কোটার আধিপত্য জাতির মেধাবী সন্তানদের দেশসেবার সুযোগকে শূন্য করে দিচ্ছে

প্রকাশঃ জুলাই ৩০, ২০১৭

মো. আরিফুল ইসলাম-

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে প্রশাসনে পশ্চিম পাকিস্তানের কোটা ছিলো। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য দূর করার জন্য এবং নিজেরা মুক্ত হবার জন্য মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ সংগঠিত হলো। এখন আবার সেই বৈষম্য!

প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়েরা কোটার সুবিধা পাবে, সেটা মেনে নিলাম। কারণ মুক্তিযোদ্ধাদের বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনা করার দায়িত্ব তাদের হাতেই ন্যস্ত। কিন্তু নাতি-নাতনি কিংবা পরবর্তী প্রজন্ম যদি কোটার সুবিধা পায়, তাহলে সেটা অমানবিক হয়ে যায়। আর বর্তমানে বৈধ কোন মুক্তিযোদ্ধার ছেলে-মেয়ের চাকরির বয়স আছে বলে মনে হয় না।

স্কুলে ভর্তির সময় কোটা, কলেজে ভর্তির সময় কোটা, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা মেডিকেলে ভর্তির সময় কোটা, চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা, চাকরিতে পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটা, অবসরে যাওয়ার সময় কোটা! দেশের উন্নয়নে এটা কোনভাবেই কাম্য নয়। পাক ও আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিলো জাতিকে মেধাশূন্য করার জন্য। আজ কোটার আধিপত্য জাতির মেধাবী সন্তানদের দেশ সেবার সুযোগকে শূন্য করে দিচ্ছে আস্তে আস্তে।

কোটা ব্যবস্থা শুধু মুক্তিযুদ্ধের সনদকেই করেছে সোনার হরিণ, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের নয়। যারা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমাদের এই বাংলাদেশ এনে দিয়েছে, তাদের শুধুমাত্র একটি সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছি আমরা। মুক্তিযুদ্ধের সনদ একটি দেশের সূর্যসন্তানদের দলিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বাংলাদেশে এই দলিলের কোন মূল্য থাকতো না, যদি কোটা ব্যবস্থার কোন সুযোগ না থাকতো। নন কোটাধারীরা মুক্তিযুদ্ধের সনদকে ঘৃণা করছে, যা আল্টিমেটলি মুক্তিযোদ্ধাদের অবমাননা করার সমান। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে কোটার আধিপত্য মানে জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বিডিমর্নিংকে বলেন, “আমাদের প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগকে আবার দেশ সেবার সুযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। আমি মনে প্রাণে নৌকায় বিশ্বাসী। কিন্তু নির্বাচনের আগে চরম বৈষম্যমূলক কোটা প্রথার কোন বিহিত না করলে, আমি আর দেশ সেবার সুযোগ দিচ্ছি না। দরকার হলে ভোট দানে বিরত থাকবো। আমার মনে হয় লাখ লাখ তরুণ শিক্ষার্থী এই নীতিতে বিশ্বাসী।”

ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক ছাত্র ফারুক হোসেন জানান, ‘পড়ালেখা শেষ হয়েছে অনেক আগে। চাকরির অভাবে ঈদে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারি না। বাবা-মাকে কিছুই দিতে পারি নাই। ইতিমধ্যে ১ বার বিসিএস ভাইভা দিছি। একটা চাকরি খুব দরকার। অতিরিক্ত কোটার কারণে বিসিএসে হবার সম্ভাবনাও কম। তাই অন্যান্য চাকরিতে চেষ্টা করছি। সেখানেও কোটা।’

মাত্রাতিরিক্ত কোটা বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু অনুচ্ছেদকে অবমাননা করছে। যেমন, সংবিধানের ৩য় ভাগের ২৯ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে- “প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ কিংবা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকবে।” সেখানে কর্মকমিশন ৫৬% কোটাধারীদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে। ৩য় ভাগের ২৮(২) অংশে বলা আছে-“রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।” অনুচ্ছেদ ২৮(৪) অংশে বলা আছে- “নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা যাবে।” ২য় ভাগের ১৯ নং অনুচ্ছেদে বলা আছে– “রাষ্ট্র জাতীয় জীবনে সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিবে।”

সংবিধান লঙ্ঘের শাস্তির কথা আমরা প্রায়ই শুনে থাকি। এইক্ষেত্রে কি সংবিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে না? সংবিধান অটুট রাখতে- হয় চাকরিতে কোটা সংস্কার করা জরুরী, নাহয় সংবিধানের এই অনুচ্ছেদসমূহের সংস্কার জরুরি। কারণ সমান সুযোগ লাভ করা আমাদের সাংবিধানিক অধিকার।

দেশের লিডিং পজিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৫৬% কোটার ব্যবহার করা হচ্ছে। এই কোটার জয়জয়কারই মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের মানসিকভাবে দূর্বল করে দিচ্ছে। বিসিএসের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কোটার এই জয়জয়কার জাতির জন্য লজ্জাজনক ও পরিতাপের বিষয়।

Advertisement

কমেন্টস