বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে জাতিগত বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে ভারতীয় পক্রিকা “আনন্দবাজার”

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭

বিডিমর্নিং স্পোর্টস ডেস্ক-

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার গ্রুপের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘এবেলা’। পোর্টাল হিসেবে যতখানি তার জনপ্রিয়তা, তার চেয়ে গসিপ মিডিয়া বা চটকদার সংবাদ পরিবেশক হিসেবে অধিক নামডাক রয়েছে মিডিয়াটির। এবেলায় যারা নিয়মিত ঢু মারেন বা খেয়াল করেন তারা নিশ্চয় জানেন, মানহানিকর বক্তব্য, রুচিহীন সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সমালোচিত মাধ্যম হিসেবে এই অনলাইন পোর্টালটির পরিচিতি কতখানি।

তবে সম্প্রতি এই মিডিয়াটি বাংলাদেশি নিউজ, স্পোর্টস বা বিনোদন বিষয়ক খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে জাতিগত বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হাউস পলিসি অবলম্বন করছে। মানহানিকর তথ্য, চটকদার হেডলাইন আর স্ক্যাণ্ডাল ছড়াতে বেশি ব্যস্ত মিডিয়াটি।

অবশ্য এই বিদ্বেষ আর  জাতিগত বৈষম্যের যে উস্কানির সংস্কৃতি চালু হয়েছে, সেটাও খুব বেশিদিন হয়নি। মূলত এটা শুরু হয়েছে খেলার মাঠ থেকে। গেল ক্রিকেট বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অবিস্মরণীয় পারফরম্যান্স, ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের সিরিজ জয় এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভালো অবস্থানটাকে মেনে নিতে পারেনি অধিক সংখ্যক কট্টর ভারতীয় সমর্থক।

প্রথমে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং পরে তার ভারতীয় গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লো। এই বিদ্বেষ এবং উস্কানি দিনকে দিন বাড়তে থাকলো এবেলার মতো পত্রিকার হাত ধরে। সাকিব, মুশফিক থেকে শুরু করে জাতীয় ক্রিকেট দলের একেকজন স্বনামধন্য প্লেয়ারকে নিয়ে একেরপর এক মানহানিকর তথ্যবহুল সংবাদ পরিবেশন করেছে এবেলা। প্রথমত তাতে কট্টর ভারতীয় ক্রিকেট সমর্থকরা এবেলার পাঠকে পরিণত হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশিরা পাঠকরা সেখানে ভার্চুয়াল ঝগড়ায় লিপ্ত হচ্ছে।

এমনি একটি ঘটনার হচ্ছে গত দুই দিন আগে ভারতের একটি সংবাদমাধ্যমে বিশ্বসেরা অল-রাউন্ডার সাকিব আল হাসানকে বাংলাদেশের কোনো একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাতকারে সাকিব বলেছিলেন অজিদের হারাতে হলে ভারতকে কী করতে হবে- সেই বিষয়ে। এই সাধারণ খবরটি বিকৃত করে ‘এবেলা’ নামক ওই ভারতীয় পত্রিকাটি গত ২২ আগস্ট ‘বিশ্বের একনম্বর দলকে ‘পরামর্শ’ দিয়ে হাসির খোরাক সাকিব, আপনিও হাসবেন’ শিরোনামে অদ্ভুত একটি নিউজ প্রকাশ করে!

নিউজটির পরতে পরতে ছিল বিশ্বের এক নম্বর অল-রাউন্ডারকে নিয়ে হাসাহাসি! এই ঘটনার পর থেকেই মূলতঃ দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে ঝামেলার সৃষ্টি। দেশের সেরা ক্রিকেটারকে এভাবে ট্রল করা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না ভক্তরা। নিউজটিতে একটি তথ্যগত ভুলও আছে। ভারত এই মুহূর্তে ওয়ানডে র‍্যাংকিংয়ের ২ নম্বরে অবস্থান করছে। ১ নম্বরে আছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ভারতীয় দৈনিকটি এই সাধারণ তথ্যটিও জানে না!

এবিপি প্রাইভেট লিমিটেডের মালিকানাধীন এবেলা নামক ওই দৈনিকটি সবসময় এমন বিদ্বেষমূলক খবর প্রকাশ করে থাকে। মূল ঘটনাকে বিকৃত করে অধিক হিটের আশায় এমন কাজ করে তারা। যেমন গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট সিরিজ নিয়ে ‘অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে ঘৃণ্য চক্রান্ত করেছিল বাংলাদেশ, ফাঁস হয়ে গেল এবার’ শিরোনামে একটি নিউজ করে পত্রিকাটি। আসল ঘটনা ছিল মিরপুর শের-ই-বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামের উইকেটকে ‘বাজে’ মন্তব্য করে বিসিবিকে শোকজ করেছিল আইসিসি। বিসিবি তার জবাবও দিয়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরুতে ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজে এমন ঘটনা ঘটেছিল। ওই সিরিজের প্রথম টেস্টটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল পুনেতে। জিতেছিল অস্ট্রেলিয়া। তবে পুনের উইকেটকে ‘খুব বাজে’ আখ্যা দিয়ে ভারতকে শোকজ করেছিল আইসিসি। এবেলা ওই ঘটনাটি এভাবে চেপে গেল কেন? প্রশ্নটির সম্ভবত কোনো জবাব নেই!

সাকিবকে নিয়ে ওই নিউজটি করার পর দুই দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ‘সাইবার লড়াই’ শুরু হয়। একে অপরকে যুক্তিপূর্ণ কথা থেকে শুরু করে কুৎসিত গালি পর্যন্ত প্রদান করেন। এছাড়া শুরু হয় ছবি বিকৃতি করে ট্রল করা। কিন্তু থেমে যায়নি এবেলা। কাল ২৪ সেপ্টেম্বর রবিবার আবারও বিদ্বেষমূলক একটি নিউজ ছাপায় সাইটটি। শিরোনামে দেওয়া হয় ‘কোহলিকে আবারও চরম অসম্মান, এবার সব মাত্রা ছাড়াল বাংলাদেশিরা’

এমনই আরো কিছু সংবাদ শিরোনাম দেখলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে। যেমন ‘সচিনকে প্রবল অসম্মান বাংলাদেশিদের! সাকিবদের সেলিব্রেশনে হাসছে গোটা বিশ্ব’, ‘বিস্ফোরক মন্তব্য, ভারতকে চরম অসম্মান বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের।’

স্রেফ দর্শক-সমর্থকদের পারস্পরিক কথাবার্তার ওপর নির্ভর করে এভাবে বিদ্বেষ ছড়ানোটা গ্রহণ করতে পারছেন না সচেতন মহল। এই বিদ্বেষ ছড়ানোর পেছনে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর এই পত্রিকাটির আরও খারাপ কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে কিনা তা নিয়ে ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

এবেলার সংবাদ মাধ্যমের এমন উস্কানিমূলক খবরে দিনের পর দিন দু’দেশের বৈষম্যমূলক আচরণ, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং তাতে করে তরুণ সমাজে ঢুকে পড়েছে জাতিগত বিদ্বেষ। কথা হলো, এবেলার এমন কর্মকাণ্ডে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে, আগামীতে তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে! 

বাংলাদেশ এবং ভারত প্রতিবেশী রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বিরোধী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভারতীয় বাঙালি সম্প্রদায় ও ভারত সরকারের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। দুদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে ঢের এবং প্রতিবেশী এ দুই দেশ স্ব-স্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দ্বিপাক্ষিক সমঝোতায় একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু একটি মিডিয়া যখন এই সম্পর্ককে বাদ দিয়ে দুদেশের মধ্যে বৈষম্যমূলক বিদ্বেষ আর উস্কানিতে কাজ করবে, তখন সে দায় নিশ্চয় তাদেরই নিতে হবে, এড়ানোর কোনো সুযোগ থাকছে না।

কমেন্টস