বিডিয়ার ট্র্যাজিডি দিন যা ঘটেছিল দরবার হলে

প্রকাশঃ ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) দরবার হলে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘটে ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য হত্যাযজ্ঞের ঘটনা। বিডিআরের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম সিদ্দিকুর রহমান পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করে অনুষ্ঠান শুরু করলেও সেদিন দরবার হল পরিণত হয়েছিল বিডিআর ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য দিন। ঐ হত্যাযজ্ঞে দরবার হলে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন। 

তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯ টার পর দরবার হলে প্রবেশ করেন এবং এর পরপরই বক্তব্য দিতে আসেন। বক্তব্যে এক পর্যায়ে তিনি ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কার্যক্রম প্রসঙ্গ তোলেন। জানতে চাইলেন সবাই ডালভাতের দৈনিক ভাতা পাচ্ছে কিনা। কিন্তু সৈনিকদের জবাব জোরালো ছিল না। ডিজি তার বক্তব্যের এক অংশে ২০০৮ সালে সৈনিকদের শৃঙ্খলা ভালো ছিল না বলে মন্তব্য করেন। একথা বলার পরপরই সৈনিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

ডিজির বক্তব্যের এক পর্যায়ের ১৩ ব্যাটালিয়নের সিপাহী মাঈন অস্ত্রহাতে মঞ্চে উঠে ডিজির দিকে অস্ত্র তাক করেন। ডিজি শাকিলও পূর্ণ ব্যক্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকান। ডিজির চোখের দিকে তাকিয়ে সৈনিক মাঈন মঞ্চে অজ্ঞান হয়ে যায়। একই সময় মঞ্চে উঠে কাজল নামের আরেক সিপাহী। কিন্তু মাঈনকে পড়ে যেতে দেখে দরবার হলের আশপাশের জানালার কাঁচ ভেঙে লাফ দিয়ে বাইরে চলে গেলে শুরু হয় গোলাগুলি। দরবার হল মুহূর্তে ফাঁকা। প্রায় ৩ হাজার সৈনিক এবং জেসিও মুহূর্তের মধ্যে যে যেভাবে পেরেছে জানালা বা দরজা দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যায়।

ডিজি, ডিডিজি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাসহ ৪৫-৫০ জন দরবার হলে অবস্থান করে আলোচনা করতে থাকেন। ডিজি চেয়েছিলেন সবকিছু স্বাভাবিক করতে। সে সময় তিনি কর্মকর্তাদের বলেন, সবাইকে যেন আবার দরবার হলের ভিতর ডেকে আনা হয়, দরবার আবার শুরু হবে।

লাল সবুজ রঙের কাপড় দিয়ে নাক-মুখ বাঁধা বিডিআরের একদল সৈনিক দরবার হল ঘিরে সকাল ৯টা ৪০ মিনিটের দিকে দরবার হলের বাইরে গুলির করছে। সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের একটি পিকআপ রাস্তা দিয়ে দরবার হলের পাশের মাঠে এসে দাঁড়ায়। ততক্ষণে কাঁচ ভেঙে গুলি দরবার হলের ভিতর ঢুকছিল। কর্মকর্তারা আত্মরক্ষার্থে কেউ দেয়াল ঘেঁষে, কেউ পিলারের আড়ালে আশ্রয় নেন।

সকাল সাড়ে ১০টা। বিদ্রোহী সৈনিকরা চিৎকার করে কর্মকর্তাদের মঞ্চের ভিতর থেকে বের হতে বলে। তখন মঞ্চের নিচে ১৫-১৬ জন বিদ্রোহী কাপড়ে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে ছিল। ১০টা ৩১ মিনিটের পরপরই মঞ্চের পর্দার আড়ালে দক্ষিণ পাশে থাকা তিনজন নারী কর্মকর্তাসহ ২০-২৫ জন কর্মকর্তা হাত উঁচু করে বের হয়ে আসেন।

এক পর্যায়ে ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল কেন্দ্রীয় সুবেদার মেজর (এসএম) নুরুল ইসলামকে বলেন,  ‘সৈনিকদের এ রকম ক্ষোভ আছে আপনি তো কোনো দিন একবারও বলেননি!’

তারপর মঞ্চের সব আলো নিভিয়ে ফেলতে বলেন ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল। কর্নেল আনিস একটি লম্বা কাঠ দিয়ে সব বাল্ব ভেঙে ফেলেন। ডিজি মাইকে সবাইকে শান্ত হতে বলছিলেন। তিনি বলছিলেন, ‘তোমরা গুলি থামাও। তোমাদের সব দাবি মেনে নেয়া হবে।’

কিন্তু ঘড়ির কাঁটায়  যখন সকাল ১০টা ২০ মিনিট। সিপাহী সেলিম মাইকে কর্মকর্তাদের বেরিয়ে আসতে বলে। ডিজিসহ কয়েকজন কর্মকর্তা মঞ্চের পর্দার ভিতরে উত্তর দিকে ছিলেন। ডিজিকে কোনায় একটি চেয়ারে বসানো হলো। অন্যরা সবাই ডিজির গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। ডিজি শাকিল বললেন, ‘তোমরা মৃত্যুকে কেন ভয় পাচ্ছ? মরতে তো একদিন হবেই।’ কর্মকর্তারা বললেন, ‘স্যার, আপনার সেফটির দরকার আছে।’

দরবার হলের মঞ্চের পর্দার আড়ালে উত্তর দিকে ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ছিলেন। বিদ্রোহীরা হ্যান্ডমাইকে বলছিল, ‘ভিতরে কেউ থাকলে বের হয়ে আসেন। ’ একই সঙ্গে তারা মঞ্চের দিকে গুলি ছোড়ে। হঠাৎ মুখে কাপড় বাঁধা একজন সৈনিক অস্ত্রহাতে পর্দা সরিয়ে মঞ্চে ঢুকে চিৎকার করে বলে, ‘ভিতরে কেউ আছেন? সবাই বের হন।’

তখন কেউ একজন ডিজিকে বলেছিলেন, ‘স্যার, গাড়ি লাগানো আছে, আপনি চলে যান।’ ডিজি বলেন, ‘আমি কোথায় যাব? কেন যাব?’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢাকা সেক্টর কমান্ডার এবং ঢাকার অধিনায়কদের নিজ নিজ ইউনিটে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে তাদের মোটিভেট করতে বলেন। এর মধ্যে বিডিআরের কয়েকজন সৈনিক চারদিক থেকে দরবার হলের দিকে গুলি করতে থাকে। এসবের মধ্যে ডিজি একবার সেনাপ্রধান ও একবার র‌্যাবের ডিজির সঙ্গে কথা বলেন।

ডিজি মনে করেছিলেন কিছুক্ষণের মধ্যে সেনাবাহিনী ও র‌্যাব চলে আসবে।

কিন্তু লে. কর্নেল ইয়াসমিনও লক্ষ্য করেন, তখন ডিজি বিভিন্ন জায়গায় মোবাইল ফোনে সাহায্যের জন্য সেনাবাহিনী পাঠাতে অনুরোধ করছিলেন। ততক্ষণে অফিসার মেসে অফিসারদের গাড়িতে আগুন ধরাচ্ছিল সৈনিকেরা। বিডিআরের সব গেট ও অস্ত্রাগারের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে তারা। বিদ্রোহীরা প্রথমেই কর্মকর্তাদের সবার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। সবাইকে তারা মাটিতে শুয়ে পড়তে এবং র‌্যাঙ্ক খুলে ফেলতে বলে। কর্মকর্তারা দরবার হলের মেঝেতে শুয়ে পড়েন। তখন তাদের ওপর দরবার হলের ভিতরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে কিছুটা দূরে দাঁড়ানো মুখে কাপড় বাঁধা একজন বিডিআর সৈনিক তিন-চার রাউন্ড গুলি চালায়। লে. কর্নেল কায়সার ও অন্য দুজন কর্মকর্তা এতে গুলিবিদ্ধ হন।

Advertisement

কমেন্টস