যে গুনাহ জিনা’র চেয়েও ভয়াবহ

প্রকাশঃ অক্টোবর ৮, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ইসলাম শান্তির ধর্ম। সমাজে শান্তি-শৃংঙ্খলা বজায় রাখার জন্য ইসলামের দিকনির্দেশনা জোড়ালো। সোহার্দ্য-সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য গীবত বা পরনিন্দা হারাম করা হয়েছে। গীবতের কারণে সমাজে নানা ধরনের অনর্থ, বিবাদ সৃষ্টি হয়।

গীবতের পরিচয়: গীবতের শাব্দিক অর্থ হল, দোষারোপ করা, অনুপস্থিত থাকা, পরচর্চা করা, পরনিন্দা করা, কুৎসা রটনা করা, পিছে সমালোচনা করা ইত্যাদি।

পরিভাষায় গীবত বলা হয় ‘তোমার কোনো ভাইয়ের পেছনে তার এমন দোষের কথা উল্লেখ করা যা সে গোপন রেখেছে অথবা যার উল্লেখ সে অপছন্দ করে।’ (মুজামুল ওয়াসিত)

গীবতের সবচেয়ে যথোপযুক্ত সংজ্ঞা দিয়েছেন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিচের হাদিস থেকে বোঝা যায়। সাহাবি আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, গীবত কাকে বলে, তোমরা কি জান? সাহাবিগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই ভালো জানেন।

তিনি বললেন, তোমার কোনো ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা, যা সে অপছন্দ করে, তা-ই গীবত। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি যে দোষের কথা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলেও কি গীবত হবে? উত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি যে দোষের কথা বল, তা যদি তোমার ভাইয়ের থাকে তবে তুমি অবশ্যই তার গীবত করলে। আর তুমি যা বলছ তা যদি তার মধ্যে না থাকে। তবে তুমি তার ওপর মিথ্যা অপবাদ দিয়েছ। (সহিহ মুসলিম : ৬২৬৫)

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ গীবতের ভয়াবহ পরিণাম বুঝাতে ইরশাদ করেন- ‘আর তোমরা একে অপরের গীবত করোনা। তোমাদের কেউ কি এটা পছন্দ করবে যে, সে তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাবে। নিশ্চয়ই তোমরা এটাকে অপছন্দ করবে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চই আল্লাহ তাআলা সিমাহীন ক্ষমাকারী এবং অত্যন্ত দয়ালু।’ (সূরা হুজরাত : আয়াত : ১২)

পরনিন্দা ইসলামি শরিয়তে হারাম। মারাত্মক কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা অগ্র-পশ্চাতে দোষ বলে বেড়ায়।’ (সূরা হুমাজাহ : আয়াত:১)

কেউ গীবত শুনলে তার অনুপস্থিত ভাইয়ের পক্ষ থেকে তা প্রতিরোধ করবে সাধ্যমতো। আর যদি প্রতিরোধের শক্তি না থাকে তবে তা শ্রবণ থেকে বিরত থাকবে। কেননা, ইচ্ছাকৃতভাবে গীবত শোনা নিজে গীবত করার মতোই অপরাধ। হাদিসে আছে, সাহাবি মায়মুন রা. বলেন, ‘একদিন স্বপ্নে দেখলাম এক সঙ্গী ব্যক্তির মৃতদেহ পড়ে আছে এবং এক ব্যক্তি আমাকে তা ভক্ষণ করতে বলছে। আমি বললাম, আমি একে কেন ভক্ষণ করব? সে বলল, কারণ তুমি অমুক ব্যক্তির সঙ্গী গোলামের গীবত করেছ। আমি বললাম, আল্লাহর কসম আমি তো তার সম্পর্কে কখনো কোনো ভালোমন্দ কথা বলিনি। সে বলল, হ্যাঁ, এ কথা ঠিক। কিন্তু তুমি তার গীবত শুনেছ এবং সম্মত রয়েছ।’

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মিরাজের সময় আমাকে এমন এক সম্প্রদায়ের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো যাদের নখ ছিল তামার। তারা তাদের মুখম-ল ও দেহ আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাইল আ.-কে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? তিনি বললেন, এরা নিজ ভাইদের গীবত করত ও ইজ্জতহানি করত। (তাফসিরে মাজহারি)

আবু সায়িদ ও জাবের রা. থেকে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘গীবত ব্যাভিচারের চেয়েও মারাত্মক গুনাহ। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, এটা কিভাবে? তিনি বললেন, ব্যক্তি ব্যভিচার করার পর তওবা করলে তার গোনাহ মাফ হয়ে যায়। কিন্তু গীবত যে করে তার গোনাহ আক্রান্ত প্রতিপক্ষের ক্ষমা না করা পর্যন্ত মাফ হয় না।’

গীবতের ভয়াবহতা বুঝানোর জন্যেই অনুরূপ এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “গীবত করা জিনা থেকেও মারাত্মক।” (সুনানে বায়হাকি)

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তিনি থমকে দাঁড়ালেন এবং বললেন, এই দুই কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে তাদেরকে তেমন বড় কোনো অপরাধে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না (যা পালন করা তাদের পক্ষে কষ্টকর ছিল)। এদের একজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে, চুগলখোরী করার কারণে এবং অন্যজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে পেশাবের ব্যাপারে অসতর্কতার কারণে। (সহিহ বুখারি)

গীবতের ভয়াবহ শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠার সঙ্গে সঙ্গেই জিহবাকে সর্তক করে দেয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘বান্দা যখন ভোরে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয় তখন শরীরের সব অঙ্গ জিহ্বার কাছে আরজ করে, তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহর নাফরমাণী কাজে পরিচালিত করো না। কেননা, তুমি যদি ঠিক থাক, তবে আমরা সঠিক পথে থাকব। কিন্তু যদি তুমি বাঁকা পথে চলো, তবে আমরাও বাঁকা হয়ে যাবো। (সুনানে তিরমিযী)

যে ব্যক্তি তার জিহবার দায়িত্ব নিবে। অর্থাৎ সঠিকভাবে ব্যবহার করবে, তার জন্য জান্নাতের ঘোষণা দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার জন্য তার জিহ্বা ও লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে, আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।’ (সহিহ বুখারি)

যাদের দোষ বর্ণনা করা যায়

গীবত নিঃসন্দেহে হারাম। তারপরও যাদের দোষ বর্ণনা করা যায় তা হচ্ছে-

* কোনো অত্যাচারীর অত্যাচারের কাহিনী প্রতিকারের আশায় বর্ণনা করা।

* সন্তান ও স্ত্রীর বিরুদ্ধে তার পিতা ও স্বামীর কাছে অভিযোগ করা।

* ফতোয়া গ্রহণ করার জন্য ঘটনার বিবরণ দেয়া, প্রয়োজন ও উপযোগিতার কারণে কারো দোষ বর্ণনা করা জরুরি।

গীবত থেকে বেঁচে থাকার উপায়

গীবত থেকে বেঁচে থাকা অত্যাবশ্যক। এ থেকে বাঁচার বেশ কিছু উপায় রয়েছে। নিচে তা উল্লেখ করা হলো।

১. অন্যের কল্যাণ কামনা করা। কেননা, রাসূল সা. বলেছেন, ‘দীন হচ্ছে কল্যাণ কামনা করা।’ (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

২. আত্মত্যাগ অর্থাৎ যেকোনো প্রয়োজনে অপর ভাইকে অগ্রাধিকার দেয়া। মহান আল্লাহ এ গুণের অধিকারীদের প্রশংসা করে বলেছেন-‘তারা নিজের ওপর অন্যদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়, যদিও তারা অনটনের মধ্যে থাকে।’ (সূরা হাশর : আয়াত : ৯)

৩. অপরের অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া।

৪. মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বেশি বেশি করে অধ্যয়ন করা।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে সবধরনের বদাভ্যাস থেকে বেঁচে থেকে, ভালো ও সুকুমার গুণগুলো জাগ্রত করুক। আর বিশেষভাবে গীবতের মতো ভয়াবহ গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

কমেন্টস