দুই ‘পা’ থেকেও নেই ,হুইলচেয়ারে করে বিশ্বকাপ জয় করতে চান মহসিন

প্রকাশঃ এপ্রিল ২, ২০১৮

মেজবা মিলন।।

পৃথীবিতে  মানুষের কতই না ধরণ। কারো হাত আছে, তো কারো পা নেই। আবার কারো চো, তো হাত পা কোনটাই নেই। বিধাতা তার মনের মত করে প্রতিটি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। এখানে তার উপরে কারো হাত নেই। কিন্তু হাত, পা বা চোখ নেই বলে জীবন চলবে না এমনটা নয়।

যারা জন্মের পর হাটতে পারে না, ঠিক ভাবে চোখে দেখতে পারে না স্বাভাবিক আর পাঁচটা মানুষের মত কোন কাজ করেতে পারে না সমাজে তাদের আমরা প্রতিবন্ধী বলি। অনেকেই আবার তাদের অবহেলা করে। অবশ্য তারাও নিজেদের অসহায় ভাবে। বেঁচে থাকার জন্য অন্যর উপর নির্ভর করে। ধরেই নেয় তাদের পক্ষে একা পথ চলা সম্ভব নয়। তারা সমাজের বুঝা।  তাদের দ্বারা কোন কাজ হবে না। তাই সমাজ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চাই।

চাইবে না বা কেন ? যাদের শরীরের  অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ থেকেও বিকল হয়তো তারাই ভালো বলতে পারবেন জীবনটা তাদের কাছে কেমন? তবে এই ভাবে জন্মিয়ে জীবনটা সুন্দর করা যাই। সেটা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন মোহাম্মদ মহসিন। শরীরের দুই পা অচল থাকলেও সাফল্য জয়ের লক্ষে ছুটে চলেছেন। সমাজের সকল বাধা উপেক্ষা করে জয়ের মশাল শক্ত  করে  ধরে এগিয়ে চলেছেন।হতে চান টাইগার ওয়ানডে দলের অধিনায়ক মাশরাফির মত।

মহসিন  বাংলাদেশ হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন। সমাজে আর যারা তার মত প্রতিবন্ধী আছে তাদের নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি  ক্রিকেট টিম। স্বপ্ন দেখেন মাশরাফি ও সাকিবদের মত দেশের হয়ে খেলে সুনাম বয়ে নিয়ে আসবেন।চলতি মাসে ভারতের মাটিতে ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলবে মহসিনরা।সিরিজ খেলতে যাওয়ার আগে  নিজের বর্তমান অবস্থা ও কিছু না বলা কথার শেয়ার করলেন বিডিমর্নিং– এর কাছে সাক্ষাতে ছিলেন মেজবা মিলন।।

মহসিন অনেক খুশি তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো। কারণ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাদের ১৫টি স্পোর্টস হুইলচেয়ার কিনে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।তাই প্রথমে তাঁর কাছে জানতে চাইলাম কেমন আছেন?

মহসিনঃআল্লাহর রহমতে অনেক ভালো আসি।

প্রশ্নঃ ক্রিকেটের প্রতি এতো ভালোবাসা কি ভাবে শুরু হলো?

মহসিনঃ আসলে আমার বয়স যখন ৬ মাস তখন আমার দুটো পা বিকল হয়ে যায়। তারপর যখন আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলাম তখন দেখতাম আশে পাশের ছেলেরা খেলা করতো। তো সেই থেকেই চিন্তা ভাবনা আমার যদি পা দুটো ভালো থাকতো তাহলে আমিও ক্রিকেট খেলতাম। অনেক সময় তাদের সাথে খেলতে যেতাম কিন্তু আমাকে নিতো না। তারপর বাংলাদেশ যখন আইসিসি ট্রফি জিতলো তখন সেটা দেখে আমার খেলার প্রতি আগ্রহটা আরো বেড়ে যাই। তখন আমি চিন্তা করি আমার মত যারা আছেন তাদের নিয়ে খেলা করা যাই কি না।

প্রশ্নঃ সমাজের একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েও ক্রিকেট খেলার মতন একটা খেলায় এসেছেন আপনার পরিবার এই বিষয়টি কেমন ভাবে নিয়েছেন। তারা কতটুকু সাপোর্ট করেছেন?

হয়তো প্রথম দিকে মহসিনের পরিবার তার ক্রিকেট খেলা স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনি। তার কথা শুনেই বুঝা গেলো। তার পরেও মনের সাথে অনেকটা যোর খাটিয়ে বললেন পরিবারের সাপোর্ট ছিলো। কিন্তু কতটা ছিলো সেটা তার মুখ দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো।

মহসিনঃ পরিবারের সাপোর্ট ছিলো। পারিপার্শ্বিক বন্ধুদেরও সাপোর্ট ছিলো কিন্তু কেও স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারেনি। অনেকেই বলতো ও হাটতে পারে না কি ভাবে খেলবে। অনেক ভাবেই খুচা দিতো। তবে আমি কখনো ভাবি না আমার এই সমস্যা আছে। আর পাঁচটা সাধারণ মানুষ যে ভাবে চলাচল করে আমি সেই ভাবেই চলাচল করি। কিন্তু আমার একটাই সমস্যা একটা সাধারণ মানুষ যে জায়গায় যেতে পারছে আমি সেই জায়গায় যেতে পারছি তবে আমার একটু সময় বেশি লাগে।

প্রশ্নঃ আপনার খেলা দেখে কেও কোন খারাপ কথা বলতো না?

মহসিনঃ  হ্যাঁ, প্রথম পর্যায়ে তো একটু বলতোই। তবে মানুষ কি বললো আমি সেটা খেয়াল করিনি। আমি আমার স্বপ্ন লক্ষ্য ঠিক রেখে কাজ করেছি।

প্রশ্নঃক্রিকেট খেলার জন্য ব্যাট বল যা লাগে এই সব কি পরিবার থেকে পেয়েছে?

মহসিনঃ প্রথম দিকে এই ধরনের সাপোর্ট ছিলো না। তার পর আস্তে আস্তে আরো কিছু বন্ধু নিয়ে ক্রিকেট শুরু করি। যার ফলে সবাই মিলে জিনিস গুলোর অভাব পূরণ করতে পেরেছি।

প্রশ্নঃআমরা সবাই জানি হুইলচেয়ার ক্রিকেট দলটি আপনার  প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে। তো এই দল বানানোর জন্য কার সাহায্য আপনি বেশি পেয়েছেন?

মহসিনঃ  আসলে আমি ফেসবুকে একটা গ্রুপ খুলি সেখানে আমার মত যারা আছেন ক্রিকেট খেলতে চাই তাদেরকে খেলার কথা বলি। এছাড়াও আমাদের দেশে অনেক প্রতিবন্ধী সংগঠন আছে তাদের কাছে বলি। এই ভাবেই হয় আর কি।

প্রশ্নঃ ক্রিকেট নিয়ে এখন লক্ষ্য কি?

মহসিনঃ আমার লক্ষ্য এখন বিশ্বকাপ খেলা। বাংলাদেশ যাতে বিশ্বকাপ খেলতে পারে আর সেখান থেকে ভালো একটা ফলাফল নিয়ে আসতে পারে।

প্রশ্নঃ আপনাদের পাশে এখন বিসিবি কাজ করছে বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা করছে কেমন লাগছে?

মহসিনঃ সেটা আসলে ভাষাই প্রকাশ করার মতো না। বোর্ড আমাদের জন্য যাই করছে সেটা অনেক বড় পাওয়া।

প্রশ্নঃ ক্রিকেট খেলতে এসে এমন কোন ঘটনা ঘটেছে কি যা আপনাকে খুব কষ্ট দিয়েছে?

মহসিনঃ এই কথাটা আমি জানি না আপনারা কি ভাবে নিবেন। সেটা হচ্ছে ২০১৬ তে আমি এশিয়া কাপ খেলতে গেলাম ভারতে। তো ঐ খানে শ্রীলংকার সাথে আমাদের একটা ম্যাচে ওরা আমাদের ৪ টা খেলোয়াড়কে বলে ৪০ শতাংশ ডিসএবেল নাই। তারা আমাদের চারটা খেলোয়াড়কে খেলতে দিলো। যার জন্য আমরা ম্যাচটি ওয়াক ওভার দিতে হয়। এটা ক্রিকেট ইতিহাসে হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। সেই ম্যাচের কারনে আমরা এশিয়া কাপ থেকে বাদ পড়ে যাই। তো এই দিনটা আমার জীবনে একটা কষ্টের দিন ছিলো।

প্রশ্নঃ আমাদের দেশে আপনার মত অনেকেই আছেন। তো তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন প্রতিবন্ধী হয়েও বড় কিছু করা সম্ভব।

মহসিনঃ  আসলে আমি এক সময় এটা ভাবতাম রাস্তায় বের হবো না। বের হলে মানুষ ফ্যাল ফেলিয়ে তাকায় থাকতো। তো আমি বলবো এই সব দিকে কান না দিয়ে। ঘর থেকে বের হয়ে আসতে হবে লক্ষ্য যেটা সেটা করতে হবে। জগতটা অনেক সুন্দর। আমি পারবো না আমি অক্ষম এটা ভাবলে হবে না। আমার পা থেকেও নেই। আমি টঙ্গী থেকে মোটর সাইকেল চালিয়ে এখানে এসেছি।  ভিতরে ইচ্ছা শক্তি থাকতে হবে। তা না হলে হবে না।

কমেন্টস