যেভাবে নিতে পারেন পবিত্র রমজানের পূর্ব প্রস্তুতি

প্রকাশঃ মে ১১, ২০১৭

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

আরবী মাস হিসাবে এখন শুরু হয়েছে শাবান মাস। আর ক’দিন পরই রহমত, বরকত, মাগফিরাতের মাস রমজান সমাগত। এই মহান মাসের যথাযোগ্য মর্যাদা দান ও এর থেকে পূর্ণাঙ্গ ফায়দা অর্জনের জন্য চাই যথেষ্ট পূর্বপ্রস্তুতি। রাসূলুল্লাহ সা: রজব মাসের শুরু থেকেই রমজানের প্রস্তুতি নিতেন এবং সাহাবাদেরও এর নির্দেশ দিতেন। সালাফে সালেহীনের জীবনে পাওয়া যায়, তারা বছরের প্রথম ছয় মাস রমজানের প্রস্তুতি নিতেন, আর বাকি ছয় মাস আমল কবুলের দোয়া করতেন।

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাস থেকেই রমজানের প্রতীক্ষায় থাকতেন। এ উপলক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণে মনোযোগী হতেন। রজবের চাঁদ দেখা দিলে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা শুরু করতেন। বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করতেন। কোরআনে কারিমের তেলাওয়াত বাড়িয়ে দিতেন। তাসবিহ-তাহলিলে আগের তুলনায় বেশি যত্নবান হতেন। সাথী-সঙ্গীদেরকেও রমজানের প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতেন।

আকাশে রজবের চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নবী করিম (সা.) রমজান পর্যন্ত আয়ু বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন। সাহাবিদেরকেও দোয়া করতে বলতেন। বেশি বেশি এ দোয়া পাঠ করতেন- ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগনা রমাজান।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ, তুমি রজব এবং শাবান মাসে আমাদের ওপর বরকত নাজিল কর এবং রমজান পর্যন্ত আমাদের হায়াত দীর্ঘায়িত করে দাও।

সঠিক অর্থে রমজানের প্রস্তুতি আমরা কিভাবে নিতে পারি সেই সম্পর্কে কিছু আলোকপাত করা যাক।

পারিবারিক প্রস্তুতি

১. রমজানের গুরুত্ব শেখানোঃ রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেনঃ তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের অধীনস্থদের ব্যাপারে ( কেয়ামতের দিন ) জিজ্ঞাসিত হবে”। একজন পরিবারের কর্তাব্যক্তি পরিবারের সদস্যদের আর্থিক – সামাজিক উন্নতির সাথে সাথে ধর্মীয় অগ্রগতিরও দায়িত্বশীল। তাই পরিবারের ছোটবড় সকলকে রমজানের আগেই এর গুরুত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় মাসায়েল শেখানো আবশ্যক। পাশাপাশি আমলের তদারকি করা ও সাংসারিক ব্যস্ততায় যেন কোন আমলে ঘাটতি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিৎ।

২. ভাংতি রোজা ক্বাযা করাঃ শরয়ী ওযরের কারণে রমজান মাসে রোজা ভাঙ্গার অনুমতি রয়েছে। এখানে শরয়ী ওযর বলতে মারাত্মক অসুস্থতা, মাসিক ঋতুস্রাব, প্রসবকালীন স্রাব ও সফরজনিত কারণকে বুঝানো হয়েছে। অনেককে এই ভাংতি রোজাগুলো ক্বাযা করতে অলসতা দেখা যায়। হযরত আয়েশা রাঃ বলেনঃ ” রমজান মাসে আমার যে রোজাগুলো ছুটে যেত পরবর্তী শাবান মাসের মধ্যেই আমি তা ক্বাযা করে ফেলতাম” ( বুখারী)। তাই যাদের ভাংতি রোযা রয়েছে এখনো রমজান আসার পূর্বেই সেগুলো ক্বাযা করে ফেলা উচিৎ।

৩. সাংসারিক রুটিন ও কর্মবণ্টনঃ রমজান মাসে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও সমানভাবে ইবাদত – বন্দেগীতে লিপ্ত হওয়া উচিৎ। মহিলা সাহাবী, তাবেয়ীদের জীবনীতে এমনি দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমানে সাংসারিক ব্যস্ততার দরুন অনেক নারীই পর্যাপ্ত ইবাদতের সময় বের করতে পারেননা। এমনকি অনেকের তারাবীর বিশ রাকাত বা কুরআনের খতমও পুরা হয়না। তাই এখন থেকেই দৈনন্দিন রুটিন বানিয়ে পারস্পারিক সহযোগিতা ও কর্মবণ্টনের মাধ্যমে কাজ সহয করে নেয়া দরকার। এর সাথে রমজানের প্রয়োজনীয় কেনাকাটাও আগেভাগে সেরে ফেলা উচিৎ, যাতে এজন্য কোন পবিত্র রজনী নষ্ট না হয়। বাসাবাড়ীর কাজের লোক ও কর্মক্ষেত্রের কর্মকর্তা – কর্মচারীর ক্ষেত্রেও একই কথা। দায়িত্বের চাপে যেন তাদের রোজার কোন ক্ষতি না হয় সেদিকেও যত্নবান থাকা প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত প্রস্তুতি:

১. বড় ধরনের কোনো সফর থাকলে তা রোজার আগেই সেরে ফেলতে হবে। যাতে রোজা রেখে কষ্ট করতে না হয়।

২. যে বাজারগুলো আগেই করা ফেলা সম্ভব (যেমন শুকনো বাজার), তা রোজার আগেই করে ফেলতে হবে। তাহলে রমজানে আপনার সময় বাঁচবে।

৩. কোরআন তিলাওয়াতের জন্য একটি সময় নির্ধারণ করতে হবে। এই সময়ে আপনি কোরআন তিলাওয়াত করুন। কোরআন পড়তে না জানলে শিখুন।

৪. তাফসির পড়ুন। বাজারে এখন অনেক বাংলা তাফসির পাওয়া যায় (যেমন: মায়ারেফুল কোরআন, ফি জিলালিল কোরআন, তাফহিমুল কোরআন।) পছন্দমতো একটি তাফসির গ্রন্থ কিনুন এবং সময়মতো নিয়মিত অধ্যয়ন করুন। তা ছাড়া, বাংলা হাদিস ও ইসলামি সাহিত্য বেশি বেশি পড়ুন।

৫. সময় সুযোগ থাকলে রমজানের শেষ দশ দিন ইতিকাফে বসতে পারেন।

৬. বেশি বেশি ইবাদত করুন। রোজার মাসে একটি ফরজ ৭০টি ফরজ আদায়ের সমান এবং একটি নফল একটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব। তাই মহান আল্লাহর এ স্পেশাল অফার গ্রহণে আমাদের উৎসাহী হওয়া একান্ত জরুরি।

৭. রমজানের পবিত্রতা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা নিন। কোনো বদ অভ্যাস থাকলে তা ছাড়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিন। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কেউ যাতে বে-রোজাদার না থাকে তার জন্য রমজানের পূর্বেই তাদের সতর্ক করুন। আপনার পয়সায় আপনার ঘরে দিনের বেলায় পবিত্র রমজানে শিশু ও অক্ষম বৃদ্ধ ছাড়া অন্যের অন্নসংস্থানের সব পথ বন্ধ করে দিন।

শারীরিক প্রস্তুতি:

অনেকেই গ্যাস্ট্রিক বা এ জাতীয় অন্য কোনো অসুখের দোহাই দিয়ে রোজা পালন থেকে বিরত থাকতে চায়। এটা ঠিক না। এ ব্যাপারে পরিপূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তা আগেভাগেই সেরে নেওয়া দরকার। শারীরিকভাবে পরিপূর্ণ সুস্থতা অর্জনের যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

মানসিক প্রস্তুতি

অনেকেই হিজরি সন বা চান্দ্রমাসের খবর রাখে না। ফলে হঠাৎ যখন শোনে, অমুক দিন থেকে রমজান আরম্ভ হবে- তখন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। রমজানের গুরুত্ব-মাহাত্ম্য যথাযথভাবে অনুধাবন করে না বা করতে পারে না। ফলে সঠিকভাবে রোজা-পালন করতে পারে না। আর রোজা যদিও রাখে- তার জন্য এটি একটি ভারী আমল হিসেবে দেখা দেয়। যেকারণে রোজা তার জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। অথচ চাঁদের হিসেব রেখে এখন থেকেই নিজের মন-মননে রোজাপালন ও এ মাসের প্রভূত কল্যাণ লুফে নেওয়ার মানসিকতা গ্রহণ করলে, পরিপূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধার সঙ্গে রোজাগুলো পালন করতে পারবে- ইনশাআল্লাহ।

বৈষয়িক প্রস্তুতি

বৈষয়িক কাজকর্ম ও দুনিয়ার নানাবিধ ঝুটঝামেলা রমজান আসার আগেভাগেই কমিয়ে ফেলা দরকার। যাতে রমজানে বৈষয়িক কাজের ভারে ইবাদতে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়।

অভ্যাসগত প্রস্তুতি

এখন থেকেই নফল ইবাদত ও জিকির-আজকারের অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। যে কোনো জিনিস হঠাৎই খুব বেশি করে ফেলা যায় ন॥ পূর্ব থেকে অভ্যাস থাকলেই যে কোনো কাজ অধিক পরিমাণে করা যায়। এখন থেকে অভ্যাস গড়ে তুললে রমজানে ইবাদত-বন্দেগি বেশি বেশি করা যাবে বলে আশা করা যায়। সুতরাং এখন থেকেই বেশি বেশি ইবাদতের অভ্যাস গড়ে নেওয়া দরকার।

সামাজিক প্রস্তুতি

১. নিজ প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া, তাদের সঙ্গে রমজানের প্রস্তুতিমূলক আলোচনা করে তাদেরও সহায়তা করা।

২. স্থানীয় মসজিদগুলোতে রমজানকেন্দ্রিক কী আয়োজন ও পরিকল্পনা রয়েছে, তা জানা এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসা। মসজিদে কারা ইতিকাফে বসবেন, তা জেনে নেওয়া, প্রয়োজনীয় সহায়তায় এগিয়ে আসা!

৩. রমজানের পূর্বেই হালকার মাধ্যমে রমজানবিষয়ক আলোচনা করা। নারী ও পুরুষরা যার যার অঙ্গনে বা পরিসরে করতে পারেন, সুযোগ থাকলে পর্দার পরিবেশ তৈরি করে যৌথভাবেও করা যায়।

৪. সকলে মিলে সমাজের অবহেলিত, অনাহারী মানুষগুলোর জন্য সেহ্‌রি ও ইফতারের ব্যবস্থা বা উদ্যোগ গ্রহণ করা। একে অপরকে উৎসাহিত করা। রমজানের নতুন চাঁদ দেখে দোয়া পড়ুন।

হজরত তালহা বিন ওবাইদুল্লাহ্ হতে বর্ণিত, হজরত নবী করিম (সা.) যখন নতুন চাঁদ দেখতেন,

‘আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল্ আম্নে ওয়াল ঈমান, ওয়াস্ সালামতে ওয়াল ইসলাম, রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ্’
অর্থ: হে আল্লাহ্! তুমি এই চাঁদকে উদিত কর আমাদের প্রতি নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি ও ইসলাম সহকারে। (হে চাঁদ!) আমার প্রভু ও তোমার প্রভু (এক) আল্লাহ্।(মিশকাত)

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য বিশাল নেয়ামত নিয়ে আসে। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত আল্লাহ প্রদত্ত এই নেয়ামত যথাযথভাবে গ্রহণ করা।

এই মাস ইবাদতের মাস আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাস, ঈমান নবায়ন করার এবং গুনাহ মাফ করানোর মাস। যে ব্যক্তি রমজান পেয়েও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না আল্লাহর রাসুল (সা.) তাকে ধিক্কার জানিয়েছেন। তাই এই মহান মাসটি কীভাবে কাটাবেন, আগে থেকেই প্রস্তুতি নিন।

Advertisement

কমেন্টস