‘লাল নীপবনে ছায়া বীথিতলে’

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭

শাহাদত হোসেন-

বর্ষায় ফুলের রাজ্যে রাণী কদম। কদম ফুল পছন্দ করে না এমন বেরসিক মানুষ নেই। বর্ষা এলেই প্রেমিকার আবদার ‘কদম ফুল’- এ যেন অতি সাধারণ কথা। প্রেমিকার মনোরঞ্জনে বর্ষায় কদমের জুড়ি নেই। অনন্য এই ফুল সম্পর্কে সদ্য প্রয়াত নিসর্গবিদ, জীববিজ্ঞানী ও বিজ্ঞান লেখক দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন ‘বর্ণে গন্ধে সৌন্দর্যে কদম এ দেশের রূপসী তরুর অন্যতম’।

বর্ষার প্রকৃতি বাংলা সাহিত্যে এনে দিয়েছে স্নিগ্ধতা। বর্ষার পরম উপহার সোনারঙ্গা কদম ফুল নিয়ে রচনা করা হয়েছে নানা গল্প, উপন্যাস, কবিতা আর গান। রবী ঠাকুর তাঁর শিহরণ জাগানিয়া বর্ষার গানে লিখেছেন ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহম্মেদ কদম প্রেমে মগ্ন হয়ে এই বাক্যাংশটি ‘নাম’ হিসেবে ব্যবহার করে রচনা করেছেন তাঁর প্রথম প্রেমের উপন্যাস। এই উপন্যাস পাঠকনন্দিত হলে তারই সূত্র ধরে তিনি রচনা করেন ‘বাদল দিনের দ্বিতীয় কদম ফুল’। এই স্বর্ণরঙ্গিন কদম ফুল কবি নজরুলের বিদ্রোহী মনেও এনে দিয়েছিলো কোমলতা। তাই রচনা করেছিলেন ‘দোলে শিহরে কদম, বিদরে কেয়া/নামিল দেয়া’।

কদমের আরেক নাম ‘নীপ’। নামটি স্থান পেয়েছে রবীন্দ্রনাথের আরেক গানে ‘এসো নীপবনে ছায়া বীথি তলে’। সাহিত্য জগতে এসব চালক পুরুষদের রচনায় সোনালী কদমের স্থান রাণীর বেশে। তাঁরা ‘লাল কদম’ দেখেছেন কিনা জানি না। তবে লাল কদমের সৌন্দর্য্য ও গন্ধের মাদকতায় আমার কল্পিত প্রেমিকার খোঁপায় ফুলটি গুজে দেওয়ার ইচ্ছা জাগে।
সোনালী কদম থেকে লাল কদমের ভিন্নতা শুধু রংয়েই।

সচরাচর আমরা যে ফুল দেখি তাতে পূর্ণ প্রস্ফুটিত মঞ্জরি সাদা আর হলুদ/সোনালীর মিশ্র রংয়ের হলেও বিলুপ্ত প্রায় এই ফুলে হলুদ/সোনালীর বদলে থাকে লাল রং। দীর্ঘাকৃতির, বহুশাখাবিশিষ্ট এই পুষ্প বৃক্ষটি রূপসী তরুর মধ্যে অন্যতম। এর কান্ড সরল, উন্নত, ধূসর ও রুক্ষ। অসংখ্য শাখা ভূমির সমান্তরালে প্রসারিত। বড় বড় ডিম্বাকৃতির উজ্জ্বল সবুজ পাতাগুলো দেখতে চকচকে এবং বিন্যাসে বিপ্রতীপ। নিবিড় পত্রবিন্যাসের জন্য বৃক্ষটি ছায়াঘন। শীতে কদমের পাতা ঝরে যায় এবং বসন্তে কচি পাতা গজায়। কচি পাতার রঙ হালকা সবুজ। কদমের একটি পূর্ণ মঞ্জরিকে সাধারণত একটি ফুল বলে মনে হলেও তা মূলত বর্তুলাকার মাংসল পুষ্পাধারে অজস্র সরু সরু ফুলের বিকীর্ণ বিন্যাস। ফল মাংসল, টক এবং বাদুড় ও কাঠবিড়ালির প্রিয় খাদ্য। ওরাই বীজ ছড়ানোর বাহন।

কদম মূলত বর্ষার ফুল হলেও জলবায়ুর পরিবর্তনে আগাম বৃষ্টির কারণে বৈশাখ বা জৈষ্ঠ্য মাসেও চোখে পড়ে। বজ্রগর্ভ বৃষ্টির পানি এর শিকড়ে পৌঁছালেই ফুল ফুটতে শুরু করে।

বিরল এই লাল কদম বাংলাদেশে এখন বিলুপ্তির পথে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এর উপস্থিতি তেমন একটা চোখে পড়ে না। নারায়নগঞ্জের পাগলার শাহীমহল্লায় ফারুক আহম্মেদের বাড়িতে একটি গাছ আছে। এছাড়াও গাজীপুরের জয়দেবপুর ও বরিশালে একটি করে লাল কদম গাছ আছে বলে জানা গেছে। কোন কদমপ্রেমি যদি তা দেখতে চান তাহলে যেতে হবে শাহীমহল্লায়।

ফারুক আহম্মেদের ছেলে জাহিদ চৌধুরি শাকির জানান, ‘এজন্য ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে বাসযোগে রায়েরবাগ হয়ে নারায়নগঞ্জের কদমতলি যেতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি যোগে ৩০ টাকা ভাড়ায় যেতে শাহীবাজারে। ঐ বাজারের যে কেউ ফারুক আহম্মেদ/শাকির চৌধুরির বাড়ি চিনিয়ে দিবেন। তবে ফুলটি দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আগামী আষাঢ় মাস পর্যন্ত। কারণ জৈষ্ঠ্যের শেষাংশ ও ভাদ্রের প্রথমাংশে কিছু ফুল দেখা গেলেও আষাঢ়-শ্রাবণে পূর্ণ যৌবন নিয়ে দেখা দেয় লাল কদম।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ফ ম জামাল উদ্দিন বলেন, ‘সচরাচর বীজের মাধ্যমে কদম ফুলের বংশবৃদ্ধি হয় না। একশটি বীজ থেকে মাত্র একটি চারা হতে পারে। বয়স চল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেই এই গাছ সাধারণত মারা যায়।’

তিনি মনে করেন, অর্থনৈতিকভাবে তেমন গুরুত্বপূর্ণ না হওয়ায় কদম গাছের প্রতি মানুষ যত্নশীল নয়। বরং অনেক কদম চারা আগাছা মনে করে কেটে ফেলা হয়। ফলে আজ বিলুপ্তির পথে লাল কদম ফুল।

ইতোপূর্বে শাকির চৌধুরী কাটিং বা অন্য কোন কৃত্রিম পদ্ধতিতে এর বংশ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ চারাই মারা গেছে। ড. জামালের মতে, একমাত্র ‘গুটি কলম’ এর মাধ্যমেই লাল কদমের বংশবৃদ্ধি করা সম্ভব। অন্য কোন পদ্ধতিতে সৃষ্ট নতুন কদম গাছে লাল ফুল ধরে না। লাল এর পরিবর্তে হলুদ ফুল ধরে। তবে কী কারণে রং পরিবর্তন হয় তা তাঁর জানা নেই।

লাল কদম গাছের যে একদম অর্থনৈতিক গুরুত্ব নেই তা নয়। ড. জামাল জানান, ‘হলুদ কদম গাছের মতো লাল কদম গাছের কাঠ ম্যাচ তৈরির কারখানায় দেয়াশেলাইয়ের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়াও পেন্সিল ও কাগজ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। কাষ্ঠশিল্পিরা বহু যুগ আগে থেকেই বাক্স, খেলনা, ঘর সাজানোর বিভিন্ন শৌখিন জিনিসপত্র তৈরি করে থাকেন। প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য সৃষ্টিতে এর ভূমিকা অনন্য। সৌন্দর্য্য বৃদ্ধির জন্য রাস্তার পাশে বা বাড়ির আঙ্গিনায় কদমবীথি থাকা উচিৎ। সৌন্দর্য্যের কারণে এ ফুলের অর্থনৈতিক চাহিদা আছে। এই গাছের ছাল জ্বরের ঔসধ হিসেবে গ্রামেগঞ্জে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।’

বিলুপ্তি রোধে ড. জামাল গুটি কলমের মাধ্যমে লাল কদমের বংশবৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এজন্য শাকির চৌধুরীকে সরবরাহ করেছেন মূল গজানোর হরমোন।

আসুন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব রোধে, বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষায় লাল কদম বৃক্ষ সংরক্ষণ করি ও গুটি কলমের মাধ্যমে সারাদেশে ছড়িয়ে দেই। বিলুপ্তির হাত থেকে লাল কদমকে রক্ষা করি। অপরূপ এই ফুলে মুগ্ধ রবী ঠাকুরের সুরে গেয়ে উঠি ‘এসো লাল নীপবনে ছায়া বীথিতলে’।

কমেন্টস