পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভালোবাসা সন্তানের প্রতি মায়ের

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৬

সিফাত কবির

রোদটা যেন আজ একটু বেশিই চড়ে বসেছে, মনে হচ্ছে পণ করেই বসেছে যে দেশের মানুষ কে একটু জ্বালাবে। নাহ, একটু লেবু পানি খেতেই হবে। খোঁজতে শুরু করলাম হঠাৎ দেখি রাস্তার পাশেই লেবু পানি বিক্রি হচ্ছে। জায়গাটা মহাখালী রেল ক্রসিং এর ঠিক পাশেই। আমি দাঁড়াতেই দেখেতে পেলাম বাচ্চাটা আমার দিকে কেমন যেনো হাআ করে তাকিয়ে। গলা ভেজাচ্ছিলাম ঠিক সে সময়ই অর্থাৎ যখন আমি লেবু পানি খাচ্ছিলাম।

আমার কেন জানি না এই পানি খতে ভালই লাগে। কিন্তু এ কেমন কথা ! কি আজিব পিচ্ছিটা আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে কেন? যাই হোক আমি না দেখার ভান করে আর এক গ্লাসের কথা বললাম। আরে আজিব! কি ব্যাপার এই পিচ্ছি এত মানুষ রেখে আমার দিকে এমন হাআআআ করে কেন তাকিয়ে? নাহ এই ভাবেতো আর মেনে নিতে পারছি না, অবশেষে কৌতূহলী মন না মানা সত্ত্বেও বাচ্চাটিকে কাছে ডেকে নিলাম। উস্কো খুসকো চুল, রুক্ষ চেহারা, বাচ্চাটিকে কাছে ডাকার পর কেমন যেনো একটু মায়াই লাগলো, চোখ গুলা হলুদ হয়ে আছে, মনে হচ্ছে ভালো মন্দ কিছু খেতে পায় না।

ma

মনে কেমন যেনো একটু কষ্ট অনুভব করলাম বাচ্চাটির জন্য। জিজ্ঞাসা করলাম সেও কি লেবু পানি খাবে? উত্তরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো আমিও তাকে এক গ্লাস পানি দিলাম। তখনো রাস্তায় অনেক ভিড়, মানুষের ছোঁড়াছুড়ি, ছোটাছুটি। ব্যস্ত শহর কারোর জন্য কারোর সময় নেই। তাকাতেই দেখলাম শিশুটির চক্ষু জলে ভিজে গেছে, ঠিক যেন প্রাপ্ত বয়স্ক কেউ কান্না করছে। জিজ্ঞাসা করার আগেই বলে উঠলো “আমার মার গলা শুকাই আসে, নিয়া যাই”? আমি তখন আর কিছু বলার সাহস পাইনি।

মনের কোথায় যেন আমাকে জোর করতে লাগল, বলতে বলল তাকে যেতে। আর তার পিছে যেন যাই। মনের কথা ফেলতে পারিনি। গেলাম ও ঠিক মনের কথা শুনে। যেতে যেতে আমি পাশের একটা বস্তিতে প্রবেশ করলাম। বস্তির মাঝে যেতেই আমি যে এই দৃশ্য দেখবো তা মোটেও আশা করিনি। বাচ্চাটির সঙ্গে যেতেই তার মা ওকে জড়িয়ে সে কি কান্না “কই ছিলি তুই মা” বলে আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কিন্তু কিছু বলার ভাষা সেই মুহূর্তে আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম। দেখছিলাম মার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা। আমি যেন আজকের দিনে একের পর এক আশ্চর্য হবার মতো ঘটনা দেখেই যাচ্ছি।

50120

আমি অনেকক্ষণ যাবত কান্না থামিয়ে রাখছিলাম কিন্তু এখন আর ধরে রাখতে পারলাম না যখন শুনলাম “মা তোমার জন্য শরবত আনতে গেসিলাম গলা শুকাই গেসে না তোমার?” আর সেই সাথে দেখা হয়ে গেল সন্তানের মার প্রতি ভালবাসাও। আমি তখন একটু সাহস করে কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতেই জানতে পারলাম মেয়েটির নাম ‘আসিয়া’, তার একটা ছোট ভাইও আছে। তার থেকেও বড় যেটা আমি জানতে পারলাম গত এক সপ্তাহ ধরে মেয়েটি জণ্ডিসে আক্রান্ত। আমি তখন আমার ভিতরের আবেগটাকে ধরে রাখতে পারিনি। শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললাম।

ma

শিশুটি নিজে জণ্ডিসে আক্রান্ত অথচ সে নিজে শরবতটি পান না করে মায়ের পিপাসা মেটানোর জন্য নিয়ে গেল। এ কেমন ভালোবাসা? এমন প্রশ্ন ভেবেই আমি আর আমার নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। তখন বুঝলাম কেন মা তার শিশুটিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে ফেলেছিল। পৃথিবীর সকল ভালোবাসা আসলে এই মা আর সন্তানের ভালবাসার কাছে এক পিঁপড়ের সমান। এর থেকে সুখ আর কোথায় হতে পারে? এই মা আর সন্তানের ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ, তখনি আমি যেন আমার নিজের মাকে নতুন করে বুঝলাম, আরে হা হঠাৎ মনে পরে দুপুর এখন আম্মু অপেক্ষা করছে আমার জন্য।

আমি তখনই বাচ্চাটির মার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললাম জন্ডিসের চিকিৎসা করাতে, ভালো হয়ে যাবে। বলেই বের হয়ে পরলাম ফের যান্ত্রিক জীবনে, সময়টা এখন বিকেল, কেমন যেন রোদ নেই আবার হাল্কা মেঘে ঢাকা আকাশ, আমি হাঁটছি রেল লাইনের রাস্তা ধরে। গন্তব্য বাসায় যাওয়া।

এভাবেই আমি আপনাদের সাথে তুলে ধরবো আমার বাস্তব জীবনের নতুন কিছু গল্প, আপনারাও শেয়ার করতে পারেন আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ গল্পটি আমার সাথে’

সিফাত কবির

ইমেইল ঃ [email protected]

কমেন্টস