নারীর যত কথা

প্রকাশঃ মার্চ ৮, ২০১৮

তামজিদ হোসেন।।

আজ ৮ মার্চ। আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পূর্বে এই দিনটাকে বলা হত আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। বিশ্বের এক এক জায়গায় একেক রকম ভাবে এইদিনটা উদযাপন করা হয়। কোনো কোনো জায়গায় এই দিবস পালন করা হয় নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য, কোথাও আবার নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপন এবং মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য পালন করা হয়ে থাকে। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ থেকে পালিত হওয়া দিবসটি বর্তমান নারী সমাজকে কতটুকু পরিবর্তন করলো সেটা জানার জন্য উপস্থিত হই ‘ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ’ এর নারী শিক্ষার্থীদের কাছে। জানার চেষ্টা করি তারা নারী হয়ে সমাজে কি কি ধরণের সমস্যায় পড়েন এবং তারা কেমন সমাজ চায়, আদৌ কি নারী অধিকার তারা পায়?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজতে আমরা ছুটে গিয়েছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের কাছে। তারা জানিয়েছেন তাদের নিজেদের কথা।

মেয়েদের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা বাড়াতে হবেঃ

আফিয়া তাবাসসুম (ইংরেজি বিভাগ)

আমি আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে কখনো কথার মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হইনি। তবে আমি যখন বেশ কিছুদিন ঢাকা ভার্সিটিতে ছিলাম তখন  কিছু কিছু সহপাঠীদের কাছ থেকে কথার মাধ্যমে আমি নির্যাতনের শিকার হয়েছি।কিন্তু আমাদের এই ক্যাম্পাসে আমি কখনো শিক্ষক বা সহপাঠীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার নির্যাতনের শিকার হয়নি। তবে আমি যখন পাবলিক যানবাহনে চলাচল করি তখন আমার যে পোষাক পড়া থাকে সেটা দেখে বাসের হেল্পপার, ড্রাইভার, এমনকি কিছু কিছু মায়ের বয়সী নারীরাও তারাও অনেক কিছু বলে থাকে। এমন অনেক মানুষ আছে যারা ভিড়ের মধ্যে গায়ে হাত দেয় কিন্তু ঐ সময় আমি এমন কাউকে খুঁজে পায়নি যে আমি একজনকে ধরে জিজ্ঞেস করবো কেন এমন করলো।

 

আর আমার পরিবারের কথা বলতে গেলে আমি পরিবার থেকে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়ে থাকি কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমাজের কথাগুলোকে তারা খুব মূল্যায়ন করে। যেমন, সমাজ কি ভাবছে তার মেয়েকে নিয়ে এগুলোর জন্য অনেক সময় উদারমনা পরিবারগুলাও একটু অন্যরকম হয়ে যায় সমাজের চাপে পড়ে। আর আমি চাই পুরুষের পাশাপাশি নারীদের জন্যও সমাজটা উন্মুক্ত হোক। কারণ পুরুষরা যেমন সমাজের একটা অংশ নারীরাও তেমন একটা অংশ।তাই একটা ছেলে যেমন নির্ভীগ্নে রাস্তাঘাটে চলাচল করে তেমনি সমাজের সকলের উচিত নারীরাও যাতে সেভাবে চলতে পারে সেই পথ সৃষ্টি করা।

আর আমি মেয়ে হয়ে মেয়েদের একটা কথা বলতে চাই যে, মেয়েদের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা বাড়াতে হবে কারণ, ছেলেরাও মানুষ আমরাও মানুষ কেউ কোনো অংশে ভিন্ন নয়। এক্ষেত্রে মেয়েরা যদি তার অধিকার আদায় করতে পারে সেটা হবে তার বড় পাওয়া।

নারী হয়ে নারীকে আগে সম্মান দিতে হবেঃ 

তাসনোভা ঐশী (মিডিয়া স্টাডিজ আন্ড জার্নালিজম বিভাগ)

আমি কখনো আমার সহপাঠী এবং আমাদের শিক্ষকদের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়নি। তবে কিছু কিছু শিক্ষক মেয়েদেরকে এড়িয়ে চলে। তারা ছেলেদেরকে বেশি প্রাধান্য দেয়। তবে বেশির ভাগ শিক্ষক মেয়েদের ক্ষেত্রে অনেক আন্তরিক বিশেষ করে আমাদের ভার্সিটির ক্ষেত্রে। তবে আমি যখন যানবাহনে চলাচল করি তখন শিক্ষিত অশিক্ষিত মিলিয়েই কিছু কিছু মানুষ ইচ্ছে করেই গায়ের উপরে পড়ে যায়, বা ধাক্কা দেয় এমনকি পিঠে হাত দেয়। আর এখনকার দিনের পরিবারগুলি অনেক সচেতন তবুও কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা মেয়েদের অধিকার কেড়ে নেয় । যেমন আমি যদি ভার্সিটি থেকে ভ্রমণ করতে যেতে চাই তখন পরিবারের লোকজন বাধাঁ দেয়। বলে মেয়ে মানুষ কেন ভ্রমণে যাবে আজকাল যুগ খারাপ। আর বাইরে থেকে যদি বাসায় ফিরতে রাত হলে তখন বাসায় সন্দেহ করে এবং অনেক সময় বকাবকি করে।

তবে আমি যেটা মনে করি মেয়েদেরও স্বাধীনতা দেয়া উচিত। সেটা হতে পারে চলাফেরার, মত প্রকাশের এবং হতে পারে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। আর আমি নারী হিসেবে একজন নারীকে বলবো যে নারীরা নারীর সেবায় এগিয়ে আসতে হবে এবং নারী হয়ে নারীকে আগে সম্মান দিতে হবে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হবে।

নারী বলে হার না মেনে কিছু করে দেখাও যে নারীরাও পারেঃ

ঈশরাত জাহান (বেচেলর অব বিজনেস এডমিনেস্ট্রশন)

আমি অনেক সময় আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছি তাদের কথার ইঙ্গিতের মাধ্যমে। তারা আমাদের পোষাক দেখে স্বাভাবিক কথার মন্তব্য করলেও বোঝা যায় যে তারা আমাকে বাজে ভাবে লক্ষ্য করছে। তখন তাদের কিছু বলা যায় না কারণ তখন মনে হয় যে তারা যদি আবার অন্য কিছু বলে কিনা। কিন্তু শিক্ষকদের কাছ থেকে আমি কখনো নির্যাতনের শিকার হয়নি। তবে আমি যখন রিকশা দিয়ে জ্যামে রাস্তা দিয়ে যাই তখন অনেক সময় অনেক ছেলেরা মটরবাইকে যাওয়ার সময় আমার গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সে সময় কিছু বলা যায় না।

 

আর পরিবারে ছোটবেলায় আমার কথার মূল্য দিত কিন্তু যখন আস্তে আস্তে বড় হতে থাকলাম তখন থেকে আমার মত নেয়া তো দূরের কথা আমাকে জিজ্ঞেসাই করা হয় না বরং আমি নিজে থেকেই বলি। আর আমি চাই নারীর কথাগুলো যেন মূল্যায়ন করে এমন সমাজ গড়ে উঠুক। আর নারী হিসেবে নারীকে বলবো নারী বলে হার না মেনে কিছু করে দেখাও যে নারীরাও পারে।

নারী মানুষ থেকে শুধু মানুষে পরিণত হওঃ 

মালিহা মেহজাবিন (কম্পিউটার সায়েন্স আন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ)

আমি ক্লাসে আমার সহপাঠীদের কাছ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়েছি। আমি যখন ক্লাসে টপ্স পড়ে আসি তখন আমার সহপাঠীরা বলে যে কেনো আমি টপ্সের সাথে ওড়না পড়ে আসি নাই। যেটা আমাকে খুব মানসিকভাবে আঘাত করে। আর শিক্ষকদের কথা বলতে গেলে আমাদের ভার্সিটিতে শিক্ষকরা মেয়েদেরকে একজন মানুষ হিসেবেই মনে করে। আমি কখনোই দেখি নাই যে তারা মেয়ে আর ছেলেকে পার্থক্য করেছে। আর যাতায়াতকালে যানবাহনে আমি যেটা ভুগছি যে আমার পড়া জামাকাপড় দেখে অনেকে অনেক ভাবে দেখে এবং অনেক সময় ভীড়ের মাঝে গায়ে হাত দিয়ে চলে যায়। কিছু কিছু মানুষের ধান্ধায় থাকে যে কিভাবে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া যায়। যার কারণে রাস্তায় চলাচলের সময় নিজেকে নিরাপদ মনে করা যায় না। আর আমাদের সমাজে পরিবারে এখনো মেয়েদের মত প্রকাশের স্বাধীনতাটা ঠিকভাবে দেয়া হয়না। যেমন আমি আমার পরিবারের অনেক বিষয়তে মত দিতে পারিনা।

তাই আমি এমন একটা সমাজ চাই যেখানে একজন পুরুষ যেভাবে মুক্ত ভাবে চিন্তা করতে এবং চলতে পারে তেমনি মেয়েরাও যেন সেভাবে চলতে পারে। নারীরা একা চলতে যেন কোনো দ্বিধায় না পড়ে এমন সমাজ চাই। আর নারীদেরকে বলবো নিজেকে নারী না ভেবে একজন মানুষ ভাবতে শিখো। নারী মানুষ থেকে শুধু মানুষে পরিণত হও।

কমেন্টস