পবিত্র শবে বরাতের রাতে যা করবেন, যা থেকে বিরত থাকবেন

প্রকাশঃ মে ১১, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

যথাযোগ্য ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে আজ বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে পালিত হবে পবিত্র শবে বরাত। এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আল্লাহর রহমত ও নৈকট্য লাভের আশায় নামাজ আদায়, কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ মাহফিলসহ ইবাদত-বন্দেগি করবেন।

হিজরি বর্ষপঞ্জির শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত। আজকের রাতকে হাদিসের পরিভাষায় নিসফে শাবান বলা হয়। যা আমাদের দেশে শবে বরাত নামে পরিচিত।

মহান আল্লাহ তাআলা এ রাতে বান্দাদের জন্য তাঁর অশেষ রহমতের দরজা খুলে দেন। মহিমান্বিত এ রাতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা বিগত জীবনের সব ভুলভ্রান্তি ও পাপের জন্য মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ জীবনে পাপ-পঙ্কিলতা পরিহার করে পরিশুদ্ধ জীবনযাপনের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করেন। ইবাদত-বন্দেগি ছাড়াও প্রয়াত স্বজনদের কবর জিয়ারতও করে থাকেন মুসলমানরা।

শব শব্দ ফার্সি। অর্থ রাত এবং বরাত শব্দটির ফার্সি ও আরবী উভয় ভাষাতেই ব্যবহার রয়েছে। ফার্সি ভাষায় বরাত শব্দটির অর্থ হচ্ছে- ভাগ্য। এদিক থেকে ফার্সি ভাষায় শবে বরাত অর্থ ‘ভাগ্য রজনী বা ভাগ্যের রাত’। অপরদিকে বরাত শব্দটিকে যদি আরবী শব্দ বারাআতুন থেকে উদ্ভূত ধরা হয়- তবে এর অর্থ দাঁড়ায় নিষ্কৃতি, দায়মুক্তি, অব্যাহতি ইত্যাদি। এর পূর্বে শব শব্দটি যুক্ত করলে ‘শবে বরাত’-এর অর্থ দাঁড়ায় নিষ্কৃতি, দায়মুক্তি ও অব্যাহতি ইত্যাদির রাত।

মুসলিম উম্মাহ দীর্ঘ এক বছর এ রাতের আকাঙ্খায় থাকেন। এ রাত মুসলমানরা ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকার ও কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে কাটাবেন। শবে বরাত উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পৃথক বাণী প্রদান করেছেন।

এদিকে পবিত্র রমজান মাসের প্রস্তুতি গ্রহণের মাস হিসেবে শাবান মাস একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস। কেননা হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসে এ দোয়াটি বেশি বেশি  করতেন, ‘হে আল্লাহ রজব ও শাবান মাসকে আমাদের জন্য বরকতময় করুন এবং রমজান পর্যন্ত আমাদেরকে পৌঁছার তওফিক দিন।’

রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতেন এবং সাহাবিদের রোজা পালন করতে বলতেন। হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে আছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) শাবান মাসের চেয়ে বেশি আর কোনো মাসে রোজা রাখতেন না। বলতে গেলে প্রায় পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন।

রমজান মাসের প্রস্তুতি হিসেবে শাবান মাসের অন্যতম নফল ইবাদত রোজা পালন হিসেবে নিসফে শাবান তথা বরাতের আগে মিলিয়ে কমপক্ষে দু’টো রোজা পালন করা উচিৎ। তাছাড়া প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ‘আইয়্যামে বিযের’ তিনটি নফল রোজা পালন করার ওপর হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) গুরুত্বারোপ করেছেন। হজরত আবু যর (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন তুমি মাসে তিনটি রোজা রাখতে চাও, তখন ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখো। -তিরমিজি

হাদিসের পরিভাষায় নিসফে শাবান তথা অর্ধেক শাবান মাসের রাতের গুরুত্ব রয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরশাদ হচ্ছে, হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে তখন তোমরা রাত জেগে ইবাদত করো এবং পরের দিনটিতে রোজা রাখো। কেননা প্রত্যেক রাতে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করবো। কোনো রিজিক প্রার্থী আছে কি? আমি তাকে রিজিক দান করবো। কোনো বিপদগ্রস্ত আছে কি? আমি তাকে বিপদমুক্ত করবো। আর সুবহে সাদেক পর্যন্ত এ ডাক অব্যাহত থাকে। -ইবনে মাজা

আরেক হাদিসে ইরশাদ হচ্ছে, হজরত আয়েশার (রা.) ভাষায়; কোনো এক শাবান মাসের অর্ধ রাতে হজরত রাসূলুল্লাহকে (সা.) বিছানায় পাওয়া যাচ্ছিল না। খুঁজে দেখা গেলো তিনি জান্নাতুল বাকিতে কবর জিয়ারত করছেন। -সহিহ মুসলিম

এই হাদিসের ভিত্তিতে এ রাতে নফল আমল হিসেবে অনেকেই আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর কবর জিয়ারত করে থাকেন। ইসলামি স্কলারদের মতে, কবর জিয়ারতে জিয়ারতকারীর উপকার হয়। কবর দেখে সে আখেরাতমুখি হওয়ার সুযোগ পায়।

নিসফে শাবানের রাতে নফল নামাজ আদায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু এ সমস্ত আমলের ক্ষেত্রে আবেগতাড়িত হয়ে কোনোরকম বাড়াবাড়ি করা যাবে না এবং নফল ইবাদতকে ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদার ওপর গুরুত্ব দেওয়া যাবে না। অথবা নফল আদায় করতে গিয়ে কোনো ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নতে মুয়াক্কাদা আদায়ে যেন বিঘ্নিত না হয় সেদিকে গভীরভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে। এ রাতে নফল নামাজ মসজিদে ও নিজ ঘরেও আদায় করা যেতে পারে।

বরাতের রাতে লক্ষ্য করা যায়, কিছু লোক টুপি-পাঞ্জাবি পরে সারা রাত এ মসজিদ হতে সে মসজিদ, এ মাজার হতে সে মাজার অথবা রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াদৌড়ি করেন- এ সব আচরণ-কর্মকাণ্ড সঙ্গত নয়। এসব থেকে প্রত্যেক মুসলমানেরই বিরত থাকা উচিৎ।

শবে বরাত পালনে আরেকটি প্রথা প্রচলিত আছে, তা হচ্ছে- এ রাতে আতশবাজি ও হালুয়া রুটি বিতরণ। ইসলামি শরিয়ত কখনও আতশবাজির বৈধতা দেয় না। প্রশাসনও এটা নিষেধ করেছেন। আর হালুয়া-রুটি বিতরণের মাধ্যমে মেহমানদারি বা অন্নহীনদের অন্নদান হলেও নির্দিষ্ট করে এ রাতে হালুয়া-রুটির ছড়াছড়ি করার অনুমতি দেয় না বরং সারা বছরই হালুয়া-রুটিসহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী বণ্টন করা যায়।

এদিকে শবে বরাত উপলক্ষে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানায়, ইসলামিক ফাউন্ডেশন আজ বাদ মাগরিব থেকে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে রাতব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।

Advertisement

কমেন্টস