বছরের চার মাস ধরে হাঁটু পানি থাকে ব্রহ্মপুত্র নদে

প্রকাশঃ অক্টোবর ২৬, ২০১৬

বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ময়মনসিংহ শহরের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে পুরনো ব্রহ্মপুত্র।

শহরটিকে নদের উল্টো পাশের ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সেতু।

শম্ভুগঞ্জ ব্রিজ নামে পরিচিত সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় আধা কিলোমিটার।

কিন্তু তলা দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জলের অতি ক্ষীণ একটি ধারা।

আর বাদবাকি চর।

ফাল্গুনের এক বিকেলে দেখা গেল, সেতুটিকে পাশ কাটিয়ে শত শত মানুষ নেমে পড়ছে নদের জলে।

লুঙ্গিটা একটু উঁচিয়ে কিংবা পাজামাটা একটু গুটিয়ে তারা পেরিয়ে যাচ্ছে নদের জল। সেতুর থোড়াই কেয়ার করছে তারা।

নদ পার হবার পর দেখা যাচ্ছে জল তাদের হাঁটু অব্দি পৌঁছেছে কি পৌঁছায়নি।

আবুল কাওসার একজন ব্যবসায়ী, নদের উল্টো পাশের চর ঈশ্বরদিয়া গ্রাম থেকে প্রতিদিন তিনি শহরে যান কাজের জন্য। তিনি হেঁটে নদ পার হচ্ছিলেন।

“আডু হোমান পানি তো, হাইট্টা গ্যালে তাড়াতাড়ি অয়। এই জন্যি হাইট্টা হাইট্টা যাই”। বলছিলেন মি. কাওসার।

বহুবার দিক বদলের পর এখনকার পুরনো ব্রহ্মপুত্র জামালপুরের বাহাদুরাবাদ থেকে ময়মনসিংহ, নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ হয়ে মেঘনা নদীতে পড়েছে।


Image captionনদের এই জায়গাটা হেঁটেই পাড়ি দেয়া যায়। সর্বোচ্চ গভীর যে অংশটি সেখানেও পানি হাঁটুর ওপরে নয়।

জানা যাচ্ছে, বাহাদুরাবাদে নদের মুখে বিরাট চর পড়ায় সেখান থেকে পানি প্রবাহ অত্যন্ত ক্ষীণ হয়ে পড়েছে।

আর এই সুযোগে পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে বছরের অন্তত চার মাসই শুকিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে থাকছে নদটি ।

ময়মনসিংহ শহরের একপ্রান্তে কাচারীঘাটে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে শৈশবের স্মৃতিচারণ করছিলেন প্রবীণ বাসিন্দা শামসুদ্দিন ফকির।

“এহানো বাঁশ ফেলাইলে তলাই গ্যাছে ছোডুবেলা। কি কইন! এইতা রোড-মোডতো আছিল না এট্টাও”।

এখন নদের এই অবস্থা কেন জানতে চাইলে ষাটোর্ধ্ব মি: ফকির বলছেন, “চলতি পানি আইয়ে না এই লাইগ্গা”।

মি: ফকিরের ভাষায়, এখন বর্ষা মৌসুমে নদের পূর্ণ যৌবন থাকলেও তাতেও খুব বেশি পানি হতে দেখা যায়না।

মূল নদের একেবারে মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন মি. ফকির।

পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে জলের ক্ষীণ একটি ধারা।

সেই ক্ষীণ ধারার পাশে কয়েকটি মাইক্রোবাস আর প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে। এগুলো ধোয়ামোছা হচ্ছে।

যারা ধোয়ামোছার কাজ করছিলেন, তাদেরই একজন বলছিলেন, “নদী তো আর নদীর মতো নাই। নদী শুকিয়ে গেছে। এজন্য আমরা গাড়ীগুলো নিয়ে এসেছি এখানে ধোয়ার জন্য”।

কথা বলতেই বলতেই খটখটে নদীবক্ষ ধরে মাঝ বরাবর নেমে এলো একটি বড়সড় লরি।


হাত কয়েক দূরেই একটি ইঞ্জিন নৌকোতে স্টার্ট দেয়া।

লোকজন লাইন ধরে এসে সেই নৌকোই চড়ছে।

অধিকাংশই ছাত্রছাত্রী।

দুপুরবেলা স্কুল ছুটির সময় বলেই হয়তো এদের সংখ্যা বেশী।

জায়গাটার নাম কাচারীঘাট। এটি একটি খেয়াঘাট।

এখানে পানির গভীরতা সামান্য বেশি বলে লোকজন নদ পার হচ্ছে ইঞ্জিন নৌকোয় চড়ে।

তবে সব মিলে পনেরো কুড়ি মিটার পথ পাড়ি দিতে হয় নৌকোয়, বাকিটা নদবক্ষে হেঁটেই এপার ওপার-করেন দু প্রান্তের বাসিন্দারা।

একটি নৌকায় চড়ে বসি আমি।

ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া থাকলেও বেশীরভাগ অংশই লগি ঠেলে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন মাঝি।

নদের দিকে তাকিয়ে দেখা গেল, গভীরতা এতই কম যে জলের তলায় শামুক-গুগলি, ভারী আবর্জনার টুকরো, ছেড়া কাপড়, পেরেক—প্রতিটি খুঁটিনাটিই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল খালি চোখে।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই নদের ওপারে চলে এলো নৌকো।

অপরপ্রান্তে একটি বিস্তীর্ণ চর।

এলাকাবাসীর কাছে মাঝের চর বলে পরিচিত।

খেয়ানৌকা থেকে নেমে বেশ কিছুক্ষণ শুকনো নদীবক্ষ ধরে হাঁটার পর দেখা মেলে একটি সড়কের।

এটি মূলত একটি বেড়িবাঁধ

স্থানীয়রা বলছিলেন, এখন যেখানে এই সড়কটি এক সময় সেখান দিয়ে নৌকো চালাতেন তারা।

সড়কের উপর এখন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান এমনই একজন বলছিলেন একসময় এখান দিয়েই নৌকো নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি।

দূরে একটি বাগান এবং তার পাশে বসে থাকা এক মহিলাকে দেখিয়ে তিনি বলছিলেন, “আগে আমরা নৌকা নিয়া আইতাম, ওই যে বাগানডা দেখছেন না, ওই যে মহিলাডা বসা, ওইডার মাঝখান দিয়া নদ আছিল, হেইদিক দিয়া ঘুইরা আবার এইদিক দিয়া আইতাম”।

“এইডা সব নদ আছিল। এই বেড়িবাঁধডা আমি হইতে দেখছি”।

এই বেড়িবাঁধের পাশে ব্রহ্মপুত্রের যে বিস্তীর্ণ চর জেগে উঠেছে সেখানে এখন নানা ফসল ফলাচ্ছেন স্থানীয় ভূমিহীনেরা।

এদের একজন মোহাম্মদ ফারুক বলছেন, ব্রহ্মপুত্রের এই রুগ্ন দশায় তাদের বরঞ্চ উপকার হয়েছে।

“উপকার হইছে আমার। মনে করেন যে কইরা-মইরা খাইতেছি। জমি-জিরাত তো আমার নেই। এক তোলা সম্পদ আমার নাই”।

“খিরা করছি, মটর করছি, লাউ করছি”, এই মৌসুমে চাষ করা ফসলের বর্ণনা দিচ্ছিলেন কৃষক ফারুক।

ময়মনসিংহ শহর থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে ডিগ্রিপাড়া নামে একটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল সেখানে ব্রহ্মপুত্র আরও সরু।

এই গ্রামের বাসিন্দারা বললেন স্বভাবতই তারা নদের উপর দারুণ নাখোশ।

প্রত্যেকেরই ঘর-বাড়ি আট-দশবার করে চলে গেছে নদের পেটে।

প্রত্যেকবার বাড়ি ভাঙনের শিকার হবার পর আবার নতুন করে তাদের শুরু করতে হয় জীবনযুদ্ধ, নতুন করে গড়ে তুলতে হয় আবাস।

এক গ্রামবাসী বলছিলেন, “আবার যদি নদী ভাঙ্গে আমাগোর এই ডিগ্রিপাড়া, তাহলে আমাগো এই দ্যাশ ছাইড়া চইলা যাওন লাগবো”।

ডিগ্রিপাড়া থেকে আবার ময়মনসিংহ শহরে ফিরে দেখা যায়, সেখানে নদের পাশে শহর কর্তৃপক্ষ একটি পার্ক গড়ে তুলেছেন।

এখানে অনেকেই আসেন প্রাত:ভ্রমণ করতে।

আবার নদের তীরে প্রকৃতির উপভোগ করতেও অনেকে ছুটে আসেন।

কিন্তু এখন নদে পানি না থাকায় পার্কের শোভা থাকছে কই?

পার্কের পাশেই নদের মধ্যে অনেকগুলো নৌকো সারিবদ্ধভাবে রাখা। এগুলো মূলত পর্যটকদের জন্য।

নদের এই স্বল্প জলেই অনেককেই দেখা গেল বিকেলের মিষ্টি রোদ্দুরে নৌকো চড়ে ঘুরে বেড়াতে।

 

Advertisement

কমেন্টস