যেসব কারণে হতে পারে গলব্লাডার বা পিত্তথলির পাথর, লক্ষণসমূহ ও চিকিৎসা

প্রকাশঃ সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

গলব্লাডার বা পিত্তথলির পাথর খুবই পরিচিত একটি রোগ। অনেকে একে গলস্টোনও বলে থাকেন। বেশিরভাগ গলস্টোনই কোলেস্টেরল জমে তৈরি হয়। খুব বেশি কোলেস্টেরল আছে এমন কিছু খাওয়া গলস্টোন হওয়ার আশঙ্কাকে বাড়িয়ে দেয়। তবে গলস্টোন বা পিত্তথলির পাথর কোন জটিল রোগ নয়। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না করালে তা জটিল আকার ধারণ করে। অনেকেই বলে থাকেন, শুধুমাত্র ওষুধ সেবনে এই রোগ নিরাময় সম্ভব। এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা। সময়মত রোগনির্ণয় এবং চিকিৎসা করালেই এই রোগের সঠিক নিরাময় সম্ভব।

পিত্তপাথুরী বা গলস্টোন (Gallbladder stone) পিত্তথলিতে হওয়া পাথরের মতো জমা কঠিন বস্তুকে বোঝায়। যকৃত থেকে বেরিয়ে আসা পিত্তরস পিত্তথলিতে জমা হয়ে গাঢ় হয়। গলব্লাডার নীলচে-সবুজ থলির মতো অংশ। বাড়ির মা-বোনেরা যখন মাছ কাটেন তখন এই থলিটিকে ঠিকভাবে ফেলে দেন। পিত্তথলি ফেটে পিত্তরস ছড়িয়ে পড়লে মাছ তেতো হতে পারে। গলব্লাডার হল ছোট্ট মাংসল থলি। আমাদের যকৃত বা লিভারের নিচের দিকে থাকে। লিভার প্রতিদিন প্রায় একলিটার পিত্তরস তৈরী করে। গলব্লাডারে ৬০ মিলিলিটারের মতো পিত্তরস জমা হতে পারে। পিত্ত খাদ্যের মধ্যে থাকা চর্বি জাতীয় পদার্থকে হজম হতে সাহায্য করে। যকৃত থেকে পিত্তরস পিত্তথলিতে এলে রস থেকে জলীয় পদার্থ পিত্তথলির দেওয়াল শুষে নেয় ফলে পিত্তরস গাঢ় হয়। যকৃত থেকে নিঃসৃত পিত্তরসের চেয়ে পিত্তথলির পিত্তরস প্রায় দশগুন গাঢ় ও শক্তিশালী। পিত্তথলির ভেতরের দেওয়াল এপিথেলিয়াল কোষ (Epithelial Cell) দিয়ে আবৃত থাকে। এই কোষস্তর কাপড়ের মতো ভেতরের অংশকে ঢেকে রাখে ও যকৃত থেকে আসা পিত্তরস থেকে জল শোষন করে।

পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির পিত্তথলি প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা। পিত্তে থাকে কোলেস্টেরল, পিত্ত লবন (Bile Salt)  পিত্ত রঞ্জক (Bile Pigment)। আমাদের বেঁচে থাকার জন্য পিত্তথলি যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। পিত্তথলি বাদ দেওয়ার পরেও মানুষ সুস্থ সবল ভাবে বেঁচে থাকতে পারে। এতে খাদ্য-খাবারের বিষয়ে তাকে কিছু বিধি-নিষেধ মেনে চলতে হয়। পিত্তরসে প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরল থাকে। যকৃত রক্ত থেকে এই কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে। এটা ছাড়াও পিত্তরসে থাকে বিলুরুবিন ( Bilirubin )। লোহিত কণিকা যকৃতে এসে বিনস্ট হয়। এই ভেঙ্গে যাওয়ার সময় বিলুরুবিন নামের রঞ্জক পদার্থ তৈরী হয়। গলস্টোন শুরু হয় একেবারে ক্ষুদ্র পরিমাণ পিত্তরসের জমাট বাঁধা থেকে। পিত্তপাথুরী তৈরী হওয়ার সব কারণ এখনো জানা যায় নি। পিত্ত পাথুরী তিন রকমের- কোলেস্টেরল স্টোন, পিগমেন্ট স্টোন, পিগমেন্ট ও কোলেস্টেরল  মিশ্রিত স্টোন।

গলব্লাডারে পাথর থাকলেই যে তার থেকে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেবে এমন কোন কথা নেই। এমন দেখা গেছে সারাজীবন গলব্লাডারে পাথর নিয়ে দিব্যি বেঁচে আছেন কিন্তু সে সংক্রান্ত কোন ব্যথা বেদনার অনুভূতি হয় নি। মহিলাদের মধ্যে গলস্টোন হওয়ার প্রবণতা পুরুষের তুলনায় চারগুণ বেশি। তিনভাগের একভাগ ক্ষেত্রে পিত্তপাথুরী যখন পিত্তরসে বাহিত হয়ে সাধারণ পিত্তনালীতে ঢুকে পড়ে তখনই শুরু হয় হাজারো সমাস্যা। পেটের ডান দিকে অসহ্য ব্যথা, বমি, মাথঘোরা, দুর্বলতা, মাথাব্যথা আরো কত কী। পিত্তপাথর যদি পিত্তনালীর মধ্যে দিয়ে ক্ষুদ্রান্ত বা ডিওডিনায় চলে যায় তাতে ব্যথা কমে আসে। তাছাড়া পাথরটি পিত্তনালী থেকে আবার পিত্তথলিতে ফিরে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বেশি কিছুক্ষণ বা কিছুদিনের জন্য আরাম পেত পারে।

গলস্টোনের আরোকিছু উপসর্গ হল পেট ফাঁপা, পেটের ভেতর অস্বস্তিকরভাব, একটু তেলমশলা খেলে কেমন পেট গুলানো অনুভূতি, পেটটা মাঝে মাঝেই ভারি ভারি লাগে এমন অনেক কিছু। ডাক্তারি ভাষায় এই লক্ষণগুলিকে আমরা বলি গলস্টোন ডিসপেপসিয়া (Gallstone dyspepsia)।

পিত্তপাথর অনেক সময় পিত্তনালীতে ঢুকে পিত্ত চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থা কয়েক ঘন্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত চলতে পারে। এই অবস্থা বেশি দিন চললে যকৃতে তৈরী হওয়া পিত্তরস পৌস্টিক নালীতে পৌঁছতে পারে না। রক্তে বিলুরুবিনের মাত্রা বাড়তে থাকে। সারা শরীর জুড়ে জনডিসের লক্ষণ ছড়িয়ে পড়ে। চোখ-ত্বক, প্রস্রাব হলদে হয়ে যায়।  ডাক্তারী পরিভাষায় একে আমরা বলি অবস্ট্রাকটিভ জন্ডিস। এই অবস্থার সামাল দিতে জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন করতে হয়। গলস্টোন থেকে পিত্তথলিতে সংক্রমণ হতে পারে যাকে বলে কোলেসিসটাইটিস (Cholecystetis)।

সাধারণ এক্স-রে-তেও অনেক সময় গলব্লাডার স্টোন ধরা পড়ে। বর্তমানে গলস্টোন ধরার সবচেয়ে প্রচলিত হাতিয়ার হলো আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান। আগে কোলেসিস্টোগ্রাফি (Cholecystography) করে পিত্তপাথুরী নির্ণয় করা হতো। তবুও গলব্লাডার অপারেশনের আগে অনেক ক্ষেত্রে কোলেসিস্টোগ্রাফি করা হয়।

গলস্টোন ধরা পড়লে প্রথমেই খাওয়া দাওয়ার বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।  সমীক্ষা মারফত জানা গেছে যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তাদের মধ্যেই পিত্ত পাথুরীর সম্ভাবনা বেশি। তেল, চর্বি, মাখন, ফ্যাট জাতীয় খাবার বন্ধ করতে হবে। এর সাথে ঝাল মশলাও কম খাওয়া দরকার।। আপনার দেহের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে তা কমাতে হবে। ব্যথার সময় ধীরে ধীরে চুমুক দিয়ে অল্প পরিমাণ জল বার বার পান করেন এতে কিছুটা উপকার পেতে পারেন।

পিত্তপাথুরীর প্রচলিত অপারেশন হয় কোলেসিসটেকটমি (Cholecystectomy) অর্থাৎ পিত্তথলিকে কেটে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। আগে এর জন্য পেটের বেশকিছু জায়গা কেটে এই অপারেশন করা হত ; এখন এন্ডোস্কোপের যন্ত্রের সাহায্যে ল্যাপ্রোস্কোপি করে এটি করা হয়। ল্যাপ্রোস্কোপের সবচেয়ে বড় সুবিধা হল এখানে পেটে মাত্রা দু’ তিনটি ছোট ফুটো করতে হয়। বড় ধরনের কাটাছেড়ার বালাই নেই। রোগিকে পুরো অজ্ঞান করতে হয় না; লোকাল অ্যানেস্থিসিয়া করেই এটা করা যায়। অপারেশনের সময় রোগি ও তার পরিবার মনিটারে তাকিয়ে ব্যাপারটা পুরোপুরি দেখতে পারে।

উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দরশ্মি বা আল্টা সাউন্ড বিম্ দিয়ে অনেক সময় পিত্তপাথর কে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিকে বলে লিথোট্রিপসি (Lithotripsy)। এতে কাটাছেঁড়া, ফুটো ফাঁটার কোন ব্যাপার নেই। যেভাবে আল্টা সোনোগ্রাফি করা হয় একই ভাবে এই পদ্ধতি এটি করা হয়।। পাথর ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরো হয়ে গেলে তা পিত্তরসের সাথে মিশে সহজেই অন্ত্রে চলে আসে ও মলের সাথে মিশে দেহের বাইরে বেরিয়ে যায়। তবে কোন পদ্ধতি কার জন্য উপযুক্ত হবে তা চিকিৎসকেরাই ঠিক করতে পারবে।  আমাদের দেশে গলস্টোন ঘটনা খুব স্বাভাবিক হলেও এ বিষয়ে তেমন ব্যাপক কোন সমীক্ষা ফলাফল পাওয়া যায় না।  ব্রিটেনে চল্লিশ পেড়িয়ে যাওয়া ২০ শতাংশ মহিলা ও ৮ শতাংশ পুরুষের মধ্যে এঘটনা দেখা যায়।

অ্যালোপ্যাথিতে পাথর গলানোর কিছু ওষুধ থাকলেও হোমিওপ্যাথির ওষুধগুলি এবিষয়ে খুব কার্যকরী। তাছাড়া হোমিও ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অন্যসব ওষুধের তুলনায় খুবই কম। ওষুধের দাম দিতে সাধারণ মানুষের ট্যাক খালি হবার জোগাড় হয় না। হোমিওপ্যাথি মূলতঃ লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা। একই রোগের উপসর্গ বা লক্ষণ অনুসারে ওষুধ ভিন্নভিন্ন। পিত্ত পাথুরীর ব্যথা যখন তীব্র থাকে তখন ক্যালকেরিয়া কার্ব ৩০ বা কোলেস্টেরিনাম ৩ x  স্বল্প সময় ব্যবধানে দিলে বেশ ভালো ফল পাওয়া যায়। পাথর গলানোর জন্য বারবেরিস ভালগারিস মাদার ১০ ফোঁটা করে দিনে দু’বার খেতে পারেন। লাইকোপডিয়াম, চেলিডোনিয়াম নাক্স ভমিকা আরো বেশ কিছু ওষুধ লক্ষণ অনুসারে প্রয়োগ করলে চমৎকার ফল পাওয়া যায়। তবে পিত্তপাথুরীর চিকিৎসা বেশ কিছুদিন ধরে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে করতে হবে। তবেই পুরোপুরি আরোগ্য সম্ভব।

আর একটি কথা হোমিও অ্যালোপ্যাথি বা শাল্য চিকিৎসা যাই করান না কেন পকেট পারমিট করলে সবার প্রথমেই আলট্রা সোনোগ্রাফি করে লিভার, কমল বাইল ডাক্ট ও গলব্লাডারের অবস্থা জেনে নিতে হবে। তা না হলে শেষে মহা মুস্কিলে পরতে পারেন।

লক্ষণসমূহ:

১. পেটের ডানদিকে তীব্র ব্যথা (স্থায়িত্বকাল কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘন্টা),
২. ব্যথা ধীরে ধীরে পেছনে, ডান কাঁধে এবং মাঝ বরাবর ছড়িয়ে পড়া,
৩. হালকা জ্বর থাকতে পারে,
৪. বমি বা বমি ভাব থাকে,
৫. জন্ডিস।

জটিলতা:

১. পিত্তথলির প্রদাহ,
২. পিত্তরস নিঃসরণে প্রতিবন্ধকতা,
৩. জন্ডিস,
৪. অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ,
৫. পিত্তথলির ক্যান্সার।

চিকিৎসা:

রোগীর অবস্থার উপর নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতির ভিন্নতা লক্ষণীয়। সাধারণত তীব্র ব্যথা নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীকে প্রথমত ওষুধ দিয়ে ব্যথা নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। ডাক্তারি ভাষায় এক কনজারভেটিভ চিকিৎসা বলা হয়। রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হলে সার্জারি করে পিত্ত পাথর অপসারণ করা হয়। সার্জারি দুইভাবে করা যায়।

১. ল্যাপারোস্কোপিক কোলেসিস্টেকটমি (Laparoscopic cholecystectomy):ল্যাপারোস্কোপিক মেশিনের সাহায্যে পেট না কেটে ফুটো করে পাথর অপসারণ করা হয়। রোগী সাধারণত অপরেশনের পরে দ্বিতীয় দিনেই বাড়ি যেতে পারে এবং প্রাত্যহিক কাজ করতে পারে।

২. উন্মুক্ত কোলেসিস্টেকটমি(open cholecystectomy): রোগ যখন জটিল আকার ধারণ করে তখন এই অপারেশন করা হয়। পেট কেটে পিত্তথলিসহ পাথর বের করে আনা হয়। এই নমুনা হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষার জন্য ল্যাবোরেটরিতে পাঠানো হয়। কেননা শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে পিত্তথলির ক্যান্সারেই পাথর হয়ে থাকে।

কমেন্টস