পবিত্র আশুরার দিন পৃথিবীতে যা যা ঘটেছে এবং যা যা ঘটবে

প্রকাশঃ অক্টোবর ১, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিন- ইসলামের ইতিহাসের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি দিন। আশুরার দিন আমাদের সামনে উপনীত হলে একটি ঘটনা খুব বেশি আলোচিত হয়। ইমাম হোসাইনের (রা.) শাহাদাতের ঘটনা। যাকে আমরা কারবালার ট্রাজেডি বলে জানি। কিন্তু এই আশুরার দিন বা ১০ মুহাররম কী শুধু এই একটি মাত্র ঘটনার জন্য ঐতিহাসিক? না কি আরো অনেক ঘটনা সংঘঠিত হয়েছে এই দিনে? চলুন তাহলে এবার আমরা সেই ইতিহাস জানি। ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন পৃথিবীর ইতিহাসে কী কী ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘঠিত হয়েছিলো।

১. এই দিনে মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদমকে (আ.) মানব জাতির প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। একই দিনে তাকে জান্নাতে অবস্থান করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই আশুরার দিনেই তাকে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। বহু বছর পর আশুরার দিনই আরাফাতের ময়দানে জাবালে রহমতের কাছে হজরত আদম (আ.) এবং বিবি হাওয়ার (আ.) পুনরায় সাক্ষাৎ হয়। এছাড়া অনেক ঐতিহাসিক বলেছেন, ১০ মুহাররম বা আশুরার দিনই হযরত আদমের (আ.) তওবা কবুল করেছিলেন আল্লাহ মহান।

২. হযরত নূহ (আ.) সাড়ে নয়শত বছর আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় আল্লাহ মহানের বিধান মানতে অস্বীকৃতি জানায়, তখন তাদের প্রতি আল্লাহর গজব হিসেবে মহাপ্লাবন নেমে আসে। এই মহাপ্লাবনের ধ্বংসলীলা থেকে তারাই রক্ষা পায়- যারা আল্লাহ মহান ও হযরত নূহের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে নৌকায় আরোহণ করেছিলেন। হযরত নূহের (আ.) নৌকা চল্লিশ দিন পর ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিন জুদি পাহাড়ের পাদদেশে মাটি স্পর্শ করেছিলো।

৩. ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন মুসলিম জাতির পিতা খ্যাত নবীহযরত ইবরাহীম (আ.)– এর জন্ম হয় এবং এই দিনেই তিনি আল্লাহ মহানের পক্ষ থেকে ‘খলিলুল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত হন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১০ মুহাররম বা আশুরার দিনই হযরত ইবরাহীম (আ.) নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে রক্ষা পান।

৪. এই দিনে হযরত ইদ্রিসকে (আ.) আল্লাহ মহানের ইচ্ছায় বিশেষ মর্যাদায় চতুর্থ আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিলো বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়।

৫. ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন সুদীর্ঘ ৪০ বছর পর নবী হযরত ইউসুফের (আ.) সাথে তার পিতা হযরত ইয়াকুবের (আ.) পুনরায় সাক্ষাৎ হয়েছিলো বলে ইতিহাস থেকে তথ্য পাওয়া যায়।

৬. বিখ্যাত নবী হযরত আইয়ুব (আ.) সুদীর্ঘ আঠার বছর কঠিন কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত থাকার পর এই দিনে অর্থাৎ ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন আরোগ্য লাভ করেছিলেন।

৭. হযরত ইউনুসের (আ.) ৪০ দিন মাছের পেটে থাকার ঘটনা একটি ঐতিহাসিক বিষয়। খুব কম মুসলিমই আছেন যিনি বা যারা এই ঘটনা জানেন না। কিন্তু অনেকই হয়তো একথা জানেন না যে, হযরত ইউনুস (আ.) চল্লিশ দিন মাছের পেটে থাকার পর আশুরার দিন মুক্তি লাভ করেছিলেন।

৮. ইতিহাসে বর্ণিত রয়েছে, হযরত সুলায়মান (আ.) একবার ঘটনাক্রমে সাময়িক সময়ের জন্য রাজত্ব হারা হয়েছিলেন। আল্লাহ মহান ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিনে আবার তাকে রাজত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

৯. ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন হযরত মুসার (আ.) ওপর তাওরাত কিতাব নাজিল হয় এবং এই্ দিনেই আল্লাহ মহান হযরত মূসা (আ.) ও তার অনুসারীদেরকে বনি ইসরাইলের অত্যাচারী বাদশাহ ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই দিনেই হযরত মুসা (আ.) তার অনুসারীদের নিয়ে আল্লাহ মহানের কুদরতে পানির মধ্যে সৃষ্ট রাস্তা দিয়ে পার হয়েছিলেন এবং এই দিনেই ফেরাউন তার দলবলসহ ঐ সাগরে ডুবে মারা গিয়েছিলো। এছাড়া ঐতিহাসিকগণ আরো বর্ণনা করেছেন, হযরত মুসা (আ.) এই দিনেই তুর পাহাড়ে আরোহণ করে আল্লাহ মহানের সাথে কথা বলেছিলেন।

১০. এই দিনে অর্থাৎ ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন হজরত দাউদের (আ.) তওবা কবুল করে আল্লাহ মহান বিশেষভাবে তাকে ক্ষমা করেছিলেন।

১১. হযরত ঈসা (আ.) ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিন জন্মগ্রহণ করেন। ইহুদিরা তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করলে এই দিনেই আল্লাহ মহান ফেরেশতাদের মাধ্যমে সশরীরে তাকে আসমানে উঠিয়ে নেন।

১২. সহিহ বর্ণনা থেকে জানা যায়, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সব ত্রুটি-বিচ্যুতিকে এই দিনে অর্থাৎ ১০ মুহাররম বা আশুরার দিন ক্ষমা করে দেওয়া হয়।

১৩. এই দিনে অর্থাৎ ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিনে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় তাশরীফ নিয়েছিলেন।

১৪. ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিন সর্বপ্রথম পবিত্র কাবা শরিফকে গিলাফ দ্বারা আবৃত করা হয়েছিলো।

১৫. পৃথিবীর অস্তিত্বের সাথেও ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিনের সম্পর্ক গভীর। ১০ মুহাররম বা আশুরার দিনেই আল্লাহ মহান আকাশমন্ডলি, মাটিরজগৎ, পর্বতরাজি, লওহ-কলমসহ যাবতীয় সব কিছু সৃষ্টি করেছেন।  এছাড়া এই দিনেই আল্লাহ মহান নিজ আরশে আজিমে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বলেও বর্ণনা পাওয়া যায়।

১৬. ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিনেই পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম আকাশ থেকে বৃষ্টিপাত হয়েছে।

১৭. শুধু পৃথিবী সৃষ্টির সাথেই এই দিনটির সম্পর্ক রয়েছে বিষয়টি এমন নয়, বরং পৃথিবীর ধ্বংসের সাথেও এই দিনে সম্পর্ক বিদ্যমান। রাসূল (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছেন, মুহররম মাসের ১০ তারিখ পবিত্র আশুরার দিন জুমাবার কিয়ামত সংঘটিত হবে।

১৮. আল্লাহ মহান পৃথিবীতে প্রথমবার রহমত নাজিল করেছেন ১০ মুহাররম তারিখে বা পবিত্র আশুরার দিনে।

১৯. এই দিনেই অর্থাৎ ১০ মুহাররম বা পবিত্র আশুরার দিন হযরত জিবরাইল (আ.) আল্লাহ মহানের বানী নিয়ে সর্বপ্রথম পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন।

২০. এছাড়া পবিত্র আশুরার দিনটি বিশ্ব মুসলিমের কাছে যে কারণে অত্যন্ত স্মরণীয় ও হৃদয়বিদারক; সেটা হলো- কারবালার ট্রাজেডি। রাসূল (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন (রা.) এই দিনে কারবালার প্রান্তরে সপরিবারে শাহাদতবরণ করে সর্বোচ্চ ত্যাগের অতুলনীয় আদর্শ সৃষ্টি করেছিলেন।

কমেন্টস