পাখির জন্য ব্যতিক্রমী ভালোবাসা

প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২৩, ২০১৬

সুমন মুখার্জী, নীলফামারী প্রতিনিধি-

পাখির জন্য ভালোবাসা তার। ভালবাসায় কোনো কমতি নেই। তিনি পাখি ভালোবেসে ব্যবস্থা করছেন নিরাপদ বাসস্থানের। পাখির বাস উপযোগী মাটির তৈরি পাত্র ঝুলিয়ে দিচ্ছেন গাছের ডালে ডালে। যেখানে নিশ্চিন্তে আবাস গড়ে তুলেছে নানা প্রজাতির দেশীয় পাখি।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় নিরাপদ বাসা তৈরি করে পাখির প্রতি এমন ভালবাসা দেখিয়েছেন নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আলমগীর হোসেন এবং তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘সেতুবন্ধন’। দেশীয় পাখিদের সংরক্ষণ পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে- এমন চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েই ব্যতিক্রমী এ কাজে নিবেদিত হয়েছেন তিনি।

সরেজমিনে খিয়ারজুম্মা থেকে খাতা মধুপুর ইউনিয়নের খালিশা বেলপুকুর ও উপজেলার ফাইলেরিয়া হাসপাতাল, প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল, খাদ্যগুদাম (সংরক্ষিত এলাকা), কয়ানিজপাড়া, মুসলিম উচ্চ বিদ্যালয়, থানা চত্বর, খানকা শরীফ এবং পুরো উপজেলা চত্বরে প্রায় প্রতিটি গাছে বেঁধে দেয়া হয়েছে মাটির কলস। যাতে রয়েছে বাসা তৈরির অন্য উপকরণ।

সৈয়দপুর উপজেলায় প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বটগাছ, আমগাছ, কাঁঠালগাছসহ নানা জাতের গাছে বেঁধে রাখা হয়েছে অসংখ্য কলস। দুটি ডালের মাঝখানে কায়দা করে এমনভাবে হাঁড়িগুলো বসানো হয়েছে যেন বৃষ্টির পানি ভিতরে যেতে না পারে, আবার ঝড়-ঝঞ্ঝায় ছিটেফোঁটা পানি ঢুকে গেলেও যাতে পানি জমে না যায় তা নিশ্চিত করতে কলসগুলোতে ছোট ছোট ছিদ্র রয়েছে। আর তাই কালবৈশাখীসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিরাশ্রয়ী পাখিদের অনেকেই দল বেঁধে ছুটে আসছে এই আবাসনে।

পাখির জন্য অনন্য ভালবাসা থেকে সৈয়দপুরের এই উদ্যোমী যুবক ২০১৪ সালে নিজের সীমিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নিজ গ্রামে পাখিদের বাসা তৈরি করার মাধ্যমেই সূচনা করেন তার পাখি সংরক্ষণ কর্মসূচি।

সাম্প্রতিক সময়ে অবাধ বৃক্ষ নিধনের কারণে পাখিরা তাদের নিরাপদ আবাসস্থল হারিয়েছে এবং খাদ্য সঙ্কটের কবলে পড়েছে। এছাড়া গ্রামগঞ্জের নতুন প্রজন্মের মানুষ পাখিদের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল না হওয়ায় ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছে পাখি। এছাড়া ফসল উৎপাদনে বিষাক্ত কীটনাশকের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাখি মৃত্যুর হারও বেড়েছে।

এই প্রতিকূল অবস্থা থেকে পাখিদের রক্ষায় এগিয়ে এসেছে গ্রামের অখ্যাত এই যুবক তার সহযোগিদের নিয়ে। শুরুতেই ২০১২ সালে পাখির সংরক্ষণ, প্রজনন ও নিরাপদ বাসস্থান গড়ে তোলার লক্ষ্যে বন্ধুদের নিয়ে ‘সেতুবন্ধন’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে এবং নিজ অর্থায়নে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সড়কের গাছপালায় কলস বেঁধে দেয়। বর্তমানে সৈয়দপুর উপজেলায় ছয় হাজার গাছে কলস বেঁধে দিয়েছেন এই যুবক।

সৈয়দপুরের এই উদ্যোমী যুবক আলমগীর হোসেন বলেন, পাখিরা না থাকলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে না। তাছাড়া কৃষিতে পাখিদের ভূমিকা অপরিসীম। তারা ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে কৃষি চাষাবাদে ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, তার বন্ধু রফিকুল ইসলাম, রাশেদুজ্জামান রিফাত, রাফি, সিরাজুল, টুইংকেলসহ আরো অনেকে তাকে এ কাজে সহযোগিতা করেন।

সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জুয়েল চৌধুরী বলেন, ওরা পাখি রক্ষার সংগ্রাম করছে। প্রকৃতির জন্য এটি ভালো উদ্যোগ। তাদের কাজের সহযোগিতা ও গাছে বেঁধে দেয়া কলস চুরির হাত থেকে বাঁচাতে এলাকার লোকজনকে সচেতন করা হচ্ছে। যুবকদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে সকলের। এলাকায় এসব যুবক পাখি প্রেমিক হিসেবে পরিচিত।

‘সেতুবন্ধন’ সংগঠনের উপদেষ্টা বদরুদ্দোজা বলেন, পাখিপ্রেমিক আলমগীর ও সেতুবন্ধনের নিরলস চেষ্টায় সৈয়দপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম এখন পাখির কলকাকলিতে মুখরিত। পরিচিত বিভিন্ন পাখি ছাড়াও বেশ কিছু অপরিচিত পাখিও এখন এ অঞ্চলে দেখা যাচ্ছে।

সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম জানান, আলমগীর নিজ উদ্যোগে সৈয়দপুর উপজেলাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে পাখির জন্য আবাসস্থল তৈরি করেছেন। এটি একটি মহতী উদ্যোগ। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি। পাখিরা মানুষের জন্য কতটা উপকারি তা এলাকার মানুষকে বোঝান, নিয়মিত বৈঠক করেন। তাদের মিলিত চেষ্টয় রক্ষা পাচ্ছে পাখির জীবন। শিশুরা বেড়ে উঠছে শালিক, ঘুঘু, পেঁচা, শ্যামাসহ নানা রঙের পাখির সাথে পরিচিত হয়ে আর কিচিমিচির ডাক শুনে।

কমেন্টস