‘টাকা গুনে শেষ করতে পারি নাই’

প্রকাশঃ জানুয়ারি ২৩, ২০১৮

মেরিনা মিতু।।

‘বিশ্বাস করবেন না আসলে, আমি সেদিন টাকা গুনে শেষ করতে পারছিলাম না। কারণ জীবনের প্রথম আমি এত্তোগুলা টাকা পেয়েছি যা আমার কাছে অবিশ্বাস্য ছিলো। নিজের প্রথম উপার্জনের টাকা বলে কথা। পুরোটায় আম্মার হাতে তুলে দিয়েছিলাম’।

এভাবে বাণিজ্য মেলায় খন্ডকালীন চাকরির মাধ্যমে প্রাপ্ত নিজের প্রথম উপার্জনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বাংলা কলেজের ছাত্রী শখ।

বাংলা কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শখ। বয়স ২১ এ পড়েছে কেবল। সুন্দর গড়ানের উদ্যমী এই তরুণীর দেখা মেলেছে ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার ওয়ালটনের প্যাভিলিয়নে। ক্রেতাদের দক্ষতার সাথে ঘুরে ঘুরে দেখাচ্ছিলেন সব, জানাচ্ছিলেন পণ্যের গুনাগুন ও মান সম্পর্কে। কাছে যেতেই হাসিমুখ করে বললেন, আপু কোনোভাবে হেল্প করতে পারি? যখন জানতে পারলো তার ইন্টার্ভিউ নিতে এসেছি, তখন তড়িঘড়ি করে নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছিলেন। সাথের ফটোগ্রাফারকে বলছিলেন, ‘আমার সুন্দর দেখে একটা ছবি নিয়েন, আমার আম্মা দেখলে খুব খুশি হবে। আমারে দেখায় নিয়েন কি ছবি তুলছেন’।

যত্নের সহিত ছবি তোলার পর হাসি হাসি মুখ করে প্রশ্নের আগেই উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি, জানাচ্ছিলেন নিজের সম্পর্কে।

‘আমি আসলে একটা স্কুটি কিনতে চাই। পাবলিক ট্রান্সপোর্টের প্রতি এতো বেশি ফেডআপ হয়ে গেছি যে নিজের পার্সোনাল একটি গাড়ি থাকা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। এই ধরেন যে একমাসে আমি এখান থেকে পাবো বেসিক ৩০ ধরে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মতো। আগে বিভিন্ন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে কাজ করে আরও কিছু টাকা অলরেডি জমায় রাখছি। এখান থেকে যা পাবো সব মিলিয়ে একটা স্কুটি কিনে ফেলবো আর কি’।

মেলা শুধু বাহারি পণ্যের কেনা-বেচার আর শহরের মানুষের পরিশ্রান্ত হওয়ার গল্প বলে না। মেলা একইসাথে কিছু মানুষের জীবনের অন্যতম সব সেরা গল্পের ধারক। কিছু পরিবারের সহনীয়তার গল্প বলে, কিছু স্বপ্নের বাস্তবায়নের গল্প বলে। কারোর প্রথম উপার্জনের সাথে চোখের পানির সংমিশ্রণের গল্প বলে। আবার কারোর জীবনের মানসিক বিপর্জয়ের অন্যতম দাগ কেটে যাওয়া গল্পের সাক্ষী হয়ে থাকে।

শুধু শখ না। খন্ডকালীন এই চাকরিকে প্রথম প্রেমের মতোই জীবনের একটা অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেন এমন আরও চারজন তরুণীর সাথে আমাদের পরিচয় হওয়ার সুযোগ হয়েছে।

রিগ্যাল প্যাভিলিয়নের কর্মী হিসেবে কার্যরত তাইয়্যাবুননেসা লিয়া। এবার নিয়ে বাণিজ্য মেলায় তার দ্বিতীয়বারের মতো কাজ করতে আসা। জীবনের প্রথম উপার্জনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পরে মায়ের কাছেই বড় হই। ছোট থেকে মনে মনে ভাবতাম যেভাবেই হোক নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আর এতো অল্প বয়সে আমার প্রথম উপার্জন করার সুযোগ করে দেয় বাণিজ্য মেল। আমার নিজের প্রথম উপার্জন ছিলো একুশ হাজার নয়শো একাশি টাকা। পুরো টাকা টা আমার মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলাম আমি যে মুহুর্ত এখনো পর্যন্ত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহুর্ত’।

মেলায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করার ক্ষেত্রে পরিবার থেকে বা অন্য কোনো ভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় কিনা সেই প্রশ্নের জবাবে মিরপুর গার্লস কলেজের ছাত্রী তাহমিনা আক্তার সিমি জানান, পরিবার থেকে সে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়ে থাকেন, আর যতো রাতই হোক তাদেরকে গাড়িতে করে পৌছে দিয়ে আসা হয় তাই তেমন কোনো সমস্যা হয়না।

মেলা চলাকালীন নির্ধারিত একমাস বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা পড়াশোনা কিভাবে চালিয়ে যান জিজ্ঞেস করায় শেখ ফজিলুতুন্নেছা মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী কাজল বলেন, ‘আমরা তো জাতীয়তে পড়ি, তাই একমাস না গেলেও তেমন কোনো সমস্যা হয়না’।

শিক্ষার্থীদের সুযোগ করে দেয়ার প্রসঙ্গে প্রাণ-আর এফ এল গ্রুপের বিপণন বিভাগের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘যারা পড়াশোনার পাশাপাশি খন্ডকালীন কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য বাণিজ্য মেলাকে বলা হয় খন্ডকালীন চাকরীর তীর্থস্থান। মেলায় কাজ করতে এসে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে উপস্থিত বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতার বিকাশ ঘটে। পাশাপাশি তাদের মধ্যে যোগাযোগের নতুন মাত্রা যোগ হয়’।

উল্লেখ্য, গত ১ জানুয়ারি থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত হচ্ছে ২৩তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। মেলা উপলক্ষে রাজধানীর শেরেবাংলানগরের মেলা প্রাঙ্গণ সেজেছে অপরূপ সাজে। যেখানে এতদিন ছিল বিরান ভূমি, এখন সেখানে দৃষ্টিনন্দন স্টল এবং প্যাভিলিয়নে। রাজধানীবাসী সহ ঢাকার বাহির থেকেও মানুষ এই মেলায় অংশগ্রহন করছেন।

কমেন্টস