মুশফিকের হারিয়ে যাওয়া এবং তার পেছনের গল্প

প্রকাশঃ অক্টোবর ৮, ২০১৬

বিডিমর্নিং স্পোর্টস ডেস্ক– 

মুশফিকুর রহিম সবসময়ই একজন আক্রমণাত্মক ক্রিকেটার, দু’বছর আগেও ছিলেন দলের অন্যতম ভরসা। সেই মুশফিকই ধীরে ধীরে যেন এমন একজন ব্যাটসম্যানে পরিণত হয়েছেন, রান করার জন্য যাকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

এদিকে তার উইকেটকিপিং নিয়েও প্রশ্ন তৈরী শুরু হয়েছে। তাঁর কমিটমেন্ট কিংবা দলে জায়গা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ কখনোই খুব একটা নেই। তবে বাংলাদেশ দল তার উপর নির্ভর করে ব্যাটিংয়ের মিডল অর্ডার থেকে যথেষ্ট সার্ভিস পাওয়ার ব্যাপারে এবং দলের আশা থাকে বিশ্বের যেকোনো দলের বোলিং আক্রমণের বিরুদ্ধে মিডল অর্ডারে দৃঢ় আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়াতে পারবেন মুশফিক; এই কাজটাই তার কাজ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। আফগানিস্তানের বিপক্ষে তিন ইনিংস মিলিয়ে মুশফিকের রান মাত্র ৫৬। এর মধ্যে দু’বার তিনি স্লগ-স্যুইপে পরাস্ত হয়েছেন। তৃতীয় ম্যাচে ডিপ স্কয়ার লেগে সেই একই শট খেলে জীবন পাওয়ার আগ পর্যন্ত সেই শট খেলে গেছেন। তিনিই ভালো জানেন, কোন্ শটটা তাঁর সেরা। কারও নিজের শক্তির দিকটাকে আঁকড়ে থাকাটা নিশ্চয়ই প্রশংসার যোগ্য; তবে যে শট তাঁকে নিয়মিত বিপদে ফেলছে, সেই শটই বার বার খেলার চেষ্টা করাটাকে গোঁয়ার্তুমিও বলা যেতে পারে।

আফগানদের বিপক্ষে উইকেটের পেছনে মুশফিক এমনকি আরও খারাপ সময় কাটিয়েছেন। দ্বিতীয় ম্যাচের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি তিনটা ক্যাচ গ্লাভসবন্দী করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং একটা স্ট্যাম্পিংয়ের সুযোগও হাতছাড়া করেছেন। সম্ভবত সেটাই বাংলাদেশকে ম্যাচে পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য করেছে। এই ঘাঁটতি দলে তাঁর ব্যাটসম্যান ও উইকেটরক্ষক, দুই ভূমিকাতেই থাকা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার সুযোগ করে দিয়েছে; এই প্রশ্নটা গোটা ২০১৫ সাল জুড়েই তাঁকে তাড়া করে ফিরেছে।

আফগানিস্তান সিরিজে অবশ্য মুশফিক বাংলাদেশ ক্যাপটেন মাশরাফি মূর্তজা’র সমর্থন পেয়েছেন; এমনকি দ্বিতীয় ম্যাচের স্ট্যাম্পিং মিস করার পরও। তিনি বলেন, মুশফিক তাঁর মাঠের দায়িত্বে যতটা পেশাদারী, তাতে করে কোনো অভিযোগের কোনো সুযোগই নেই। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো তাঁর গত কয়েক মাসের পারফর্মেন্সের কারণে ড্রেসিং রুমে তাঁকে নিয়ে বৈরী হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

কেউ কেউ বলেন,অত্যধিক অনুশীলনের কারণেই মুশফিকের অবনতি হচ্ছে। যেহেতু তিনি রান পাচ্ছেন না, এই মনোভাব জনপ্রিয় হচ্ছে। মিরপুরে অনুশীলনের জন্য মুশফিক সাধারণত তাঁর সতীর্থদের কয়েক ঘণ্টা আগেই মাঠে হাজির হন এবং যতক্ষণ সম্ভব ব্যাট করে যান। এমনকি ম্যাচের দিনেও, তিনি দলের সঙ্গে না এসে বরং আগেই মাঠে চলে আসেন বলে জানা যায়। এখন যেমন করছেন, অতীতেও মুশফিক এতটাই দীর্ঘমেয়াদী অনুশীলন করে এসেছেন। কিন্তু এমনকি স্টিভ ওয়াহ বা শচীন টেন্ডুলকারের মতো গ্রেট ব্যাটসম্যানরাও, তাঁদের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বিভিন্ন সময়ে, মূল ম্যাচে আরও বেশি করে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য অনুশীলন কমিয়ে দিয়েছেন। এই বিষ্ময়কর তথ্য ওয়াহ্ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন। অপরদিকে টেন্ডুলকার ২০০৩ বিশ্বকাপের পুরোটা জুড়ে নেট প্র্যাকটিস বন্ধ রেখেছিলেন।

মুশফিকের জীবনের সাম্প্রতিক অনেক বিষয়ের মতো এ ব্যাপারেও আমাদের জানা নেই যে, তাঁকে অনুশীলনে এত জোর না দেওয়ার পরামর্শটা কেউ দিয়েছে কি না। কিন্তু সম্প্রতি যখন সাকিব আল হাসান বললেন, অনুশীলনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করার চেয়ে উইকেটে গিয়ে পারফর্ম করতে পারাটা বেশি জরুরী।

অন্তত এই কারণে সাকিব ও মুশফিকের মধ্যে তুলনার করার সুযোগ আছে। দু জনই কৈশোরে একই প্রতিষ্ঠানে ক্রিকেট শিখেছেন এবং ২০০৬-এ হারারে-তে একই ম্যাচ দিয়ে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরু করেছেন। তবে সাকিব আর মুশফিক একেবারেই আলাদা ব্যক্তি, অতএব তাঁদের মধ্যে অনুশীলন নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকাটাও স্বাভাবিক।

এ বছরের ওয়ার্ল্ড টি-টুয়েন্টির পর থেকে মুশফিকের ব্যক্তিত্ব কীভাবে বদলে গেছে, তা নজরে আসতে বেগ পেতে হয় না। বিশেষ করে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচটার পর থেকে, যে ম্যাচে জয় নিশ্চিত হওয়ার আগেই তিনি উদ্যাপন করে ফেলেন। পরের বলেই তিনি আউট হয়ে যান, এবং বাংলাদেশ মাত্র ১ রানে হেরে যায় ম্যাচটা। জনতার প্রতিক্রিয়া খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিলো তখন। কিন্তু বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমের খুব কমসংখ্যকই এই ঘটনার জন্য মুশফিককে সরাসরি দায়ী করে।

তবে মুশফিক আবারও ভুল করে বসেন-সেমিফাইনাল থেকে ভারতের বাদ পড়ায় আনন্দ প্রকাশ করে টুইট করে। যদিও তিনি দ্রুতই সেই টুইট মুছে ফেলেন, তবে সেটা ভাইরাল হতে সময় নেয়নি। সার্চ-ইঞ্জিনগুলোতে সেই স্ক্রিনশট ঘুরতে থাকে। এর জন্য তাঁকে নির্দয়ভাবে অপদস্থ করা হতে থাকে এবং কয়েক সপ্তাহ পর এমনকি বিসিবি থেকে তাকে ভৎর্সনাও পর্যন্ত করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে মুশফিক মিডিয়ার সাথে দূরত্ব বজায় রেখেছেন এবং এখনও তা অব্যহত আছে। সেই ম্যাচে যা হয়েছে, তা নিয়ে মনপীড়া হওয়ারই কথা। যদিও এ ব্যাপারে মিডিয়ার সামনে তাঁকে ওই একবারই কথা বলতে হয়েছে এবং সেই ট্যুই্টের ব্যাপারে একেবারেই তোলা হয়নি তার সামনে।

সাম্প্রতিক বাজে ফর্ম, মাঠের বাইরের দুর্গতি এবং গণমাধ্যমের সাথে টানাপোড়েনে এমন একজন মানুষের জীবন জটিল করে ফেলেছে, যিনি একজন সোজাসাপ্টা মানুষ হিসেবে পরিচিত। মুশফিক কোনোকিছুর পরিণতি নিয়ে কখনও শঙ্কিত ছিলেন না, হোক সেটা কোনো পারফরর্ম করতে না থাকা সতীর্থর পাশে থাকা কিংবা সরাসরি আইসিসি’র বিরুদ্ধে কথা বলা। মুশফিক হলেন একমাত্র টেস্ট অধিনায়ক, যিনি দ্বি-স্তর বিশিষ্ট টেস্ট আয়োজনের পরিকল্পনার বিষয়ে ‘বিগ থ্রি’র বিরুদ্ধে কথা বলেছেন ২০১৪’র জানুয়ারিতে। যেখানে বিসিবি কার্যত ক্ষমতাবানদের পক্ষ নিয়েছে, সেখানে তাঁর বক্তব্য তাঁর বসদের কাছে খুব ভালোভাবে গৃহীত হয়নি, বলাই বাহুল্য।

২০১৩ সালের বিপিএল-এ ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে মোহাম্মাদ আশরাফুল যখন বিসিবি কর্তৃক বরখাস্ত হলেন, মুশফিক ফেটে পড়েছিলেন তাঁর বিরুদ্ধে। তাঁকে ‘জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। বাংলাদেশী খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনিই প্রথম বিপিএল-এর প্রথম আসরের পারিশ্রমিক না পাওয়া নিয়ে কথা বলেছিলেন। অচিরেই তিনি অধিনায়কত্ব হারান, কেননা বোর্ড তাঁর ওই মন্তব্যে খুশি হতে পারেনি। তাঁর কাছে কোনো কিছু মানসম্পন্ন মনে না হলেই তিনি মুখ খোলেন। তিনি আবেগপ্রবণও বটে। গত তিন বছরে তিন তিনবার তিনি অধিনায়কের পদ থেকে ইস্তফাও দিয়েছেন। প্রথম তিনি এটা করেন ২০১৩ সালে, জিম্বাবুয়ের সাথে বাংলাদেশ একটা ওডিআই সিরিজ হেরে যাওয়ার মিনিট খানেক পরেই। তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবারও স্বপদে ফিরে আসেন। ২০১৫ সালের বিপিএল এবং এ বছরের ঢাকা প্রিমিয়ার লীগেও তিনি অধিনায়কত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। এ ধরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পূর্ণ অধিকার তাঁর আছে। তবে এসব ক্ষেত্রে ভুল ব্যাখ্যাটাই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায়, যদি না তিনি পদত্যাগের সঠিক কারণটা জানিয়ে গণমাধ্যমের কাছে কোনো বার্তা দেন।

এমনকি তারপরও এটা তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত যে, তিনি গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে চাইবেন কি চাইবেন না। তবে তাঁর বোঝা উচিত যে, তাঁর সিদ্ধান্ত ও কাজকর্ম নিয়ে যখন অজস্র প্রশ্ন উঠছে, তখন কিছু দায় তো তাঁর উপর বর্তায়ই। দু’বছর আগে যখন তিনি বিগ থ্রি’র প্রস্তাবের ব্যাপারে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তখন সাংবাদিকরা তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস কেড়ে নেয়ার হুমকির ব্যাপারে তিনি কী ভাবছেন? তাঁর উত্তরটা খুবই বস্তুনিষ্ঠ ছিল এবং তিনি তা থেকে সরে আসেননি।

কোনো সন্দেহ নেই, আমাদের সামনে সেই মুশফিকই আছেন। তবে পার্থক্যটা হলো, এখন মুশফিক মরিয়া হয়ে রানে ফেরার চেষ্টায় আছেন। একমাত্র মুশফিকই জানেন, কীভাবে তিনি এই প্যাঁচ থেকে বেরিয়ে আসবেন – সেটা কি আরও বেশি নেট প্র্যাকটিসের মাধ্যমে, কিংবা মিডিয়ার সাথে আরও বেশি দূরত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে, নাকি নিজেকে আমূল বদলে দিয়ে নতুন করে শুরু করার মাধ্যমে?

কমেন্টস