স্ত্রীকে দেওয়া সেই রক্তদাতার সন্ধানে আছেন মাশরাফি

প্রকাশঃ জুলাই ৪, ২০১৭

Advertisement

বিডিমর্নিং স্পোর্টস ডেস্ক-

২০১১ সালে ঘরের মাঠে চলছে আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপ। অথচ বাংলাদেশ দলে নেই মাশরাফি। বাদ পড়ার যন্ত্রণা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল নড়াইল এক্সপ্রেসকে।বিশ্বকাপের সেই সময়ই মাশরাফির সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আইসিইউতে। স্ত্রী-সন্তানকে বাঁচাতে ২৪ ব্যাগ রক্ত লেগেছিল। কঠিন মুহূর্তে স্ত্রীর অপারেশনের জন্য দুই ঘণ্টার মধ্যে প্লাজমা প্রস্তুত করতে বলা হয়েছিল মাশরাফিকে। প্লাজমা প্রস্তুত করতে যেখানে সময় লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।

সেই বিপদ মুহূর্তে ঢাকার মোহাম্মদপুরে রেড ক্রিসেন্টের ব্লাডব্যাংকে এক অচেনা লোক, নিজের অসুস্থ রুগীর জন্য প্রস্তুত করা প্লাজমা বিনা পয়সায় মাশরাফিকে দিয়েছিলেন। তাতেই মাশরাফির স্ত্রীর সফল অপারেশন হয়। এমন বিপদের মুহূর্তে সেই লোকের ফোন নম্বর নেয়া ও কিংবা তার চেহারাও মনে রাখা সম্ভব হয়নি মাশরাফির। কিন্তু এখনও সেই স্মৃতি সেই বিপদের মুহূর্তে এগিয়ে আসা ভালো মানুষকে আজও খুঁজে বেড়ান টাইগার অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।

নড়াইল জেলা অনলাইন মিডিয়া ক্লাবের সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে এ কথাগুলোই বলেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা।

২০১১ সালে ঘরের মাঠে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে দল থেকে বাদ পড়া, অসুস্থ স্ত্রীর অপারেশন, অচেনা ব্যক্তির উদারতা প্রসঙ্গে মাশরাফি যা বলেছেন, তার  উল্লেখিত একটি প্যারা তুলে ধরা হলো পাঠকদের জন্য। ‘২০১১ বিশ্বকাপ দলে না থাকায় আমার মন-মেজাজ তখন ভীষণ খারাপ। ওই সময় আমি খেলা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছিলাম। মনে হয়েছিল, আর কিসের জন্য খেলব! একটা স্বপ্ন ছিল, দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলব। সেটাই যখন হলো না, তাহলে আর কী জন্য খেলা? ওই বিশ্বকাপের সময়ই আমার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আইসিইউতে (হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) যায়, ১১ দিন ছিল সেখানে। ২৪ ব্যাগ মতো রক্ত লেগেছিল। একজন মানুষকে আমি ভুলতে পারিনি, তাঁকে খুঁজি এখনো। আমি মোহম্মদপুরে অবস্থিত রেড ক্রিসেন্টে গেলাম, প্লাজমা দরকার ছিল। আমার স্ত্রীর অপারেশন হবে ১২টার সময়। তখন বাজে ১০টা। প্লাজমা প্রস্তুত করতে সময় লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। তো, মোহাম্মদপুরে রেড ক্রিসেন্টের যে ব্লাডব্যাংক, ওখানে যাওয়ার পরে একটা লোক, ওনারও বাসার কেউ অসুস্থ। প্লাজমা ছিল একটাই।

আমাকে দেখে তিনি পরে বললেন, ‘আপনার কি ইমিডিয়েটলি লাগবে?’ আমি বললাম, ‘দুই ঘণ্টা পরে আমার স্ত্রীর অপারেশন। ’তিনি বললেন, ‘আমার তো ১০-১২ ঘণ্টা পরে লাগবে। আপনি এটা নিয়ে যান। আমি আরেকটা রেডি করতে বলি। এত ব্যস্ততার মধ্যে আমি তাঁর নম্বর নিতে পারিনি। ওই সময়ে তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। কিন্তু আমি তাঁকে জানাতে পারিনি যে, তাঁর ওই কাজটা কতটা মন ছুঁয়ে গেছে আমার। মানুষটার চেহারাটাও মনে নেই। তখন আমার এমন অবস্থা, কোন পথ দিয়ে আমি ওখানে গেছি, তাই-ই তো খেয়াল নেই। ওই সময়ে আমার মনে হয়েছে, আমরা যে বলি ভালো মানুষের সংখ্যা কম, এটা ভুল কথা। মানুষ ভালো কাজ করছে না, এটাও ভুল কথা। তা না হলে এই বিশ্ব বা একটা দেশ এভাবে চলতে পারত না। অনেক মানুষ ভালো ভালো কাজ করছে। আমরা আসলে মানুষের সঙ্গে সেভাবে মিশি না বলে বুঝি না। ওই মানুষটারও তো কেউ অসুস্থ ছিল। আমাকে প্লাজমা দেওয়ার ঝুঁকি তিনি না-ও নিতে পারতেন। কোনো কিছু না ভেবেই তিনি দিয়ে দিয়েছেন।

তারপর অপারেশন হলো। ওই সময় বিশ্বকাপ খেললে আমি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ম্যাচ নিয়েই ব্যস্ত থাকতাম। এদিকে ১০-১৫ দিন ধরে আমার স্ত্রীর যে শরীর খারাপ, সেটা সে কাউকে বলেনি। হয়তো অনুভবও করতে পারেনি সেভাবে। তাই এই দিনও হয়তো ভাবত আর দশটা দিনের মতো। অথচ আর একটু দেরি হলেই স্ত্রীকে হারিয়ে ফেলতাম আমি। ফলে ভাবলাম, আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। যা হয়েছে, ভালোর জন্যই হয়েছে। পরের দিন থেকেই আমি পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শুরু করে দিই। ভাবি যে, আমি খেলব এবং খেলার মতোই খেলব।

Advertisement

Advertisement

কমেন্টস