দামুড়হুদায় পাট চাষ অর্জিত হয়নি লক্ষ্যমাত্রা, ন্যায্যমূল্য না পেয়ে হতাশ কৃষকরা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ১৫, ২০১৭

আব্দুর রহমান (জসিম), চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:

চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় পাট চাষে বাম্পার ফলন হয়েছে। জমি থেকে পাট কাটা, পানিতে জাঁক দেওয়া, আঁশ ছড়ানো এবং রোদে শুকানোর পর প্রক্রিয়াজাত করার জন্য কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। পাটের বাম্পার ফলনের পর কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। তবে বাজারে বিক্রি করতে গিয়ে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে  হতাশ হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দামুড়হুদা উপজেলায় এক সময় দেশের প্রথম সারির অর্থকরী ফসল সোনালী আঁশ খ্যাত পাটের ব্যাপক আবাদ হতো। দামুড়হুদায় উৎপন্ন পাটের মান অত্যন্ত ভাল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর ব্যাপক চাহিদা ছিল। দামুড়হুদার হাট-বাজার ও বিভিন্ন অঞ্চল থেকে খুলনা, যশোর নওয়াপাড়া, দৌলৎপুর, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, নারায়নগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাট চালান হতো। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ব্যপারীরা এসে দামুড়হুদার দর্শনা, দামুড়হুদা ও কার্পাসডাঙ্গা মোকাম থেকে পাট কিনে নিয়ে যেত। এক কথায় দামুড়হুদা তথা চুয়াডাঙ্গার পাটের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কারণ হিসেবে জানা যায়, উন্নতমানের পাট উৎপাদনে এ অঞ্চলের মাটি ও পানি অত্যন্ত উপযোগী।

দামুড়হুদার বটতলীর বিল, ভৈরব নদ, দলকা বিল, রায়সা বিল ও মাথাভাঙ্গা নদীর পানিতে জাগ দেওয়া পাটের আঁশ এবং রং অত্যন্ত ভাল মানের হওয়ায় তুলনামুলকভাবে এ পাটের চাহিদা ভাল। অন্যান্য স্থানের পাটের তুলনায় দামও সব সময় প্রতি মণে ৩০ টাকা থেকে ৫০ টাকা বেশি।

বেশ ক’বছর ধরে নানা অনিয়ম, অব্যাবস্থাপনা ও প্রতিকুল আবহাওয়াসহ ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকের লোকসানের কারণে পাটচাষের পরিমান কমে গিয়েছিল। সম্প্রতি সরকার এক সময়ের দেশের প্রথম সারির অর্থকরী ফসল সোনালী আঁশ খ্যাত পাটের হারানো ঐতিহ্য ফেরাতে সেইসাথে পরিবেশ রক্ষায় পাট উৎপাদন ও পলিথিন, সিন্থেটিক এর পরিবর্তে পাটের ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করে বিভিন্ন পণ্য সংরক্ষন, পরিবহন ও বাজারজাত করতে পাটের তৈরি ব্যাগ ব্যাবহারের উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে আইন পাশ করে। প্রশাসনিকভাবে আইনের প্রয়োগ শুরু করলে মানুষ পাটের ব্যাগ ব্যবহারের প্রতি উৎসাহিত হতে শুরু করে। সেই সাথে কৃষকরাও লাভের আশায় পাটের আবাদ বাড়িয়ে দেয়। তারই ফলশ্রুতিতে কৃষকরা গত বছর উপজেলার কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩হাজার ২শ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ করে।

কিন্তু পানির অভাবে পাট পঁচাতে সমস্যা, শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি, সার-কীটনাশকসহ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সেই তুলনায় পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই লাভবান হতে পাটের আবাদ থেকে সরে এসে ধান ও নানারকম সবজির আবাদ করেছে। ফলে এবার পাট আবাদে উপজেলার কৃষি বিভাগের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে কৃষি বিভাগ উপজেলায় ১০হাজার ৪শ’ ৫০হেক্টর জমিতে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে মাঠে নামে। সেক্ষেত্রে অর্জিত হয়েছে মাত্র ৭হাজার ৮শ’ ৯০হেক্টর জমি। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২হাজার ৫শ’ ৬০ হেক্টর কম। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হবার কারন হিসাবে জানায়, পানির অভাবে পাট পঁচাতে সমস্যা, পাটের চেয়ে ধানের আবাদে লাভবান হওয়ায় গত বছর পাটের আবাদ করে কৃষকরা লাভবান হতে না পেরে এবার ওইসব জমিতে ধান ও নানারকম সবজির আবাদ করেছে। ফলে পাট আবাদের লক্ষ্যমাত্র পূরণ হয়নি।

এদিকে পাটচাষীদের অনেকেই অভিযোগের সুরে বলেন, দেশে সরকারিভাবে সংগ্রহের জন্য ধান-চাল, গমসহ নানা ফসলের মূল্য নির্ধারন করা হলেও পাটের ব্যাপারে তা করা হয় না। ফলে পাট ওঠার মৌসুমে এক শ্রেনির ফড়িয়া ও ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে পাটের দাম কমিয়ে রাখে। কৃষকের ঘর থেকে কৌশলে কমদামে পাট কিনে মহাজনদের ঘরে তুলে নিয়ে পাটের বাজারদর বাড়িয়ে দেয়। ফলে কৃষকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পাট উৎপাদন করে পাটের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসানগ্রস্থ হলেও অল্প সময়ে স্বল্প পূঁজি খাটিয়ে মোটা অংকের লাভ করে ব্যাবসায়ীরা। তাই সরকারিভাবে পাটের দাম নির্ধারণ করলে ন্যায্যমূল্যে পাট বিক্রি করে কৃষকরা লাভবান হতে পারে।

চলতি মৌসুমে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হবার বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুফি মো. রফিকুজ্জামান বলেন, পানির অভাবে পাট পঁচাতে সমস্যা ও পাট আবাদে খরচের তুলনায় পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া সেইসাথে ধানের মূল্য ভাল পাওয়ায় ধান আবাদ করে লাভবান হওয়ায় কৃষকরা পাটের জমিতে ধানসহ বিভিন্ন সবাজির আবাদ করেছে। যে কারণে পাটচাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি।

সচেতনমহল মনে করেন, “বাংলার সোনালী আঁশ” খ্যাত পাটের পুরোনো ঐতিহ্য ফেরাতে এ খাতের নানা অনিয়ম দুর করে দেশে পাটজাত পণ্যের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণসহ সরকারি-বেসরকারিভাবে বিদেশে কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ব্যপক উদ্যোগ নিতে হবে।

এছাড়া এখন পর্যন্ত মোট ১৭টি পণ্যে পাটজাত মোড়কের ব্যাবহার বাধ্যতামুলক করা হলেও এখনও পোল্ট্রিফিড, সিমেন্টসহ নানা পণ্যে বিপুল সংখ্যক ক্ষতিকর প্লাষ্টিক ব্যবহার করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এসব পণ্যও পাটজাত মোড়ক ব্যবহারের আওতায় আনা দরকার। এখনও পর্যন্ত উপজেলার দর্শনা রেলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্যের মোড়ক হিসাবে অবাধে লক্ষ লক্ষ প্লাষ্টিকব্যাগ দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে যা অবিলম্বে বন্ধ করা প্রয়োজন। এ উদ্যোগ সফল হলে আবারও দেশের সোনালি আঁশ খ্যাত পাট ফিরে পাবে তার পুরোনো ঐতিহ্য, পাটচাষ করে লাভবান হতে পারবে দেশের লক্ষ লক্ষ কৃষক।

কমেন্টস