৩ বার নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়ে গাইবান্ধার সেরা পিংকি রানী

প্রকাশঃ জানুয়ারি ১৪, ২০১৮

বিডিমর্নিং নারী ডেস্কঃ

গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলায় বাল্যবিয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দিনমজুরের সন্তান পিংকি রানী বর্মণ কৃষ্ণা উপজেলার সেরা জয়িতা হয়েছেন।দ্বাদশ শ্রেণির এই ছাত্রী এ পর্যন্ত তিনবার নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকিয়েছেন।

বিগত সাত বছরে তিনবার বাল্যবিয়েমুক্ত উপজেলা ঘোষণা করা হয়েছে গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলাকে। কিন্তু এরপরও বাল্যবিয়ে বন্ধ হয়নি। প্রশাসনের নজরদারি উপেক্ষা করে গোপনে বাল্যবিয়ে হতো। আর এই গোপনীয়তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে ১৭ বছর বয়সী পিংকি রানী বর্মণ।

পিংকি অংশ নিয়েছেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে বাল্যবিয়ে নিরোধ কর্মশালায়। সাদুল্যাপুর উপজেলার কামারপাড়া মহাবিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির মানবিক বিভাগের ছাত্রী পিংকি রানী বর্মণ কৃষ্ণাকে নিয়ে গর্ব করেন তার শিক্ষকরাও। ওই মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মশিউর রহমান রূপম জানান, লেখাপড়ায় অত্যন্ত মনোযোগী পিংকি রানী বর্মণ কৃষ্ণা কলেজের সেরা ছাত্রী। জেএসসি এবং এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া পিংকি এইচএসসিতেও জিপিএ ৫ পাবেন বলে আশাবাদী কলেজের সবাই।

উপজেলার কামারপাড়া ইউনিয়নের পশ্চিম কেশালীডাঙ্গা গ্রামের দিনমজুর রতন চন্দ্র বর্মণের মেয়ে পিংকি রানী বর্মণ। দুই বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় পিংকি। ছোটবেলা থেকেই নানা কষ্টে বেড়ে ওঠা পিংকি ছাত্রী জীবনের শুরু থেকেই মেধাবী। ধারাবাহিকভাবে সে পঞ্চম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি এবং এসএসসিতে অত্যন্ত ভালো ফল করেছে।

পিংকির বাবা রতন চন্দ্র বর্মণ বলেন, তারা দরিদ্র পরিবারের মানুষ। তাই মেয়ের বিয়ে হলে তিনি একটি বড় বোঝা থেকে রক্ষা পাবেন। সে জন্য দেরি না করে দ্রুতই মেয়ের (পিংকির) বিয়ে দিতে চান। মা কণিকা রানী বর্মণ বলেন, আমরা গরিব মানুষ। কেউ আমাদের খবর রাখে না। চারপাশে যে রকম দেখছি তাতে মেয়ের বিয়ে দেওয়াই ভালো। ঘরে আরেকটি মেয়ে আছে। সেও বড় হচ্ছে।

কলেজে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষে অধ্যয়নের সময় ২০১৬ সালের শেষের দিকে আবারও বিয়ে ঠিক করা হয় পিংকির। এবার সহপাঠী এবং কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক শহীদুল ইসলামের মাধ্যমে পরিবারকে বুঝিয়ে দ্বিতীয় দফায় নিজের বাল্যবিয়ে ঠেকান পিংকি।

সর্বশেষ দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নের সময় গেল জুনে তৃতীয় দফায় পিংকির বিয়ে ঠিকঠাক করা হয়। এবার নিজ কলেজের অধ্যক্ষের শরণাপন্ন হন পিংকি। অধ্যক্ষ মশিউর রহমান রূপম পিংকির বাবাসহ তার নিকটাত্মীয়দের বুঝিয়ে আবার তার বাল্যবিয়ে বন্ধ করেন।

দারিদ্র্য আর নিরক্ষরতার কারণে পরিবার থেকে বারবার বিয়ের চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে পিংকি জানান। তাকে মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে হয়। পরিবারের ধারণা আমি বড় হয়েছি। যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে। এতে পরিবারের মানসম্মান যাবে। তাই পরিবারের লোকজন লেখাপড়া না করিয়ে বিয়ের দিকেই বেশি ঝুঁকেছে।

পিংকি বলেন, তার ইচ্ছা লেখাপড়া শেষ করে শিক্ষকতা পেশায় নাম লেখানো। তাকে দেখে সমাজের আরও মানুষের যাতে চোখ খুলে যায়। কিন্তু এই ইচ্ছা পূরণে বড় বাধা তার নিরক্ষর পরিবার। তাই সব কিছু উপেক্ষা করে মাঝেমাঝে টিউশনি আর হাঁস-মুরগি পালন করে জমানো টাকা দিয়ে সে নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রহিমা খাতুন বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেধাবী ছাত্রী পিংকি রানী বর্মণ কৃষ্ণাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

কমেন্টস