে কুঁচে শিকারীদের বেশ কষ্টে দিন কাটে। নদী এলাকার মৎসজীবীদের সরকারি সহায়তার কথা তুলে ধরে কুমার বিশ্বাস ঝিনাইদহ জেলার কুঁচে শিকারিদের অফ সিজেনে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতার দাবি করেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ সাইদুর রহমান রেজা বলেন, উপজেলায় কুঁচে শিকারির সঠিক পরিসংখ্যান তাদের কাছে নেই। তবে উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকার কয়েক শত লোক এ পেশার সাথে জড়িত আছে। যাদের অনেককে মৎস শিকরির আইডি কার্ড প্রদান করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য সহযোগিতা আসলে এই কার্ডধারীরা তা পাবেন। তিনি আরও বলেন কুঁচে শিকারিরা মৎসজীবীদের আওতায় পড়ে।

 

Advertisement

কমেন্টস