‘সজীব সরকার’ সাধারণের মাঝে অসাধারণ

প্রকাশঃ অক্টোবর ১৭, ২০১৭

তৈয়ব আলী ও সাহেগীর জুয়েল-

আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই তিনি। সব সময় সাধারণকেই ভালোবাসেন। চলাফেরাও খুব সাধারণ। পোশাকের ক্ষেত্রেও সব সময় খুব ছিমছাম। অথচ তাঁর দক্ষতা, সততা, শিক্ষক হিসেবে অসাধারণ নৈপুণ্য তাঁকে অনেক সাধারণের থেকে আলাদা করে দিয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন তাঁর কর্মক্ষেত্রে সবচেয়ে জনপ্রিয় একজন মানুষ। তাঁর সাধারণত্বের মাঝেই খুঁজে পাওয়া যায় অসাধারণ ব্যক্তিত্ব।

মানুষটি হলেন সজীব সরকার-স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্ট্যাডিজ বিভাগের (জেসিএমএস) সহকারী অধ্যাপক। সীমাহীন গুণের কারণে শিক্ষার্থীদের মনে পরম শ্রদ্ধা ও ভক্তির জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। তবে সবসময় থেকেছেন প্রচার বিমুখ হয়ে।

অনেক অনুরোধের পর সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। আলাপ চলতে থাকে, বর্ণিত হতে থাকে তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকের কথা।

১৯৮৩ সালের ১৭ই অক্টোবর ময়মনসিংহে জন্মগ্রহণ করেন সজীব সরকার। পিতার চাকরি সূত্রে অনেক জায়গায় থাকা হলেও কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে তাঁর পৈর্তৃক নিবাস। দুই ভাই ও এক বোনের সাথে বেড়ে উঠেন ময়মনসিংহেই। ছোটবেলা থেকেই পড়ার প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন আগ্রহ। ছেলেবেলা থেকেই পড়তে খুব ভালোবাসতেন। এ আগ্রহ থেকেই তিনি নিজ শ্রেণিকক্ষ বাদ দিয়ে অন্য শ্রেণিকক্ষে বসে থাকতেন। তাই নিজের ক্লাসেই অনুপস্থিত থাকলেও অন্যদের ক্লাসে ঠিকই উপস্থিত থাকতেন তিনি। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন তিনি। ঝোঁক ছিল ইংরেজি সাহিত্যের দিকে। তবুও লেখালেখিতে তাঁর আগ্রহ দেখে বড় ভাইয়ের চাপে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়া। ছাত্রজীবন শেষে ২০০৮ সালে সমকাল পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু। এরপর কয়েকটি গণমাধ্যম পেরিয়ে ২০১৩ সালের মে মাসে স্টেট ইউনিভার্সিটির জেসিএমএস বিভাগের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরুন। অবশ্য তার আগে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটার্নেটিভ (ইউডা) এ কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা পেশায় বিশ্বাসী ছিলেন খুব। মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী নিয়ে এসইউবির জেসিএমএস বিভাগে কাজ শুরু করেন। তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে বর্তমানে এখানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর আনাগোনা।

‘শিক্ষকতায় কীভাবে আসলেন স্যার?” এমন প্রশ্নে সজীব সরকার বললেন, ‌’আমার এক বাংলা শিক্ষক ছিলেন। তাঁর মাধ্যমেই প্রথম শিক্ষকতায় আসা। তারপর আমি রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করি। পরে শ্রদ্ধেয় রোবায়েত ফেরদৌস স্যারের হাত ধরেই স্টেট ইউনিভার্সিটিতে আসা।’

সজীব সরকার বলেন, ‘শিক্ষকতার পেশা জীবনটাকে ভিন্নভাবে বোঝার সুযোগ করে দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন অফার আসলেও শিক্ষকতা ছেড়ে যাননি। যেতেও চান না। ক্লাস, পড়াশুনা, শিক্ষার্থী-এখন এটাই তাঁর জীবন, এখানেই ভাল লাগা।’

এ ভাল লাগার কারণে বিভাগ নিয়ে তাঁর দেখা স্বপ্নগুলো দিনে দিনে ডানা মেলেছে। তাঁর মতে, যা স্বপ্ন ছিলো তা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। তবে যেতে চান আরও অনেক দূর। উদ্দেশ্য, শিক্ষকের দর্শন যেন পূর্ণ হয়। যেন ছাত্রছাত্রীদের কর্মস্থলে গিয়ে নতুনভাবে শিখতে না হয়। বাস্তব শিক্ষাই যেন শিক্ষার্থীরা নিজেদের আলোকিত করে দেশ ও দশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

সজীব সরকার বলেন, শুধু বই পড়ে পরিপূর্ণ সাংবাদিকতা শেখা যায় না। কীভাবে একটি রিপোর্ট লিখতে হয়, সেটা জানতে হলে, করতে হবে চর্চা। তারপরও কিছু জিনিস তো হাতে কলমে শিখতে হয়। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিখানোর কৌশলে কিছুটা অভাব আছে বলে মনে করেন তিনি।

এ শিক্ষকতার জীবন তাঁকে কী দিয়েছে তার কোনো হিসেবে বসতে নারাজ সজীব সরকার। দিন শেষে তিনি বড় করে দেখেন শিক্ষার্থীদের প্রতি তাঁর স্নেহ ও মায়া মমতাকে। এ স্নেহই তাঁকে এনে দিয়েছে অগুণতি শিক্ষার্থীর ভালবাসা, শ্রদ্ধা ও পরম জনপ্রিয়তা।

জিজ্ঞেস করতেই সজীব সরকারের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা ঝড়ে পড়ল জাহিদ রাকিব নামের স্টেট ইউনিভার্সিটির জেসিএমএস বিভাগের এক শিক্ষার্থীর কণ্ঠে। বললেন, ‌’স্যার স্যারই। স্যারের তুলনা স্যার নিজেই। তিনি শুধু ভাল শিক্ষকই নন, ভাল মানুষও। স্যারের আত্মত্যাগী মনোভাব আমার খুব ভালো লাগে।’

আরেক শিক্ষার্থী বদরুন নাহার বলেন, ‘স্যারের অমায়িক আচরণ ও তাঁর শান্ত মেজাজ স্যারকে সবার থেকে আলাদা করে দিয়েছে। স্যার আমাদের সবার প্রিয়।’

শুধু শিক্ষার্থী নয়, সহকর্মীর মাঝেও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষটির নাম সজীব সরকার। সহকর্মী জেসিএমএস বিভাগের লেকচারার সাহস মোস্তাফিজ বলেন, ‘জঞ্জাল আর খারাপ মানুষে ভরা এই অসময়ে আমার কাছে সজীব স্যার একজন ‘মানুষ’। দুনিয়ায় মানুষ এখন বিরল। সজীব স্যার একজন সঞ্জীব, সৃষ্টিশীল ও নির্মোহ মানুষের প্রতীক। ভালো মানুষ হবো কোনো ট্রেনিং সেন্টার যদি সজীব স্যার খুলেন, আমি সেখানে প্রথম ছাত্র হতে চাই।’

একই বিভাগের লেকচারার নাসরিন আক্তার বলেন, ‘সজীব স্যার এমন একজন ব্যক্তি যিনি আমাদের এই ফ্যাকাল্টি রুমের সবার রোল মডেল। তার জ্ঞান, ধৈর্য, বিচক্ষণতা, মমতা আমাদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে এবং আমাদের সংকটের সময়ে সহায়ক হিসেবে কাজ করে। স্যার আমার দেখা অন্যতম ভালো মানুষদের একজন।’

শিক্ষার্থীরা জানালেন, এত চাপের মধ্যে সজীব সরকার শান্ত মেজাজে বিভাগের সব কাজ সুব্যবস্থাপনা করতে পারেন। এটিই অনেক গুণের মধ্যে তাঁর একটি স্বতন্ত্র গুণ।

এ গুণের রহস্য কি-জানতে চাইলে সজীব সরকার বলেন, ‌’আমি রাগী না যে, সেটা ঠিক না। আমিও রাগ প্রকাশ করি। ভার্সিটি আমার কর্মস্থল এটা আমার রাগ প্রকাশের জায়গা নয়। আর আমি সবসময়ই নিজের সম্মান ও ব্যক্তিত্ব ধরে রাখতে চেষ্টা করি। তাই সর্বদা শান্ত থাকার চেষ্টা করি। আর এটা অনেকদিনের অভ্যাস ও তাই সহজেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারি।’

জীবন ও কর্ম নিয়ে আলাপ শেষে প্রশ্ন ছিল সংসার নিয়ে। জানালেন, তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহানও একজন শিক্ষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের সহপাঠী ছিলেন তাঁরা। সেখানে পড়ার সময় পরিচয় হয় নুসরাত জাহানের সঙ্গে। দেখা থেকেই পরিণয়। তারপর মাস্টার্স শেষ করে ২০১০ সালের ১৭ই মার্চ বিয়ে। এখন তাঁদের সংসারে আছে ফুটফুটে সন্তান, নাম মুগ্ধ। সজীব সরকার বলেন, ‘বাড়ি ফিরে আমার দিনের সকল ক্লান্তি দূর হয়ে যায় স্ত্রী ও সন্তান মুগ্ধের মুখ দেখে।’

এসব আলাপের সময় পাশেই ছিলেন স্ত্রী ও সন্তান। সজীব সরকারের ব্যাপারে জানতে চাইলে স্ত্রী নুসরাত জাহান খুব কয়েক শব্দে বলে দিলেন সবকিছু, ‘বাবা ও স্বামী হিসেবে যথেষ্ঠ যত্নশীল ও অসাধারণ একজন মানুষ সজীব সরকার।’

বর্তমানের মাঝেই সজীব সরকার দেখেন ভবিষ্যতের পথ। তবু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে জানতে চাওয়া হয় তাঁর কাছে। উত্তরেই আবার মিলল তাঁর অসাধারণত্ব। তিনি বললেন, ‌’আমি ভবিষ্যতে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই। তবে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই, আমি যেন কখনও কারও জন্য কষ্টের কারণ না হয়ে উঠি।’

কমেন্টস