কতিপয় পুরুষের প্রতিশব্দ যখন ‘ধর্ষক’

প্রকাশঃ আগস্ট ৩১, ২০১৭

মেরিনা মিতু।।

কোনটা বাবা? কোনটা ভাই? কোনটা বন্ধু? কোনটা প্রেমিক? কোনটা নিরাপত্তা কর্মী? কোনটা সকল মুসলিম ভাই ভাই সেই মন্ত্রের আপনজন? কোনটা দেবী দুর্গার পূজারী? তাদের মধ্যে ধর্ষক কোনটা? অনেক মন কষাকষির পরও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারলাম না। বারবার মাথায়-মনে তনু রিশা পুজা মাহিমা পূজা নার্গিস সীমা… এদের কথা উথাল পাতাল তুলে দিচ্ছে। 

সমাজের অসংগতি নিয়ে ট্রমার মধ্যে কাটানোর অভ্যাস আমার ছোট থেকেই। রুপার সাথে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার পর মাথায় কিছু প্রশ্ন ঘুরছে। ধর্ষণের পর একজন ধর্ষকের সাইকোলজি কি থাকে? খানিক মুহুর্ত আগে যে শরীরের উপর লুটোপুটি খেয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিলো , খানিক বাদে সে শরীরের অস্তিত্ব মুছে দিতে মেরে ফেলাটাও বোধহয় তাদের সাইকোলজির বড় একটা অংশ।আচ্ছা সে মুহুর্তে রুপাদের মনে কি চলে? শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকে আগত যে রুপার চোখে একজন মানুষ গড়ার কারিগর হওয়ার স্বপ্ন, সে চোখে এ কোন শ্রেণির মানুষদের দেখতে পায় সে! ভয়ার্তক দানবের নিঃশ্বাস যখন তার গায়ে লেপ্টে পড়ছিলো তখন তার পা দুটো হয়তো কেঁপে উঠেছিলো। তার কি তার নরম বিছানার কথা মনে পড়ছিলো? যেখানে সে তার রাজ্যের রাণী ছিলো? আজ বাসের পিছনের সিটটাতে কেমন কোণঠাসা হয়েছিলো!

আচ্ছা রুপার চরিত্রে কি সেদিন আমিও হতে পারতাম না? অফিস থেকে তো প্রায় প্রায় দশটা এগারোটায় বাড়ির দিকে যেতে হয়। লেগুনায়, বাসে কতো কামুক চোখ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারাও কি সুযোগের অপেক্ষায় থাকে আমায় কোণঠাসায় ফেলার জন্য! আমার ছোট বোন টা আজ বড় হয়ে গেছে, সন্ধাবেলার কোচিং এ একাই যাওয়া আসা করে। তাকে গড়ার কারিগর তার শিক্ষকের কামুকতা হঠাত জেগে উঠবে নাতো? আমার ছোট বোনটা তখন কি করবে?

এরকম হাজারো প্রশ্ন নিয়ে মানসিক ভাবে কেমন অসুস্থতা বোধ করি আজকাল। গণধর্ষণ যেনো জাতীয় রোগে পরিণত হয়ে গেছে। পুরুষ মানেই আজ যেনো একটি অনিরাপদ অবস্থান ।

সকালে চায়ের সাথে খবরের কাগজে নিয়মিত ধর্ষণের খবর পড়ে মেয়েকে জোরগলায় শাসিয়ে দেয় অসময়ে বাইরে ঘুরাফিরা করবেনা এখন থেকে, চায়ে চুমুক দিয়েই বাবা গৃহকর্মীর ঘরে ঢুকে পড়ে,  রক্ষাকবজ ভাই তার বোনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিয়ে চা স্টলে গলা মিলায় উত্যক্তকারীদের সাথে।

মজার বিষয়, আজও কারো তেমন ভ্রূক্ষেপ নেই। মাইল দূরে ঘটে যাওয়া ধর্ষণের স্বীকার বস্তুটি আমার ঘরের কোনো বস্তু নয়, সেই ভাবনায় মত্ব পুরুষেরা চিন্তাহীন ভাবে কাজে যায়। তাই হয়তো আজ রাজধানীর রামপুরায় স্বামীর অফিসে থাকার সুযোগ নিয়ে গণধর্ষণ হয় গৃহবধু।

অপরাধ টা কার? ধর্ষকের! নাকি ধর্ষিতার পোশাকে, চলনে! তাই যদি হয় তাহলে নিশ্চয় তনুর কথা আপনাদের মনে আছে? ধর্মীয় পর্দা, মেয়ের পোশাক, মেয়ের চলন… এগুলোকে মূখ্য করে ধর্ষককে আড়াল করার মতো চিন্তাভাবনা একজন ধর্ষকেরই হতে পারে কেবল। কথায় আছে, ‘ছেলের চোখে পর্দা দিয়ে দিন, তবে মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে কপালে ভাঁজ পড়বে না’।

তবে ‘থার্ড ওয়েব’ ফেমিনিস্টদের একটি বদনাম আছে। তারা সমস্যাটি সব পুরুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে শ্লোগান দেয়। এটি বদনাম এ কারণে যে পুরুষ যতোটা অনিরাপদ ঠিক ততোটাই রক্ষাকবজও বটে। এইতো গেলোবার বাসে এক অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুরুষের বিপক্ষে আরেক পুরুষ স্বর তুলে ন্যায়ের জায়গাটা ভারি করেছেন।

যেদিন আমাদের সম্ভব হবে ‘অন্যায়কে অন্যায় বলে স্বীকৃতি দেয়ার, অপরাধকে পুরুষ বা নারী  আলাদা আলাদা অবস্থায় বিবেচনা না করে কেবল অপরাধীকে অপরাধী বলে সম্বোধন করার, পুলিশ তার ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত থাকবে, বিচারক তার রায়ে অটল থাকবে সেদিনই কেবল আমি আর আমরা নারী আর পুরুষ হতে মানুষ হতে পারবো’।

কমেন্টস