উপযুক্ত সময়ের পূর্বেই কন্যা সন্তানের জন্ম হলো নির্যাতিত সেই শেফালীর

প্রকাশঃ আগস্ট ১০, ২০১৭

মহিনুল ইসলাম সুজন, নীলফামারী প্রতিনিধি-                                                                

রংপুর বিভাগের নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার খালিশা চাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর কোলনঝাড় গ্রামে গরু চুরির মিথ্যা অভিযোগে গাছে বেধে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ শেফালী বেগম (৩২) কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

সোমবার সন্ধ্যার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার সন্তান জন্ম নেয়। তবে সময়ের আগে জন্ম হওয়ায় নবজাতকের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। এর আগে গত শুক্রবার নির্যাতনের শিকার হলে শনিবার শেফালীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশংকাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছিল।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ফেরদৌসি সুলতানা সাংবাদিকদের জানান, শেফালী বেগমের প্রসবের সময়ের ৯ সপ্তাহ আগে ৯শ’ গ্রাম ওজন নিয়ে শিশুটির জন্ম হয়। প্রসূতি ও নবজাতক শিশুটির অবস্থা শংকটাপন্ন। নবজাতক কন্যাটিকে নিবিড় পরিচর্চ্চা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রসূতিকেও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে নিবিরভাবে।

2
প্রসঙ্গত একটি পারিবারিক ঘটনাকে পুঁজি করে এলাকার কিছু প্রভাবশালী মহল শেফালীকে গরু চুরির অপবাদ দিয়ে গত শুক্রবার দুপুরে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতন করে। এ সময় সাত মাসের অন্ত:সত্তা ছিলেন শেফালী।

এ ঘটনাটি ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন প্রথমদিকে অস্বীকার করলেও বিভিন্ন পত্রিকা ও নিউজপোর্টালের প্রথম পাতায় খবর প্রকাশ হলে প্রশাসনসহ সর্বমহলে তোলপাড় সৃষ্টি করে।

পরে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ সরেজমিনে পরিদর্শন করে সত্যতা পেলে তাদের হস্তক্ষেপে ওই ঘটনায় গত রবিবার গভীর রাতে ডিমলা থানায় নির্যাতনের শিকার শেফালীর মামা সহিদুল ইসলামকে ডেকে নিয়ে এসে তাতে বাদী করে ওসি’র মনমত আসামি করে একটি মামলা (মামলা নম্বর ০৬/১৭)দায়ের করেন। মামলার ১৯জন নামীয় ও অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জন রয়েছে। আসামিদের মধ্যে পুলিশ বাধ্য হয় তিনজনকে গ্রেফতার করতে।

গ্রেফতারকৃতদের সোমবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। তারা হলো শেফালীর বড় বোন আকলিমার স্বামী রফিকুল ইসলাম, শাশুড়ি অপিয়া বেগম ও গ্রাম পুলিশ রফিকুল ইসলাম। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে নিয়ে তদন্ত করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সেদিনের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী নির্যাতীত শেফালি বেগমের ছোট বোন শিউলি আক্তার মুন বলেন, যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবার কথা নয়। গাছে বেধে লাত্থি, ঘুষি, কিল মারা হলো। স্থানীয় আ’লীগের সভাপতি আব্দুল কাদের ওরফে নারিয়া কাদের অকথ্য ভাবে নির্যাতন চালান আমার বোনের উপর।
তারা শেফালীকে গরু চুরির ঘটনা সাজিয়ে পুলিশকে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল।

3

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী সেলিমুর রহমান জানান, ঘটনাস্থলে কেউ এগিয়ে আসেনি  শেফালীকে বাঁচানোর জন্য। সকাল ১০টা হতে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত নির্যাতন করা হয়েছিল শেফালীর ওপর। পুলিশ আসার আগে গাছ থেকে দড়ি খুলে দেয়া হয়। এ ঘটনায় ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন গরু চুরির নাটক সাজিয়ে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে প্রবাহিত করার জোর চেষ্টা করলেও পুলিশের উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপে ঘটনায় মামলা দায়ের করতে তিনি বাধ্য হন। তিনি মামলারদায়ের হওয়ার পরও ঘটনাটিকে পারিবারিক হিসেবে বলার চেষ্টা করে যাচ্ছে তাই তার এমনটা কর্মকাণ্ডে ক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েছে এলাকাবাসী।

এদিকে এ লোমহর্ষক ঘটনা প্রচারে ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সাংবাদিকদের উপর যে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন তার ক্ষোভ তিনি সোমবারও দেখিয়েছেন। সাংবাদিকরা মামলার কপি চাইতে গেলে ওসি পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেন  মামলার কপি শুধুমাত্র বাদী ও বিবাদী দেয়া হবে। থানা হতে সাংবাদিকদের মামলার কপি কিংবা কোনো তথ্য দেয়া হবে না। প্রয়োজনে সাংবাদিকরা মামলার কপি আদালত থেকে সংগ্রহ করবে। পরে সাংবাদিকরা মামলার কপি বিকল্প ব্যবস্থায় সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়। স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ ডিমলা থানার ওসি  সাংবাদিদের সাথে সব সময় বাজে আচরণ করেন এবং কোনো তথ্য চাইতে গেলে প্রায় কথায় কথায় তাদের তিনি জোর গলায় বলেন, তিনি তথ্য দিতে বাধ্য নন। আপনারা (সাংবাদিকরা) যা ইচ্ছে আমার বিরুদ্ধে লিখতে পারেন।

স্থানীয় একাধিক সিনিয়ার সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করবার শর্তে বলেন, ডিমলা থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন সাংবাদিক বান্ধব নয়। একদিন নারী সংক্রান্ত একটি ঘটনা আড়াল করতে আমিসহ অন্যান্য সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে উৎকোচ বাবদ প্রকাশ্যেই ১০ হাজার টাকা নিতে দেখে এটা কেমন হলো প্রশ্ন করলে তিনি আমাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন,আপনাদের যা ইচ্ছে তাই লেখেন,আমি ওসি মোয়াজ্জেম শুধুমাত্র টাকায় বিশ্বাসী! ডিমলা থানায় প্রায় সময়ে দালাল ও অসৎ, প্রভাবশালীদের হই-হুল্লোড়ে মাথা ব্যথা না থাকলেও থানায় গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি দেখলেই ওসি মোয়াজ্জেমের যেনো আকাশ ভেঙ্গে মাথায় পড়ে! তিনি আটককৃত মাদক ব্যবসায়ীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে তাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে ও তাদের ছবি তুলতেও বাধা প্রদান করে থাকেন।

4
উপজেলার একাধিক এলাকাবাসী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান,গত ৩রা জুলাই একই উপজেলার গয়াবাড়ি ইউনিয়নের কুমলাই নদীতে অবৈধভাবে পাথর-বালু উত্তোলনের অপরাধে ডিমলা থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে ২টি ট্রাক্টর, ১টি বালু উত্তোলনের বোমারু মেশিন জব্দ করলেও পরেরদিন ওসি মোয়াজ্জেম ৬০হাজার টাকার বিনিময়ে ট্রাক্টর দুটি ছেড়ে দেন এবং তার কয়েকদিন পরই কোনো রকমের মামলা ব্যতিত অবৈধ পাথর-বালু উত্তোলনের বোমারু মেশিনটিও ৬০হাজার টাকার বিনিময়ে মালিককে ফেরত দিয়ে দেন তিনি!

শুধু তাই নয় তিনি অবিচারের শিকার উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের জাহানারা বেগম, একই এলাকার যুবতী মেয়ে নির্যাতনের শিকার হওয়া বাবা লিটু ইসলাম, ঝুনাগাছ চাপানী ইউনিয়নের মতিন চৌধুরীসহ অগনিত মানুষকে প্রভাবশালীদের সাথে আতাত করে থানা হতে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করে বাহির করে দেন।গত ২/৮/২০১৭ইং উপজেলা সদরের পাথরকুড়া গ্রামের স্বামী হারানো দরিদ্র ভিক্ষুক আয়েশা বেগমের যুবতী মেয়ে পুতুল আক্তার সুমি (২২)কে ওই এলাকার কিছু প্রভাবশালী পেটিয়ে হত্যা করলেও তার পরিবারের লোকেরা সেই অভিযোগ থানায় দিতে আসলেও দরিদ্র হওয়ায় তাদের অভিযোগপত্রটি আমলে না নিয়ে ওসি মোয়াজ্জেম সাফ জানিয়ে দেন, রংপুর হতে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসবার আগে তিনি অভিযোগ আমলে নিতে পারবেন না! যেনো টাকা পেলে ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে সবই সম্ভব, আর টাকা না পেলে যত বড় ঘটনাই হোক না কেনো তার কাছে তা অতি সামান্য ও তুচ্ছ! তিনি টাকা হলেই ঘটনা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে তার নতুন রুপ দিতে পারেন।

এ রকমের অগনিত অনিয়ম, দুর্নীতি ও সেচ্ছাচারিতার অভিযোগ আছে ওসি মোয়াজ্জেমের হোসেনের বিরুদ্ধে!

সুত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার স্বামী রফিকুলের সাথে ছোট বোন আকলিমার ঝগড়া হলে শেফালির বাড়িতে আসে আকলিমা। পরদিন(শুক্রবার) সকালে তিনজন মিলে আকলিমাকে রাখতে গেলে রফিকুলের বাড়িতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হন শেফালী। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দিলে পথিমধ্যে রফিকুলের মামা দবির উদ্দিনের উঠানে মীমাংসার জন্য বসলে সেখানে রফিকুল ও তার মা অপিয়া বেগম নির্যাতন শুরু করেন। একপর্যায়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় অমানবিক ভাবে গাছে বেঁধে রেখে নির্যাতন চালানো হয় বিকেল পর্যন্ত অন্তসত্বা শেফালীকে।

5

প্রথমে জলঢাকা হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও অবস্থার সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে স্থানান্তরিত করা হয় রংপুর চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ে।

নির্যাচিতা শেফালী ঘটনার পর ভয় আর হুমকীর কারণে মামলা করতে না পারলেও রবিবার রাতে পুলিশ প্রশাসনের হস্তক্ষেপে মামা সহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন ডিমলা থানায়।

খালিশা চাপানি ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ক্লোজার পাড়ার ওই ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আতাউর রহমান সরকার জানান, আমি সে সময় ছিলাম না। নির্যাতনের চিত্রটি খুবই খারাপ হয়েছে। এটা ঠিক হয়নি। তবে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের শাস্তি দাবি করেন তিনি।

নির্যাতনের শিকার শেফালির খালা নাজমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ওমরা হামাক ভয়ভীতি দেখায় ছে, কিছুই বলে হইবে না। পুলিশ বলে কিছুই করিবার পাইবেনা ওমার। হামরা এ্যালা কি করিমো।

এদিকে গাছে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাটি কোনভাবে করা ঠিক হয়নি মন্তব্য করে নীলফামারী জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।

তিনি জানান, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে দেখছে। মামলা নেওয়া হয়েছে। তিনজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। যারাই জড়িত থাকুন না কেন তাদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা আতিকুর রহমান।

কমেন্টস