মুশফিকের অনুপ্রেরণা দেশের ১৬ কোটি মানুষ

প্রকাশঃ আগস্ট ৮, ২০১৭

বিডিমর্নিং স্পোর্টস ডেস্ক-

সর্বশেষ ২০০৬ সালে বাংলাদেশ সফর করে অস্ট্রেলিয়া। এর ১১ বছর পর ফের টেস্ট সিরিজ খেলতে এদেশে আসছে অজিরা। এর মধ্যে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বিশেষ করে গেলো দেড় বছরে প্রভূত উন্নতি সাধন করেছে টাইগাররা। এ সময়ে বাংলাদেশ প্রথমবার নিজেদের মাটিতে টেস্টে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে। শ্রীলংকাকে হারিয়েছে তাদের মাটিতে। এরই মধ্যে ওয়ানডে ক্রিকেটে সমীহ জাগানিয়া দলে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এবার সংক্ষিপ্ত ভার্সনের সাফল্য লংগার ভার্সনেও চায় টাইগাররা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আসছে সিরিজে ভালো পারফরম্যান্সের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। ‘ক্রিকবাজ’ ওয়েবসাইটকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে হাল আমলে দলের পরিবর্তন, নিজের ব্যাটিং, উইকেটকিপিং, অধিনায়কত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন তিনি।

প্রশ্ন: ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশ অনেক বেশি উন্নতি করা একটি দল। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে সেটা দেখা যাচ্ছে না। দলে কোনো লেগ স্পিনার অথবা সত্যিকারের ফাস্ট বোলার নেই গেলো ছয় বছর যাবত। আপনি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ সময়ে কতোটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?

মুশফিক : আপনি যেটা উল্লেখ করলেন, তেমন ধরনের খেলোয়াড় না থাকলে টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স করাটা বেশ কঠিন। আপনি কতো ভালো খেলেন সেটা কোনো বিষয় নয়, একটা টেস্ট ম্যাচ জিততে হলে ২০ উইকেট নেয়ার মতো খেলোয়াড় আপনার দলে থাকতে হবে। যেকোনো প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধেই এটা দরকার। যেহেতু আমাদের সত্যিকারের একজন লেগ স্পিনার কিংবা সত্যিকারের ফাস্ট বোলার নেই তাই সম্ভবত এদিক থেকে আমরা কিছুটা পিছিয়ে আছি। তবে একইসঙ্গে আমরা গেলো দু’/তিন বছরে মুস্তাফিজ এবং মিরাজের মতো খেলোয়াড় তৈরি করতে পেরেছি। আসছে দু’/তিন বছর তারা ভালো খেলতে পারলে আশা করি, এটা একটা ভালো টেস্ট দল তৈরিতে আমাদের জন্য সহায়ক হবে। অন্য ফরম্যাটে আপনি দু’ ঘণ্টা ভালো খেলতে পারলেই ম্যাচ জিততে পারবেন। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে ম্যাচ জিততে আপনাকে পাঁচ দিন, সেশন বাই সেশন ভালো খেলতে হবে। এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে তাদের সম্ভবত এক/দু’ বছর সময় লাগবে। এরপর আমরা শক্তিশালী একটা দলে পরিণত হতে পারি।

প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলের অন্যতম ব্যাটিং স্তম্ভ হিসেবে আপনাকে বিবেচনা করা হয়। তবে একজন অধিনায়ক হিসেবে ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে আপনি কার উপর ভরসা করেন?

মুশফিক : আমি সবসময়ই আমার ওপেনারদের দিকে তাকিয়ে থাকি। এককথায় বলতে গেলে তামিম ইকবাল অসাধারণ। গেলো তিন/চার বছর যাবত সে যেভাবে ব্যাটিং করছে এবং ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে বিশ্ব ক্রিকেটে তা খুব বেশি দেখা যায় না। তার মতো একজন দলে থাকাটা আমাদের জন্য এক ধরনের অনুপ্রেরণা। দলে আছেন সাকিব, মাহমুদুল্লাহ। এছাড়া সৌম্য ও মোসাদ্দেকের মতো তরুণ খেলোয়াড়রাও খুব পিছিয়ে নেই। মাঝে মুমিনুল হক এবং সত্যি কথা বলতে গেলে টেস্ট খেলুড়ে বেশ কিছু দলের চেয়ে আমাদের ব্যাটিং ইউনিট ভালো। টেস্ট কিংবা অন্য যেকোনো ফরম্যাটেই আমাদের শীর্ষ সাত ব্যাটসম্যানই 0বেশ ধারাবাহিক। আমি মনে করছি, প্রত্যেক খেলোয়াড়ই ব্যক্তিগতভাবে অনেক উন্নতি করেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এটা দলের জন্য সহায়ক হবে। আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, আমরা টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ খুব বেশি পাই না। তাই খেলতে নামলে কঠিন হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়া দল আসায় আমি অত্যন্ত খুশি। আমরা এজন্য প্রস্তুত। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের জন্য আমাদের প্রস্তুতি খুবই ভালো।

প্রশ্ন: আপনার দলের সবাই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমবার টেস্ট খেলতে যাচ্ছে। আপনার প্রত্যাশা কি?

মুশফিক : ইংল্যান্ড আসার সময় কেউই আমাদের গণনায় ধরেনি। তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করতে পারবো সেটাই ভাবেনি, জয়তো অনেক দূরের কথা। স্পিনের বিপক্ষে তারা কতোটা দুর্বল সেটা কোনো বিষয় নয়, উপমহাদেশের মাটিতে তাদের রেকর্ড খুবই ভালো। এর আগে আমরা ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচদিন লড়াই করতে পারতাম না। কিন্তু গেলো দু’/তিন বছরে আমাদের দলে কিছু মেধাবী খেলোয়াড় এসেছে, যারা বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ী হতে আমাদের অনুপ্রেরণা দেয়। পাঁচদিনই আমরা ভালো ক্রিকেট খেলতে পারি। এখন সে আত্মবিশ্বাস আমাদের আছে। আমরা যদি হোম কন্ডিশন ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারি। আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী খেলতে পারি তবে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অসম্ভব নয় বলে আমি মনে করি। সত্যি বলতে আমরা আমাদের সেরাটা খেলতে পারলে বিশ্বের যেকোনো দলকে হারানোর ক্ষমতা আমাদের আছে। একটা সময় ছিল আমাদের জিততে হলে নিজেদের ভালো খেলতে হতো আর প্রতিপক্ষকে খুব খারাপ খেলতে হতো। কিন্তু এখন সে অবস্থা নেই। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আমরা কিছু ওয়ানডে খেলেছি। কিন্তু কোনো টেস্ট ম্যাচ খেলিনি। এটা হবে বড় একটা সিরিজ। আমরা সবসময়ই শুনে আসছি যে অস্ট্রেলিয়া আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে। তাদের বিপক্ষে আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে খেলতে আমরাও প্রস্তুত।

প্রশ্ন: এতো কঠোর পরিশ্রম করার অনুপ্রেরণা কিভাবে পেলেন?

মুশফিক: সবচে’ বড় অনুপ্রেরণা হচ্ছে আপনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমাদের দেশে ১৬ কোটি মানুষের বাস। তবে আমরা মাত্র ক’জন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পাচ্ছি। আমি এখনো মনে করি, আমার চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী ক্রিকেটার আমাদের দেশে আছে। কিন্তু আমাদের হাতে যা আছে তা নিয়েই আমাদের খেলতে হবে। দিন দিন উন্নতির চেষ্টা করতে হবে। আমি নিজের কাছে দায়বদ্ধ। আমি সব সময়ই একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে কাজ করতে চেষ্টা করি। ফল নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করি না। কারণ, এটা আমার হাতে নেই। ভালো খেললেই উত্তেজিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ, এটা আমার কাজ। এ উদ্দেশ্যেই আমাকে বাছাই করা হয়েছে। আমি নিজের কাছে সৎ থাকতে চাই। এটাই আসল কথা।

প্রশ্ন: সমালোচনাকে আপনি কিভাবে নেন?

মুশফিক : ভালো খারাপ দু’টিই থাকে। খারাপ সময় পার না হওয়া পর্যন্ত যতো ভালোই করেন না কেনো আপনাকে সন্তুষ্ট করবে না। আমি সবসময়ই এটাকে ইতিবাচক হিসেবে নিতে চেষ্টা করি। আমরা পেশাদার ক্রিকেটার। তাই যেকোনো বিষয়কে সেভাবেই গ্রহণ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, যখন আপনি কাউকে বেশি পছন্দ করবেন, তখন তার কাছে চাহিদাও বেশি থাকবে। মাঝে মধ্যে আমরা প্রত্যাশা পুরণ করতে ব্যর্থ হই। কিন্তু আমি নিশ্চিত করতে চাই যে, আমরা সবসময় সেরাটাই দেয়ার চেষ্টা করি।

প্রশ্ন: টেস্ট খেলুড়ে দেশ হিসেবে আপনার প্রত্যাশা কি?

মুশফিক : আমার মনে হয় ওডিআই ক্রিকেটে আমরা ভালো করেছি। কারণ, আমাদের মধ্যে একটা স্বপ্ন ছিল। সেটিই আমাদের ভালো করার অনুপ্রেরণা যোগাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, টেস্টে আমাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে হবে। তবে এখানে প্রতিভার কোনো ঘাটতি নেই। আমাদেরকে বিদেশের মাটিতে গিয়ে ভালো খেলতে হবে। সেটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা যখন বাইরে যাই তখন দরকার হবে ঘরের মাঠের মতো পুনরাবৃত্তি করার। নিউজিল্যান্ডে আমরা ভালো করতে পারিনি। বিশেষ করে দলবদ্ধভাবে। যদিও কয়েকটি দারুণ একক পারফর্ম্যান্স ছিল। এখন আমাদের আরো একতাবদ্ধ পারফর্ম্যান্স নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দিন শেষে এটি হচ্ছে দলগত একটি খেলা। দলের জন্যই আপনাকে খেলতে হবে। আমরা এখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের অপেক্ষায় রয়েছি। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যাবো। এ দু’টি শীর্ষ দলের সঙ্গে খেলার পর আমরা আশা করি, ভালো একটি চেহারা লাভ করবো।

প্রশ্ন: আপনার উইকেটকিপিং নিয়ে অনেক কথা উঠছে?

মুশফিক : আমি আগেও বলেছি যে, উইকেট কিপিংয়ের ফলে আমার উইকেট সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে সুবিধা হয়। যেটি আমাকে ব্যাটিংয়ের সময় সহায়তা করে। একই সময় আমাকে দলের জন্য করণীয়ও ঠিক করতে হয়। এ কাজে আমি খুশি। চেষ্টা করবো টিম ম্যানেজমেন্ট আমাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে সেটি আরো বেশি করে পালন করতে।

Advertisement

কমেন্টস