প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সকল ঘটনা
আবারো বাসে নারীদের জামা কাটা; ‘চক্রের আভাস’ 

প্রকাশঃ নভেম্বর ১৬, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

মায়ের কোল থেকে বাসের সিট, কোথাও আজ নারীরা নিরাপদ নয়। চাপা ভয় আর আতঙ্ক ভুক্তভোগী থেকে পরিবার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে খানিক খটকা থাকলেও এখন বেশ আতঙ্কের সাথে সবার কাছে পরিচিত ‘রাজধানীতে বাসে নারীদের জামা কাটা’ এই বিষয়টি।

আজ বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর), মিরপুরের টেকনিক্যাল রোডের কাছাকাছি আবারো বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষের দ্বারা জামা কাটার স্বীকার হয় এক ভদ্রমহিলা। যদিও তিনি তা টের পেয়েছেন বাস থেকে নামার পরেই, যার ফলে অপরাধীকে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

ঘটনাটির সূত্রপাত একজন ভদ্র মহিলার অস্বাভাবিকভাবে হাঁটার ভঙ্গি থেকে। আজ দুপুর প্রায় ২.৩০ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে একজন ভদ্রমহিলাকে লক্ষ করি, যিনি খুব অস্বস্থির সাথে ওড়না জড়িয়ে খুব দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতেছেন। আর বারবার ওড়না সামলাচ্ছেন। কাছে গিয়ে কোনো সমস্যায় আছেন কিনা জিজ্ঞেস করায়, একইসাথে উবার ডেকে দিয়ে সাহায্য করার সুবাধে তিনি তার ফোন নাম্বারটি আমাকে দেন। পরবর্তীতে তিনি ফোনের মাধ্যমে পুরো ব্যাপারটি জানান।

রেহানা বানুর পাঠানো ছবি

ভদ্র মহিলা গাবতলী থেকে একটি বাসে করে মিরপুর টেকনিক্যাল মোড়ে নামেন। সালোয়ার-কামিজ পড়া, একিসাথে মাথায় হিজাব পড়া। বাস থেকে নামার পরপর তিনি এই অদ্ভুত আর নোংরা পরিস্থিতিতে পড়েন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘বাস থেকে নামার পর আমি ঝিগাতলার লেগুনায় উঠার জন্য হাঁটতে থাকি, হঠাত করেই মনে হচ্ছিলো সবাই যেনো আমার দিকে অদ্ভুতভাবে তাকাচ্ছে। মাথায় কাপড় আর তলে দিয়া ফাঁকা, মাইয়ামাইনষের জন্য দুনিয়াডা নষ্ট.. এধরণের কিছু কথা কানে আসার পরপর আমি বেশখানিক সময়পর টের পাই আমার পিছনের জামা তিনজায়গায় কাঁটা। শরীরের ভাঁজে যেটা খানিক ডিজাইন মনে হচ্ছিলো।

রাজধানীতে ঘটে যাওয়া একের পর এক অসুস্থ মানসিকতার মানুষের বিকৃত কাজের পিছনে কারা জড়িত? তারা কি সবাই দলবদ্ধ? নাকি ছন্নছাড়া? এমন অনেক প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর কারো জানা নেই। বিপদে রয়েছে বাসগামী নারীরা।

প্রসঙ্গত, গত ৬ নভেম্বর রাত সাড়ে আটটায়, একজন মধ্যবয়সী পুরুষ হাতেনাতে ধরা পড়ে এক নারীর জামা কেটে দেয়ার সময়। ঘটনাটি মিরপুরের টেকনিক্যাল রোডের কাছে বিহঙ্গ বাসের লাবণী নামক একজন নারী যাত্রীর সাথে। বাসযাত্রী ও আশেপাশের মানুষের সহযোগিতায় গণপিটুনীর পর লোকটিকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উইমেন সাপোর্ট ও ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে যৌন হয়রানি, বেশ অনেকদিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে গঞ্জনা শুনা যায়, তবে পুলিশের কাছে লিখিত কোনো অভিযোগ নেই। তবে এবার বিষয়টিকে গুরত্বের সাথে দেখা হবে’।

এক নজরে এ পর্যন্ত জামা কাটা নিয়ে প্রকাশিত-অপ্রকাশিত সকল ঘটনা-

গত আগস্ট থেকে একটি অদ্ভুত অভিযোগ এবং নারীদের যৌন হয়রানির একটি নতুন পন্থার আবির্ভাব  সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা আমরা সকলেই কম বেশি পরিচিত। আর তা হলো, বাসে নারীদের জামা কেটে দেয়া। কিছু বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ, নিঃসন্দেহে পুরুষরা এই অপরাধের সাথে জড়িত। এখনপর্যন্ত বেশ কিছু ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। তার বাইরেও বেশ অনেক ঘটনা ঘটে গিয়েছে যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়নি। ইতিমধ্যে গত ৬ নভেম্বর, মিরপুর থেকে একজন অপরাধীকে হাতেনাতে ধরা হয়। তারপরে যদিও ‘নারীদের জামা কাঁটার’ বিষয়টি শিথিল হয়েছিলো। তবে এরপরে ১০ দিনের মধ্যে ঘটে গেছে আরো দুটি নতুন ঘটনা।

ইস্ট ওয়েস্টের ছাত্রীর প্রকাশিত ছবি

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী- ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর জামা ও পাজামা দুটোই কেটে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। সামাজিক মাধ্যমে ওই তরুণী লিখেছেন, ভার্সিটি থেকে বাসায় আসার সময় রামপুরা থেকে বাসে উঠি আমি আর আমার বন্ধু। আমার দুই সিটে আমি একা। বাসের সিটটা একটু নড়াচড়া করছিল। ব্রেক করলে সিটটা সামনে চলে যাচ্ছিল। হতেই পারে পাবলিক বাস। পিঠের সিট আর বসার সিটের জয়েন্ট দুইয়ের মাঝে ফাঁক হয়ে যাচ্ছিল বারবার। হঠাৎ মনে হলো ওই ফাঁক দিয়ে পেছনের লোকটা হাত দেয়ার চেষ্টা করছে। বুঝতে পেরে আমি পিছনে লোকটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, বয়স ৪৫ এর বেশি হবে। আমার তাকানো দেখে সে কিছুই বুঝলো না ভাব। আমি সরে পাশের সিটে গিয়ে বসলাম। বাস থেকে নামার পর আমার ফ্রেন্ড জানতে চায় আমার জামা ছিঁড়লো কেমনে? তখন দেখি এ অবস্থা! তখন বুঝলাম ঘটনাটি ঘটেছে ওই সময়ই তাহলে! ভেবে পাইনা কি পাইলো এটা করে, কেন করলো? তারপর ভাবলাম পায়জামাটা দেখি তো, তখন হাত দিয়ে দেখি পায়জামাও কাটা। এত কিছু কখন কেমনে করলো, আমি কিচ্ছু টের পেলাম না। হাত পা কাঁপা শুরু হয়ে গেছে।

চৈতির পাঠানো ছবি

ভিক্টিম শারমিন চৈতি-  ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতির ছাত্রী শারমিন চৈতী্ এরকম ঘটনার স্বীকার হয়ে ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘গতকাল (২৯/১০/২০১৭) আমি আর আমার বান্ধবী মিরপুর লিংকে আজিমপুর থেকে যাওয়ার সময় বাসে এক মধ্য বয়স্ক লোক আমাদের পিছের সিটে বসে।লোকটি কিছুক্ষন পর সিটর নীচ দিয়ে আমকে খোচাচ্ছিল। আমি বুঝতে পেরে লোকটিকে হাত সরিয়ে ঠিক ভাবে বসতে বলেছি। তখন লোকটি এমন ভাব করছিল সে কিছুই জানে না। তারপর লোকটি হাত সরিয়ে নেয়। তাই আমি আর কিছু বলিনি।এরপর আমরা যখন ল্যাব এইড নামি একটা অপরিচিত মেয়ে এসে আমাকে বলে আপনার তো জামা পছনে কাটা। আমি তো অবাক জামা কেন কাটা হবে। সাথে আমার বান্ধবী র টাও সামান্য কাটা। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না কি হল ব্যাপারটা। ততক্ষণে লোকটিও বাস থেকে নেমে চলে গেছে।তারপর অসহায়ের মত বাসায় ফিরতে হলো’।

ভিক্টিম লাবণীর প্রকাশিত ছবি

ভিক্টিম লাবণী-  গত ৬ নভেম্বর, মিরপুর-১ বাসস্ট্যান্ডে মিং বিউটি পার্লারের সামনের সড়ক। ধানমন্ডি যাওয়ার জন্য বিহঙ্গ পরিবহনে উঠেছিলেন জান্নাতুল লাবণী। তার পেছনের সিটে বসেন মাঝবয়সী এক ভদ্রলোক। বাস কিছুদূর যাওয়ার পর লাবণী অনুভব করলেন তার জামা ধরে কেউ টানছে। নড়েচড়ে আবার ঠিক হয়ে বসলেন তিনি। টেকনিক্যাল মোড়ে পৌঁছার পর লাবণী সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে জামায় হাত বুলান। বুঝতে পারেন তার জামা কেউ কেটে দিয়েছে। পেছনে তাকাতেই এক লোক বাস থেকে নামার জন্য দৌড় দেন। লাবণী তার শার্টের কলার ধরার চেষ্টা করেন। পরে লোকজনের সহায়তায় তাকে ধরে আসাদ গেটে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে লাবণী তার স্বামীকে সেখানে আসতে বলেন। ওই ভদ্রলোকের মানিব্যাগ থেকে জামার কাটা অংশ উদ্ধার করা হয়। বাসযাত্রীদের সহায়তায় ওই লোককে পুলিশের হাতে তুলে দেন তারা।

ভিক্টিম রেহানা বানু-  আজ বৃহস্পতিবার মিরপুরের টেকনিক্যাল রোডে আবারো বাসে এক নারীর জামা কেটে দেয়া হয়। যিনি গাবতলী থেকে বাসে করে ফিরছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক তরুণী জানান, একদিন সন্ধ্যায় নিউ মার্কেট থেকে বাসায় ফিরতে ঠিকানা বাসে করে দুই বান্ধবী শনির আখড়ায় নামেন। বাস থেকে নেমে দেখতে পান তার বান্ধবীর জামা সেমিজসহ বক্স করে কাটা। এ সময় তার বান্ধবী ওড়না দিয়ে কাটা অংশ ঢেকে ফেলেন। এরপর যখন তিনি তার বান্ধবীর সামনে দিয়ে হাঁটা শুরু করেন তখন দেখা যায় তার নিজের জামাও একইভাবে কাটা।

ভিক্টিম রিতীকার পাঠানো ছবি

ভিক্টিম রিতীকা-  গত ১১ নভেম্বর বন্ধুদের সাথে ময়নট ঘাট যাওয়ার উদ্দেশ্যে দোহারগামী বাসে উঠেন রিতীকা আক্তার। বাস থেকে নামার বেশ সময় যাওয়ার পর বন্ধুদের নজরে আসে তার জামাটি পিছন থেকে ছেঁড়া। কিন্তু ভালো করে দেখার পর তারা বুঝতে পারে সেটি ছেঁড়া না, খুব নিপুণভাবে কাঁটা। তখন রিতীকার হঠাত মনে পড়ে বাসে থাকাকালীন তার জামায় বারবার টান লাগতেছিলো, কিন্তু সে টের পায়নি আর বুঝতেও পারেনি।

এক নারী সাংবাদিক সামাজিক মাধ্যমে এ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, একদিন বসুন্ধরার গেটে বাস থেকে নামলাম, দেখি আমার সামনে এক মেয়ে খুব বিব্রত হয়ে রিকশা খুঁজছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি তার সাদা জামা ব্লেড কিংবা এন্টিকাটার জাতীয় ধারালো অস্ত্র দিয়ে অনেক জায়গায় কেটে দেয়া। সেজন্য মেয়েটি এত বিব্রতবোধ করছে। ঠিক তার পাঁচদিন পরে আমি অফিস থেকে ফিরছি, পরনে ছিল শাড়ি। পেছনের সিট থেকে কেউ আমার কোমরে হালকা স্পর্শ করছিল। আমি কয়েকবার হাত দিয়ে সরিয়ে দিলাম। ভেবেছিলাম পেছনের ভদ্রলোক পা তুলে বসেছে তাই তার পায়ের নখ সিটের ফাঁক দিয়ে আমার কোমরে লাগছে। কিন্তু না, বাসায় ফিরে দেখি আমার শাড়ির ১০ থেকে ১২ জায়গায় ব্লেড দিয়ে কেটে দেয়া।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের চাষাড়ায় রিকশা আরোহী এক তরুণীর জামা কাটার উদ্দেশ্যে তাকে পেছন থেকে ব্লেড দিয়ে আক্রমণ করে দুর্বৃত্তরা। এতে ওই তরুণীর শরীরের একটি বড় অংশ কেটে যায়। তাকে হাসপাতালে গিয়ে সেলাই নিতে হয়। এই ঘটনার দুইদিন পর একই স্থানে অপর এক তরুণী একইভাবে আক্রান্ত হন। তবে সেখানকার পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি।

উপরের সকল ঘটনা বিশ্লেষন করলে মিরপুর রোডের বাসের কথা একাধিকাবার উঠে এসেছে। যদিও মিরপুর রোড থেকেই একজন অপরাধীকে আটক করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই অপরাধের সাথে একজন না, একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র জড়িত। রাজধানী জুড়েই এখন তা নারীদের জন্য একোটি আতঙ্কের বিষয়। তবে  কারা তারা? তারা কি একটি নির্দিষ্ট চক্র? কি উদ্দেশ্যে তারা এসব করে থাকেন? এসব প্রশ্নের উত্তর এবং গ্রেফতারকৃত আসামীকে নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশ আর ঘটে যাওয়া ঘটনা ও ভোগান্তির স্বীকার নারীদের সাথে কথা বলে এর পেছনের রহস্য তুলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে বিডিমর্নিং।

কমেন্টস